৬ দিনের হরতালে লাভ হয়নি বিএনপির, শুধু নিহত হয়েছে ২৮ জন দলের ভেতর তীব্র ক্ষোভ

13

log5প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বড় ধরনের চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছিল বিএনপি। এ জন্যই নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ৬ দিন হরতাল পালন করে দলটি। কিন্তু এ হরতালে দলের নেতাকর্মীরা মাঠে না নামায় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাই হরতাল করে বিএনপির কোন লাভ হয়নি বরং বিএনপিই এখন রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি জনসম্মুখে চাপের মুখে পড়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে। প্রাপ্ততথ্য মতে, ৬ দিনের হরতালে দেশের ক্ষতি হয়েছে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া সারাদেশে ২৮ জন মানুষ নিহত এবং অনেক আহত হয়েছে। জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে মানুষের অনেক ঘরবাড়ি, যানবাহনসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
এদিকে আবারও বিএনপি হরতাল-অবরোধের পথে যাচ্ছে শুনে দেশের সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও অপরদিকে শিল্প উৎপাদন ও রফতানিসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল থেকে হরতাল-নাশকতা বন্ধ করার ব্যাপারে জোরালো দাবি উঠলেও তা তোয়াক্কা করছেন না বিএনপি হাইকমান্ড। আবারও তারা হরতাল-অবরোধের পথেই হাঁটছেন বলে জানা গেছে। এর ফলে খোদ বিএনপিরই বিভিন্ন পর্যায় থেকে এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। আর হরতাল ডেকে মাঠে না নামা প্রসঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের দোষারোপ করছেন। তারা এমনও বলছেন কেন্দ্রীয় নেতারা হরতাল ডেকে ঘরে বসে থাকলে আমরা কোন্ ভরসায় পুলিশের নির্যাতন উপেক্ষা করে মাঠে নামব।
১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের সময় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা মাঝে মধ্যে ঝটিকা মিছিল নিয়ে মাঠে নামার কারণে কর্মসূচী পালনে বিএনপি কিছুটা হলেও সফলতা পাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের রাজপথে ঠেলে দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা হরতালের সময় ঘরে বসে থাকার বিষয়টি নিয়ে ১৮ দলীয় জোটের মধ্যেও হতাশা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে বিএনপির ওপর জামায়াত-শিবিরের চরম ক্ষোভ রয়েছে বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে আবার হরতাল কর্মসূচী দিলে তা সফল করা নিয়ে জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যেই বিরূপ কথাবার্তা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রসঙ্গত ২৫ অক্টোবর ঐতিহাসিক সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানে ১৮ দলীয় জোটের জনসভা থেকে খালেদা জিয়া সরকারকে নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিতে ২ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে এর মধ্যে দাবি মেনে না নিলে ২৭ অক্টোবর থেকে টানা ৩দিন হরতাল পালনের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পরদিন ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে ফোন করেন। তারা প্রায় ৪০ মিনিট ফোনে কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে হরতাল প্রত্যাহার করার অনুরোধ করেন এবং ২৮ অক্টোবর তাঁর গণভবনের বাসায় নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান। এর পর দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় দেশবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান হয়ত হবে। এ পরিস্থিতিতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল থেকে বিএনপিকে হরতাল প্রত্যাহার করে সরকারী দলের সঙ্গে সমঝোতার জন্য নিঃশর্ত সংলাপের জন্য তাগিদ দেয়া হয়। তারা আওয়ামী লীগকেও বিএনপির সঙ্গে আন্তরিকভাবে সংলাপের জন্য চাপ দিতে থাকেন।
প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে ২৭ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তিন দিনে টানা ৬০ ঘণ্টা হরতাল পালন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। এ হরতালে বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের কোন কেন্দ্রীয় নেতাকে মাঠে দেখা যায়নি। তবে বিএনপি ও জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে মিছিল করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর অবস্থানকে উপেক্ষা করেই হরতালে অংশ নেয়া কিছু পিকেটার ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহন ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ, রেললাইন উপড়েফেলা, এ্যাম্বুলেন্স ও সংবাদপত্রের গাড়িতে হামলা করা, পার্টি অফিস ও বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাংচুর করে। কোন কোন এলাকায় হরতালের বিপক্ষে অবস্থানকারীরাও হরতালকারীদের ওপর পাল্টা আক্রমণ করে। এ ছাড়া পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হরতালকারীদের ওপর চড়াও হয়। এভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কখনও দ্বিমুখী ও কখনও ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। আর এসব ঘটনায় ৩ দিনের হরতালে মারা যায় ২১ জন লোক।
দ্বিতীয় দফায় আবারও বিএনপি ৩ দিনের হরতাল ডাকার পর ২ অক্টোবর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করেন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। তাঁরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠককালে হরতাল পরিহার করে সরকারী দলের সঙ্গে শর্তবিহীন সংলাপে বসার আহ্বান জানান। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকের ব্যাপারে খালেদা জিয়া সম্মত হন। কিন্তু সরকারী দলের পক্ষ থেকে নতুন করে আমন্ত্রন না পাওয়ায় বিএনপিও আর সংলাপের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি।
দ্বিতীয় দফায় ৪ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আরও ৩ দিন হরতাল পালন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। এই হরতালের সময় ৭ জন মানুষ মারা যায়। এ ছাড়াও হরতাল চলাকালে ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতিতে আবারও বিএনপি হরতাল-অবরোধের পথে যাচ্ছে শুনে দেশের সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকেও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের হিসাবে একদিনের হরতালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। এর মধ্যে শুধু পোশাক শিল্পের ক্ষতি ৩৬০ কোটি টাকা। একদিন হরতাল হলে শিল্প-বাণিজ্যের তিন দিন বন্ধ থাকার সমান ক্ষতি হয়। ঢাকা চেম্বারের হিসাবে একদিনের হরতালে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি ১৬শ’ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কের বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় পাইকারি বাজার, শপিং মল, শোরুম ও ছোট দোকানগুলো। এ খাতে একদিনে ৬শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। হরতালে সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমে যায়। একদিনের হরতালে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ২৫০ কোটি টাকা। বড় ধরনের ক্ষতির মুখে থাকা খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, পরিবহন ও যোগাযোগ, পর্যটন প্রভৃতি। ঢাকা চেম্বারের হিসাবে একদিনের হরতালে শুধু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে অন্তত ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। শিক্ষা খাতেও আর্থিক ক্ষতি ৫০ কোটি টাকা।
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, হরতালে অবশ্যই দেশের ক্ষতি হয়। তবে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করে ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হরতালে সাময়িক ক্ষতি হলেও মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে আমরা এ কর্মসূচী পালন করছি। সরকার একতরফা নির্বাচন থেকে সরে না এলে সামনে এ ধরনের কর্মসূচী আরও পালন করা হবে এবং দেশ ভয়াবহ সঙ্কটের দিকে যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, হরতাল পালন করে বিএনপির কোন লাভ হচ্ছে না, বরং তারা আরও পিছিয়ে যাচ্ছে। তারা দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে দিতেই হরতাল করছে। প্রতিটি হরতালে দেশের ক্ষতি হয় ২ হাজার কোটি টাকা। তবে হরতালে দেশের ক্ষতি হলেও ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির নেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। কারণ হরতালের সময়ও তারা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে রেখে নিরাপদে ব্যবসা চালিয়ে যায়।
বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, হরতালের কারণে সময়মতো রফতানি পণ্য পাঠানো যায় না। ক্রেতারা এ দেশে আসতে পারেন না। সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হয়। তাই জাতীয় স্বার্থে রাজনীতিবিদদের এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া উচিত। বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান বলেন, হরতাল ও সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির কারণে উদ্যোক্তাদের চেয়ে সাধারণ শ্রমিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here