১৯ দলীয় জোটেই থাকবে জামায়াত। খালেদা জিয়াকে আশ্বাস

14

newতারেক রহমানের বক্তব্যের পক্ষে বলতে জোট নেতাদের পরামর্শ বিএনপি চেয়ারপারসনের

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেই জামায়াত থাকছে বলে জানানো হয়েছে জোট প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ১৯ দলীয় জোটের বৈঠকে এনিয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমির আব্দুল হালিম বিএনপি চেয়ারপারসনকে বলেছেন, ‘জামায়াত জোট ছাড়বে বলে কতিপয় গণমাধ্যমে যে লেখালেখি ও কয়েকটি মহলে যে কথাবার্তা হচ্ছে তা সত্য নয়। পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাময়িক বিঘ্ন ঘটায় এটা হচ্ছে। তবে জামায়াত জোটেই আছে এবং থাকবে।’ ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা ১৯ দলের চারটি শরিক দলের প্রধানের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানা গেছে।

ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথক আলাপকালে ওই চারটি শরিক দলের প্রধান অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত জোটের ওইদিনের দীর্ঘ বৈঠকে অন্যান্য শরিকদের বক্তব্য শেষে জামায়াতের অবস্থান সম্পর্কে আব্দুল হালিমের কাছে ব্যাখ্যা চান খালেদা জিয়া। এসময় তিনি চেয়ার ঘুরিয়ে আব্দুল হালিমের দিকে মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘আপনাদের নিয়ে তো অনেক কথাবার্তা শুনছি। অনেকদিন তো আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগও নেই। বলুন তো, আপনারা আসলে কী করছেন। আপনাদের (জামায়াতের) বিষয়টি আমার একটু পরিষ্কার হওয়া দরকার। একটু বলুন।’

জবাবে খালেদা জিয়াকে আব্দুল হালিম বলেন, ‘আপনি যা শুনেছেন, তা সঠিক নয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আপনাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটেছে। ইচ্ছা থাকলেও আমাদের পক্ষ থেকে আপনাদের সঙ্গে সময়ে-সময়ে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সেখানে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল, এটা আপনারও জানা। তাছাড়া দলের পক্ষে যাদেরকে জোটের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তারা কারাগারে চলে যাওয়ায় জোটের সঙ্গে আমাদের কিছুদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। এরপর যখন আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়, আমি যোগাযোগ করেছি। এখন আর সমস্যা নেই।’

আব্দুল হালিমের এই জবাবের পর বৈঠকে উপস্থিত থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ফখরুল সাহেব, কী বুঝলেন, উনি (আব্দুল হালিম) তো ওনাদের ব্যাখ্যা দিলেন।’ এসময় মির্জা ফখরুল বলেন, পরিস্থিতির কারণে পারস্পরিক যোগাযোগে সাময়িক গ্যাপ (দূরত্ব) হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে ওনারা (জামায়াত) আমার সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন।’ পরে জামায়াতের আব্দুল হালিমের উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে আপনারা আমাদের সঙ্গে আরেকটু সমন্বয় করলে আমরা আরো ভালো করতে পারতাম। কিছু জায়গায় আমাদের সমন্বয়ের অভাবে আওয়ামী লীগের লোকজন পাস করেছে।’

তারেক রহমানের বক্তব্যের পক্ষে

অবস্থান নেয়ার পরামর্শ

লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য ১৯ দলীয় জোট নেতাদের পরামর্শ দিয়েছেন খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে এই পরামর্শ দিয়ে জোট নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তারেক অসত্য কিছু বলেনি। ও যা বলেছে, ইতিহাস থেকেই বলেছে। আওয়ামী লীগের লোকজন যেসব বইপত্র লিখেছে, সেখান থেকে উদ্ধৃতি দিয়েই বলেছে। অনেকের কাছে বিষয়টি নতুন মনে হলেও এটাই ঐতিহাসিক সত্য।’

খালেদা জিয়ার এই পরামর্শের কথা জানিয়ে ১৯ দলের একটি শরিক দলের প্রধান ইত্তেফাককে বলেন ‘তিনি (খালেদা জিয়া) আমাদের বলেছেন, আপনারা যে যেখানে বক্তব্য রাখবেন, বিষয়টি সম্পর্কে বলবেন। বিষয়গুলো সম্পর্কে নতুন প্রজন্মেরও জানা উচিত। কোনিট সত্য, কোনিট মিথ্যা তা বলা দরকার।’

এদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসনের এই পরামর্শের সত্যতা মেলে জোটের বৈঠকের একদিন পর অর্থাত্ শনিবার অনুষ্ঠিত শ্রমিক দলের সম্মেলনেও। রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের প্রধান অতিথি খালেদা জিয়া ছাড়া বিএনপির অন্য প্রায় সকল বক্তাই তারেক রহমানের বক্তব্যের পক্ষে কথা বলেছেন। এতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ সাহেব (সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম) লন্ডনে একটি বক্তব্যে বলেছেন তিনিও জিয়াউর রহমানের ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছেন। কাজেই যারা বলেন জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধই করেননি, আজ আশরাফ সাহেবের বক্তব্যের মধ্যদিয়ে এসব কথা আরো বেশি করে মিথ্যা প্রমাণ হলো।’

ফখরুল আরো বলেন, তারেক রহমান বিভিন্ন বই থেকে ইতিহাসের সত্য উদঘাটন করেছেন। আর এজন্যই তাদের (আওয়ামী লীগের) গায়ে আগুন লেগে গেল। তাদের সিনিয়র নেতারা এনিয়ে এমন ভাষায় সংসদে কথা বলেছেন, যা কোনো সভ্য মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমি তো বলেছি, তারেক রহমানের বক্তব্য ভুল হলে প্রমাণ করুন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তার বক্তব্যের বিপক্ষে একটি যুক্তিও দেখাতে পারেনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে মাসুদুল হকের বই পড়লেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেখানে ‘৭১ এর ২৭ মার্চের বিভিন্ন পত্রিকার কাটিংও সন্নিবেশিত আছে, তাতে দেখা যায়- বঙ্গবন্ধু ২৭ মার্চ হরতালের ডাক দিয়েছিলেন।

শ্রমিক দলের এই সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও বিষয়টির অবতারণা করে বলেছেন, তারেক রহমানের বক্তব্যে যুক্তি আছে। যারা যুক্তি মানে না, তারাই তার সমালোচনা করছেন। যুক্তি দিয়ে খণ্ডানোর ক্ষমতা নেই বলেই তারা ভিন্ন ভাষায় চাঁপাবাজি করছেন। তাদের এই চাঁপাবাজি বন্ধ করতে হবে। একই অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, তারেক রহমানের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সঠিক ছিল বলেও বৃহস্পতিবার জোটের বৈঠকে দাবি করেছেন খালেদা জিয়া। একাধিক সূত্রমতে, জোট নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘অনেকে বলছেন আমরা নাকি নির্বাচনে না গিয়ে ভুল করেছি। আমরা ভুল করিনি। আমাদের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। আপনারা দেখেন, উপজেলা নির্বাচনে কী হলো। কীভাবে ওরা ভোট ডাকাতি করলো। আমরা যদি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যেতাম, তাহলে সরকার উপজেলার মতোই ঘটনা ঘটাতো। কাজেই আমাদের সিদ্ধান্ত যে সম্পূর্ণ সঠিক ছিল, তা এই উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো।’ জোটের কয়েক নেতা ইত্তেফাককে জানান, পরবর্তীতে বক্তব্য রাখার সময় জোটের শরিক দলগুলোর প্রায় সব নেতাই বিএনপি চেয়ারপারসনের এই বক্তব্যকে সমর্থন করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here