হাসপাতালে থেকে আর কতদিন গল্ফ খেলবেন এরশাদ?

12

[এরশাদের ভূমিকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও নালিশ গেছে অনেকের। জানা যায়, তারা না-কি বলেছেন- নির্বাচনের মাঝপথে এরশাদ উল্টোরথে যাওয়ার কারণেই নির্বাচনটি অনেক প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সুতরাং এর দায়ভার এরশাদকেও নিতে হবে।]Ershad

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কপালে ‘একতরফা’ ও ‘ফাঁকা মাঠে গোল’- এরকম নানা বিশ্লেষণের তিলক বসানোর ক্ষেত্র তৈরির জন্য জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদও অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকের মতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা প্রশ্নে এরশাদের ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে নির্বাচন নিয়ে নানামুখী নতুন কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। আকষ্মিকভাবে তিনি ও তার দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দিয়ে এবং অনেকগুলো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে না নিলে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতো না। তাদের মতে, সরকারকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলে এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিত্সাধীন ‘অসুস্থ’ এরশাদ এখন নিয়মিত গল্ফ খেলছেন। এভাবে আর কতদিন তিনি গল্ফ খেলবেন বলেও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কয়েকটি দলের নেতাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে এরশাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য এরশাদ যে নির্বাচনে আসবেন না এবং শেষ মুহূর্তে বেঁকে যেতে পারেন তা আগেই আঁচ করা গিয়েছিল। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনেও এমন ধারণা দেয়া হয়। এরপরেও ‘গণতন্ত্রের স্বার্থে’ নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে এরশাদ কার্যত সরকারকে এক ধরনের ফাঁদে ফেলতে চেয়েছেন। নির্বাচনকালীন সরকারে যোগদান এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার আসন সমঝোতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দরকষাকষির ঘটনা ঘটিয়ে এই ফাঁদকে আরও পাকাপোক্ত করেন তিনি। মনোনয়নপত্র দাখিলের ঠিক পরদিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনের পুরো আয়োজনকে বিতর্কের মুখে ফেলে দেন এইচএম এরশাদ। সিএমএইচে ভর্তি এরশাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম নিয়েও কোনো কোনো নেতা প্রশ্ন রেখেছেন।

উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর এরশাদ তার বারিধারার বাসা থেকে র্যাবের গাড়িতে করে সরাসরি সিএমএইচে গিয়ে ভর্তি হন। গত ১২ দিন ধরে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তার খাবার যাচ্ছে বাসা থেকে। একাধিক মোবাইল ফোন সঙ্গে রেখে অনেকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও করছেন। স্ত্রী রওশন এরশাদ তার সঙ্গে সেখানে বৈঠক করেছেন। ভাই জিএম কাদের ও জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার একাধিকবার তার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করেন। স্ত্রী-কন্যাসহ সাক্ষাত্ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীও। এছাড়া এরশাদের ব্যক্তিগত একাধিক কর্মচারীও হাসপাতালে যাতায়াত করছেন নিয়মিত।

এরসঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত হয় গত শুক্রবার। ওইদিন সকালে সিএমএইচ থেকে কুর্মিটোলা গল্ফ ক্লাবে খেলতে যান তিনি। গল্ফ খেলার ফাঁকে সেখানে তিনি দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনাও করেন। খেলা শেষে তিনি আবার সিএমএইচে ফিরে যান। রবিবার সকালেও একইস্থানে গল্ফ খেলতে যান তিনি। এদিনও রুহুল আমিন হাওলাদর সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করেন। ‘অসুস্থ’ এরশাদের হাসপাতাল থেকে গল্ফ খেলতে যাওয়ার খবর জাপাসহ নানা মহলেই কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।

এ ব্যাপারে সাংবাদিকরা গতকাল সোমবার সচিবালয়ে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে প্রশ্ন রাখেন। উত্তরে মন্ত্রী বলেছেন, ‘এরশাদ সাহেব অসুস্থ কিনা, সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে সেটি আমি কীভাবে বলি। তবে গল্ফ খেলা তার চিকিত্সারই অংশ। এছাড়া তিনি যখন হাসপাতাল থেকে বাসায় যাবেন, তখন তার মুখ থেকেই সবকিছু জানা যাবে।’

বিএনপিসহ ১৮ দল সংবিধানের বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে যাবে না বলে শুরু থেকেই বলছে। এখন পর্যন্তও তারা নিজেদের অবস্থানে অটল। বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল কোনো অস্পষ্টতার জন্ম দেয়নি। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার বিষয়ে একেকবার একেক কথা বলে এরশাদ খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই বিভ্রান্ত করেছেন। এরশাদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়ায় এক ধরনের হিসাব-নিকাশ থেকেই বর্তমান নির্বাচনের পথে অগ্রসর হয় সরকার। কিন্তু মাঝপথে এরশাদ উল্টো রথ ধরে পুরো বিষয়টিকে নতুন ধরনের বিতর্কের মুখে ফেলে দেন। কার্যত জাপার অনেক প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার কারণেই ১৫৪টি’র মতো এত বিপুল সংখ্যক আসনে একক প্রার্থী হয়ে যায়। যা প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারকেও বিব্রত করেছে। সুতরাং নির্বাচনটিকে ভিন্ন আঙ্গিকে বিতর্কিত করার দায়ভার এরশাদের ওপর বর্তাবে না কেন, এখন এমন প্রশ্নও আসতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নিজেও কয়েকদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘জাপার অনেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার কারণেই এতগুলো আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি না আসার কারণে মাঠে খেলোড়ায় নেই, তাহলে তো ফাঁকা মাঠে গোল হবেই। সেখানে তো আমাদের কিছু করার নেই।’

নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ায় এবং নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেয়ায় বিএনপিসহ ১৮ দলের নেতাদের কটাক্ষের মুখে পড়েন এরশাদ। এসব জবাবে ২৩ নভেম্বর ঢাকায় যুব সংহতি আয়োজিত এক সমাবেশে বিএনপির উদ্দেশে এরশাদ বলেছিলেন ‘আমাকে হুমকি দেবেন না। বোমা মেরে আমাদের অহেতুক ভয় দেখাবেন না। ইট মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। সেই পাটকেল মারার শক্তি আমাদের আছে। সাহস থাকলে সামনে আসুন। আমি সেনাপতি ছিলাম, আমি সৈনিক। কাকে ভয় দেখান, কিসের ভয় দেখান।’ সেই এরশাদ আবার ইউটার্ন নেন ৩ ডিসেম্বর। ৩ ডিসেম্বর অনেকটা আকষ্মিকভাবে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেন এরশাদ। এই ঘোষণা দিয়ে ২৬ ঘণ্টার জন্য লাপাত্তা হয়ে যান জাপা চেয়ারম্যান। পরদিন ৪ ডিসেম্বর বিকেল তিনটায় তিনি বারিধারার বাসায় ফেরেন। সোয়া চারটার সময় বৈঠক করেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের সঙ্গে। বৈঠক শেষে এরশাদ ঘোষণা দেন, জাপা নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায়ও থাকছে না। সরকারে থাকা দলের ছয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টাকে অবিলম্বে পদত্যাগের নির্দেশ দেন তিনি। একইসঙ্গে ২৪৮টি সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী দলীয় প্রার্থীদের দ্রুত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারেরও নির্দেশ দেন। এরপর ১৭৩টি আসনে জাপা প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখের আগেরদিন রাতে র্যাবের গাড়িতে সিএমএইচে যান এরশাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here