সুপ্রীমকোর্টের দেয়া কাদের মোল্লার ফাঁসির পূর্ণাঙ্গ রায়

46

abdul-quader একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদ- দিয়ে সুপ্রীমকোর্টের দেয়া রায়ের ৭৯০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন সুপ্রীমকোর্ট। বিস্তারিত রায়ে সুপ্রীমকোর্ট বলেছেন, মৃত্যুদ-ই কাদের মোল্লার একমাত্র যথার্থ শাস্তি। তার অপরাধগুলো এতই পৈশাচিক, মৃত্যুদ- ছাড়া কোন সাজাই তার জন্য পর্যাপ্ত নয়। রায়ে আদালত আরও বলেন, কাদের মোল্লার অপরাধের ফলাফল সমস্ত জাতিকে অনন্তকাল বয়ে বেড়াতে হবে। বাংলাদেশের বাইরেও তার অপরাধগুলো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, কাদের মোল্লার এ বর্বর অপরাধ মানবজাতির বিবেককে দারুণভাবে আহত ও স্তম্ভিত করেছে। এই কারণেই ৬ নম্বর অভিযোগে কাদের মোল্লাকে দেয়া যাবজ্জীবন কারাদ-ের সাজার ট্রাইব্যুনালের রায় বিবেচনাপ্রসূত হয়নি এবং সাজা প্রদানের নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ৩ নম্বর সাক্ষী এই ঘটনার স্বাভাবিক সাক্ষী এবং এ ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী, যাকে পক্ষপাতদুষ্ট সাক্ষী বলা যায় না। রায়ে আদালত বলেন, এই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এই মামলায় যদি ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ সাজা না দেয় তাহলে সর্বোচ্চ সাজা দেয়ার মতো অন্য কোন মামলা পাওয়া কঠিন হবে।
প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির আপীল বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি এই অভিমত দেন। রায় লেখা শেষ হওয়ার পর সকল প্রস্তুতি শেষে কাদের মোল্লার আপীল শুনানি গ্রহণকারী পাঁচ বিচারপতির স্বাক্ষরের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়। সংক্ষিপ্ত রায় প্রদানের ৮০ দিন পর সুপ্রীমকোর্ট পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করল। এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সংক্ষিপ্ত রায়ে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদ- দেন সুপ্রীমকোর্ট। কাদের মোল্লার শুনানি গ্রহণকারী বেঞ্চে পাঁচ বিচারপতির মধ্যে চার বিচারপতি কাদের মোল্লার ফাঁসির পক্ষে মত দেন এবং একজন ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত রায়ে দেখা যায়, প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এসকে সিনহা), বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক কাদের মোল্লার মৃত্যুদ-ের পক্ষে মত দেন এবং এই বেঞ্চের অপর বিচারপতি মোঃ আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা ট্রাইব্যুনালের দেয়া যাবজ্জীবন কারাদ- বহাল রেখে রায় দেন।
৭৯০ পৃষ্ঠা রায়ের মূল অংশটি লিখেছেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এসকে সিনহা)। তার লেখা রায়ের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন এবং বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও মৃত্যুদ-ের সঙ্গে একমত পোষন করে তার অভিমতসহ রায় লিখেছেন। একই সঙ্গে কাদের মোল্লার ফাঁসির দ-ে বিষয়ে ভিন্ন মত প্রদানকারী বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞাও তার অভিমতসহ রায় লিখেছেন।
আদালত বিস্তারিত রায়ে বলেন, জীবন মহামূল্যবান। এ কারণে মৃত্যুদ- দেয়ার পূর্বে পুরো বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট, আমেরিকান সুপ্রীমকোর্ট, আইখম্যানের সাজাদানকারী আদালতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মৃত্যুদ- প্রদানকারী রায় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। রায়ে আদালত বিভিন্ন দেশের সুপ্রীমকোর্টের মৃত্যুদ- দেয়ার রায়গুলোও উদাহরণ টেনেছেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার অপরাধগুলো এতই পৈশাচিক, এমন অপরাধে মৃত্যুদ- ছাড়া পৃথিবীর ফৌজদারি আইনের পুস্তকে নির্ধারিত কোন সাজাই তার জন্য পর্যাপ্ত নয়। একমাত্র মৃত্যুদ-ই তার প্রাপ্য। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, কাদের মোল্লার কৃতকর্মের কারণে যে দুর্বিষহ ব্যথা বেদনা ভুক্তভোগী এবং তার আত্মীয় পরিজনরা এমনকি গোটা সমাজ যা আজও বহন করছে, তার কোনই প্রতিকার নেই। তার অপরাধগুলো একমাত্র একটি অসুস্থ মস্তিষ্কই চিন্তায় আনতে পারে। তার অপরাধের ফলাফল সমস্ত জাতিকে অনন্তকাল বয়ে বেড়াতে হবে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বাংলাদেশের বাইরেও তার এসব অপরাধ নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, জীবন নিশ্চিতভাবে মহামূল্যবান। একই কারণে মৃত্যুদ-কে কোন অবস্থায়ই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। সচরাচর মৃত্যুদ- প্রদান করাও কোন অবস্থায় যৌক্তিক নয়। কিন্তু যেক্ষেত্রে একজন অপরাধী এমন অপরাধ সংঘটন করে থাকে যার ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপরাহত হয় এবং যার কারণে গোটা সমাজে ঘৃণার উদ্রেক হয়। সে অবস্থায় মৃত্যুদ- ছাড়া আর কোন সাজা দেয়া যেতে পারে? বর্তমান আপীলকারী আব্দুল কাদের মোল্লাও তেমনি বেশকিছু অপরাধ করেছেন। যার ফলাফল বিস্তৃতভাবে অনন্তকাল ধরে গোটা সমাজকে তার অপরাধের ব্যথা বহন করতে হবে। তার অপরাধগুলো ১৯৭১ সালকে বিশ্ববাসীর জন্য একটি গণধিক্কৃত সাল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
রায়ে আদালত বলেন, সাফাই সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আপীলকারী আব্দুল কাদের মোল্লা বক্তব্য দিয়েছেন, তিনি ১৯৭১ সালে তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল এবং তারা যে পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষার জন্য নিবেদিত ছিল, তা সর্বজন স্বীকৃত। এটাও স্বীকৃত যে, কাদের মোল্লা শুধু ১৯৭১ সাল এবং এর পূর্বকালেই নয় বরং পরবর্তীকালে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও ১৯৭৯ সালে সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন। এ অবস্থায় তার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের দাবি শুধু অবান্তরই নয়, কাল্পনিকও বটে। এই দাবি তুলে তিনি তার সাফাই সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য করে দিয়েছেন।
রায়ে আদালত আরও বলেন, ৬নং অভিযোগ নামায় যে অপরাধগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং যা সাক্ষ্যপ্রমাণে নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণ হয়েছে তা সত্যি হৃদয়বিদারক। পৃথিবীর যে কোন বিবেকবান মানুষের বিবেককে তা নাড়া দিতে বাধ্য। আপীলকারী কাদের মোল্লার নেতৃত্বে যে দস্যুবাহিনী হযরত আলী লস্করের পরিবারের ওপর ঘৃণ্য হত্যাকা- এবং তার নাবালিকা কন্যাদের ওপর ধর্ষণের কাহিনী প্রতিটি মনকে কাঁদাতে বাধ্য। কোন নরপিশাচ দানব ছাড়া এ ধরনের কর্মকা- কারও দ্বারা সম্ভব নয়।
রায়ে বলা হয়, কবি মেহেরুন্নেসা, তার মা এবং ভাইকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জনপ্রিয় কবি কাজী রোজী যে বর্ণনা দিয়েছেন তাও লোমহর্ষক। কবি মেহেরুন্নেসার মস্তিষ্ক দেহ থেকে খ-ন করার পর তার দেহ জবাই করা মুরগির মতো যেমন ছটফট করছিল তখন তার অর্ধ কর্তিত মস্তিষ্কসহ তার দেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এ শুধু হত্যাযজ্ঞই নয়, এ ছিল জিঘাংসা চরিতার্থ করার এক চরম উদাহরণ। সেদিন কবি মেহেরুন্নেসার মা পবিত্র কোরান শরীফ বুকে চেপে ধরেও এসব নরপশুদের হাত থেকে রেহাই পাননি।
সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে বলেন, কবি মেহেরুন্নেসার পরিবারের সদস্যদের হত্যার জন্য আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দ-ে দ-িত হওয়া উচিত। কিন্তু যেহেতু এক ব্যক্তিকে দুবার ফাঁসি দেয়া যায় না সেহেতু শুধু ছয় নম্বর অভিযোগনামার জন্য তার ফাঁসির আদেশ দেয়া হলো।
রায়ে আরও বলা হয়, জীবন মহামূল্যবান বিধায় মৃত্যুদ- দেয়ার পূর্বে পুরো বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট, আমেরিকান সুপ্রীমকোর্ট, আইখম্যানের সাজাদানকারী আদালতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মৃত্যুদ- প্রদানকারী রায় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ভারতের আইন অনুযায়ী মৃত্যুদ- প্রদান করার বিধান থাকলেও সেখানে যাবজ্জীবন কারাদ-কে প্রাধান্য দিতে হয়, সেখানে মৃত্যুদ- তখনই দেয়া হয় যখন সেটিই একমাত্র উপযুক্ত সাজা বিবেচিত হয়। এই নীতি অনুসরণ করে ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট আজমল কাসাভের মৃত্যুদ- বহাল রাখার সময় বলেছিলেন, কোন কোন পরিস্থিতিতে মৃত্যুদ- ছাড়া আর কোন সাজা যথোপযুক্ত হতে পারে না। আইকম্যানকে মৃত্যুদ- দেয়ার সময় প্রথমে বিচারিক আদালত, পরে সর্বোচ্চ আদালত একই মন্তব্য করেছিলেন। এগারজন মানবতাবিরোধী অপরাধীকে মৃত্যুদ- দেয়ার সময় নুরেনবার্গের মার্কিন সামরিক আদালতও একই মন্তব্য করেছিলেন। এদের মধ্যে কয়েকজন আমেরিকার সুপ্রীমকোর্টে রিট মামলা করলেও সেই আদালত মৃত্যুদ-ের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেননি। এখনও পৃথিবীর অনেক দেশে মৃত্যুদ- বিরাজমান রয়েছে। তবে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক অপরাধের জন্য মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়ে থাকে। কাদের মোল্লার অপরাধগুলো একই ধরনের ন্যক্কারজনক।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে হত্যাযজ্ঞ এবং গণধর্ষণ নিয়ে বিশ্ব মিডিয়াতে সে সময় ব- সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে দৈনিক টেলিগ্রাফের সাইমং ড্রিং, টাইমস পত্রিকার পিটার হেজেলহার্স্ট, পাকিস্তানী সাংবাদিক এন্থনী মাসকারনহাসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের বিবরণী সেদিন ব-জনকে কাঁদিয়েছিল। এমনকি পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করা হয়েছিল এবং যে কমিশনের রিপোর্ট কোনদিন প্রকাশ করা হয়নি এবং যে কমিশনের রিপোর্ট পাকিস্তানে পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, সে রিপোর্টের সামনে বক্তব্য প্রদানকালে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল নিয়াজী বলেছিলেন, বাংলাদেশের গণহত্যা এবং গণধর্ষণ জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকা-, চেঙ্গিস খান, তৈমুর লং এবং নাদির শাহের হত্যাকা-কে হার মানিয়ে দেয়। ড. জেফ্রি ডেভিস নামক জনৈক অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক, যিনি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুরোধে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন ধর্ষিতা নারীদের চিকিৎসা এবং গর্ভপাত ঘটানোর জন্য। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ ন্যূনতম চার লক্ষাধিক মহিলা এবং শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যাদের অনেকেই আত্মহত্যা করেছেন। এদের মধ্যে ৫০ হাজারের মতো মহিলা স্বয়ংক্রিয় পন্থায় গর্ভপাত ঘটিয়েছেন। তার মতে, ধর্ষিতা নারীর যে সংখ্যা সচরাচর উল্লেখ করা হয়ে থাকে, তা নিতান্তই একটি রক্ষণশীল সংখ্যা।
সুপ্রীমকোর্ট রায়ে বলেন, সরকারের দায়ের করা আপীল রক্ষণযোগ্য। ৪ নম্বর অভিযোগ থেকে কাদের মোল্লাকে অব্যাহতির ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল করে এই অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করা হলো। ৬ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের যাবজ্জীবন কারাদ-ের আদেশ বাতিল করে তার বদলে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হলো। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদ- কার্যকর করার আদেশ দেয়া হলো। অপরদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কাদের মোল্লার দায়ের করা আপীল খারিজ করা হলো।
আদালত রায়ে বলেন, কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদ-ের রায় প্রদানের সময় ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, সাজার দ-ে অপরাধের মাত্রা এবং অপরাধীর দায়ের মাত্রার প্রতিফলন ঘটতে হবে। অপরাধের মাত্রা যদি কাদের মোল্লার সাজার ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে ৬ নম্বর অভিযোগে কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ দ- প্রদানের ক্ষেত্রে উপযুক্ততম মামলা যেখানে হত্যা এবং ধর্ষণ ছিল বর্বরোচিত, ঠা-া মাথার ও নিষ্ঠুরতম। এই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এই মামলায় যদি ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ সাজা না দেয় তাহলে সর্বোচ্চ সাজা দেয়ার মতো অন্য কোন মামলা পাওয়া কঠিন হবে।
রায়ে আদালত বলে, যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়ার ক্ষেত্রে এর মেয়াদ বলেনি ট্রাইব্যুনাল। যাবজ্জীবন কারাদ-ের মেয়াদ বিষয়ে ১৯৭৩ সালের আইনে কোন বিধান নেই। দ-বিধির ৫৭ ধারা উল্লেখ করে যাবজ্জীবন কারাদ-ের মেয়াদ ত্রিশ বছর বলে যুক্তি দেখানো হলেও ওই ধারায় কোথায় বলা হয়নি যে, যাবজ্জীবন কারাদ-ের মেয়াদ ত্রিশ বছর। তাই যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত আসামীদেরকে তাদের স্বাভাবিক জীবন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে রাখতে কারা কর্তৃপক্ষ বাধ্য, যদি না ওই দ-িতরা ভাল আচরণের জন্য কোন রেয়াত না পায়।
আদালত রায়ে আরও বলেন, ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছে, আদালতের কাজে বিশ্বাসযোগ্য একমাত্র সাক্ষীও সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট। এক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের ৩ ন¤¦র সাক্ষীকে ৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে একমাত্র সাক্ষী বিবেচনায় এনেছে। ট্রাইব্যুনাল এক্ষেত্রে ভুল করেছে। কারণ, রাষ্ট্রপক্ষের ৩ ন¤¦র সাক্ষী ছাড়াও রাষ্ট্রপক্ষের ১, ২, ৪, ৭ এবং ৯ নম্বর পারিপার্শ্বিক সাক্ষী রাষ্ট্রপক্ষের ৩ নম্বর সাক্ষীকে সমর্থন করেছে। তাদের সাক্ষ্য ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে কাদের মোল্লার এই অপরাধ সংঘটনের অসৎ উদ্দেশ্য সমর্থন করে। তার এই অসৎ উদ্দেশ্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, কাদের মোল্লা এ অপরাধ করেছিল।
রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষের ৩ নম্বর সাক্ষী তার মা ও ছোট ভাইয়ের নির্মম ও বর্বর হত্যাকা-ের বর্ণনা দেন। বর্ণনায় বলেন, তাদের দুজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এবং দুই বছরের শিশুকেও মেরে ফেলা হয়। এই সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদানকালে শিশুর মতো কাঁদছিল এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এই হৃদয়বিদারক পরিবেশে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে থমকে দেয়। যে কেউ এই সাক্ষীর সাক্ষ্য পড়লে আবেগ ধরে রাখা কঠিন হবে। এই হত্যাকা- নারকীয়, বর্বরোচিত, জঘন্য ও ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকা- যা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংঘটিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ৩ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে এই উপসংহারে পৌঁছানো যায়, এটি এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী হত্যাকা-ের ঘটনা ছিল যার জন্য যাবজ্জীবন সাজা অপর্যাপ্ত, মৃত্যুদণ্ডই যার উপযুক্ত সাজা। আদালত রায়ে আরও বলেন, কাদের মোল্লা তার সহযোগীদের নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অংশ নেয়। এই অপরাধ সংঘটনের জন্য সে সর্বোচ্চ সাজা এড়াতে পারে না। তার এ বর্বর অপরাধ মানবজাতির বিবেককে দারুণভাবে আহত ও স্তম্ভিত করে। এই কারণেই ৬ নম্বর অভিযোগে কাদের মোল্লাকে দেয়া যাবজ্জীবন কারাদ-ের সাজার ট্রাইব্যুনালের রায় বিবেচনাপ্রসূত হয়নি এবং সাজা প্রদানের নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ৩ ন¤¦র সাক্ষী এই ঘটনার স্বাভাবিক সাক্ষী এবং এ ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী, যাকে পক্ষপাতদুষ্ট সাক্ষী বলা যায় না। এই অপরাধের ঘটনায় মৃত্যুদ-ই কাদের মোল্লার একমাত্র যথার্থ দণ্ড।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here