সাবেক ডিজির স্ত্রীকে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা

31

bdrসিপাহী ইব্রাহিম পিলখানা হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। বিডিআর বিদ্রোহের পর গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর তিনি বিডিআরের তত্কালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের স্ত্রীকে হত্যার দায় স্বীকার করেন। আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁর জবানবন্দিতে ওই দিনের নির্মমতার ও বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার বাস্তব দৃশ্য ফুটে ওঠে। জবানবন্দির অংশবিশেষ হুবহু তুলে ধরা হল:
সিপাহী মো. ইব্রাহিম ২০০৯ সালের ১২ মে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দেন।
ইব্রাহিম জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমি ২০০৪ সালের আগস্টে বিডিআর এ ভর্তি হই। প্রক্ষিণের পর আমি ২০০৫ সালের জানুয়ারি মসে পিলখানার ৪৪ ব্যাটালিয়নের যোগ দেই। আমি ব্যাটালিয়নের ব্যারাকে থাকতাম। ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রধানমন্ত্রীর প্যারেডে আমি দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। তারপর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দরবার হলের স্টেজ সাজানোর কাজ করি। কাজ শেষে আমি রাতে সৈনিক লাইনে থাকি। পরের দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি দরবার হলে ছবি তোলার দায়িত্ব আমার ছিল। তাই ঐ দিন সকাল ৮টার সময় আমি ৪৪ ব্যাটালিয়নের অফিসে যাই এবং সেখান থেকে সরকারি ক্যামেরা নিয়ে দরবার হলে যাই।’
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, ‘ডিজি স্যার ৯টায় দরবারে আসেন। ডিজি স্যার ১৫/১৬ মিনিট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তৃতা করার পর যখন ডালভাত অপারেশন নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন তখন স্টেজের বাম পার্শ্বে রান্না ঘরের পাশ দিয়া ১৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহী মাঈন এসএমজি নিয়ে দেৌড়ে স্টেজে উঠে ডিজি স্যার-এর দিকে অস্ত্র তাক করে। সাথে সাথে ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহী কাজল রাইফেল নিয়ে একই দিক দিয়া স্টেজে উঠে। সিপাহী কাজল ডান হাত উঁচু করে বিডিআর সবাই এক হও বলে স্লোগান দেয়। সিপাহী মঈন তখন কাঁপতে কাঁপতে অস্ত্র নিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর ২/৩ জন বিডিআর রাইফেল হাতে একই দিক দিয়ে স্টেজে উঠে আসে। তখন আমি স্টেজের এক কোনায় পিলারের সাথে দাঁড়ানো। কর্নেল মজিবুল হক ও কর্নেল আনিসুর রহমান ডিজি স্যারকে রক্ষা করার জন্য স্টেজে উঠে আসে। তখন একজন বিডিআর জওয়ান রাইফেলের বাট দিয়া কর্নেল আনিসুরকে মারলে তিনি স্টেজে পড়ে যান। এরকম অবস্থায় দরবার হলে থাকা সকল আর্মি অফিসার, ফোর্স জেসিও দাঁড়িয়ে যায়। হঠাত্ স্টেজের উপর ৩/৪ রাউন্ড গুলি হয় ফাকা গুলি। দরবারের সব বিডিআর যারা নিচে বসা ছিল, যারা পেছনে চেয়ারে ছিল সবাই দৌড়ে পালাতে থাকে। ডিজি স্যার তখন সকল সিএসএমদেরকে নিজ নিজ ফোর্সকে সামলানোর নির্দেশ দেন এবং পৃথক পৃথক দরবার নিয়ে দাবি-দাওয়া শোনার নির্দেশ দেন। গুলির শব্দে অনেক অফিসার দরবারের স্টেজের পেছনের পর্দার আড়ালে লুকান আবার অনেক অফিসার দরবার হল থেকে পালিয়ে যান। তারপর ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহী সেলিম স্টেজের বাম পাশ দিয়া স্টেজে উঠে আসে। সে হ্যান্ডমাইক দিয়ে পর্দার আড়ালে থাকা-লুকিয়ে থাকা অফিসারদেরকে বের হতে বলে। সে ইংরেজিতে বলে- ‘অল অফিসার্স ওয়ান লাইনে ফালন।’ সে ইংরেজিতে আরও কিছু বলে। আমি সব বুঝি নাই। জানালা দিয়া দরবার হলের বাহিরে কেনো গেঞ্জি এবং অস্ত্র হাতে অনেক বিডিআর জওয়ানকে দেখি। সিপাহী সেলিমের এনাউন্সে প্রথমে তিন জন মহিলা অফিসার ৪/৫ জন পুরুষ অফিসার বের হয়। তারপর আস্তে আস্তে ডিজি, ডিডিজি, সেক্টর কমান্ডারগণসহ আনুমানিক ১৫/১৬ জন অফিসার বের হয়। সিপাহী সেলিম সব অফিসারদেরকে বলে ‘গো ওয়ান বাই ওয়ান’। দরবারের ভিতরে তখন ২০/২২ জন অস্ত্রধারী বিডিআর এবং অস্ত্র ছাড়া আরও কয়েকজন বিডিআর সব অফিসারদেরকে লাইন ধরে পশ্চিম দিকের গেইটের দিকে নিয়া যায়। বাহিরে তখন প্রচুর গোলাগুলি হচ্ছিল। আমি তখন স্টেজের সামনে ছিলাম। অস্ত্রের মুখে অফিসারদের লাইনের প্রথমে ডিজি তারপর সেন্ট্রাল এস,এমসহ অন্য অফিসাররা ছিলেন। অফিসারদের লাইন যখন বের হচ্ছিল, দরজার কাছে আসতেই ব্রাশ ফায়ার হয়। সাথে সাথে ডিজি স্যার, সেন্ট্রাল এস,এম পড়ে যায়। এরপর আবার অনেক গুলি হয়-ব্রাশ ফায়ার হয়। তখন ৫/৬ জন অফিসার পড়ে যায়। তারপর সিপাহী সেলিম আমাকে একটা রাইফেল দিয়ে গুলি করতে বলে। আমি তখন দক্ষিণ গেইটের কাছে। দরবারের ভিতরের দক্ষিণ দিকের গেইট। তারপর আমি রাইফেল দিয়ে একজন অফিসারকে গুলি করি। সে পড়ে যায়। আমি এই অফিসারের নাম জানি না। তারপর অস্ত্র সেখানে ফেলে ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অফিসে চলে যাই। সেখানে প্রায় ১১টা পর্যন্ত থাকি। বাহিরে গাড়ি দিয়ে মাইকিং করে সবাই অস্ত্র নিতে বলে। কোন বিডিআর অস্ত্র ছাড়া থাকলে তাকে গুলি করে মারা হবে।
আমি তখন অফিস হতে বের হয়ে সেন্ট্রাল কোয়ার্টার গার্ড-এ যাই। অস্ত্র আনার জন্য। আমি একটা রাইফেল এবং ২০ রাউন্ড গুলি নেই। অস্ত্র নিয়ে আমি হাটতে হাটতে সদর ব্যাটালিয়নের অফিসের সামনে আসলে ১৫/২০ জন সশস্ত্র বিডিআরকে দেখি। এর মাঝে আমি ৪৪ ব্যাটালিয়নের সিপাহী সেলিম, সিপাহী আলতাফ, সিপাহী হাবিব, সিপাহী ওবায়দুরকে চিনতে পারি। প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে আমি, সিপাহী সেলিম, সিপাহী হাবিব, সিপাহী আলতাফ, সিপাহী ওবায়দুর, সিপাহী শাহীনসহ ১৫/২০ জন বিডিআর ডিজি স্যারের বাংলোতে যাই। বাংলোর গেইটের সামনে ভবন গার্ড হাবিলদার বাবুল বাধা দিলে সিপাহী সেলিম পায়ে গুলি করে বাবুলকে ফেলে দেয়। বাংলাতো গুলি। ফাঁকা ফায়ার করতে থাকি। আমি ২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করি। ডিজি ম্যাডাম (নাজনীন শাকিল শিপু) দোতলা হতে নেমে আসেন। পড়নে ম্যাক্সি ছিল। ম্যাডামকে সিঁড়িতে হাবিব, আলতাফ, সেলিম আর ২/৩ জন ধরে ফেলে এবং মুখ বেধে ফেলে। আমি আর ওবায়দুর পাশে দাঁড়াইয়া ছিলাম। তারপর ম্যাডামকে কুক হাউজে নিয়ে সিপাহী হাবিব, সিপাহী সেলিম, সিপাহী ওবায়দুর, আমিসহ ৩/৪ জন মিলে লাঞ্ছিত করি। এরপর ২ জন সিপাহী দোতালায় উঠে গিয়ে ফাঁকা ফায়ার করে এবং জিনিসপত্র তছনছ করে। এরপর আরও ২/৩ জনসহ আমি দোতালায় যাই। গিয়ে দেখি ৩ জন বিডিআর ১৫/২০ বছরের একটি মেয়েকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেছে। মেয়েটির কান্নাকাটির জন্য আমি দুই রাউন্ড গুলি করি। মেয়েটি মারা যায়। হঠাৎ নিচে গুলির শব্দ পাই। নিচে নেমে দেখি ম্যাডামকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিপাহী সেলিমসহ আরও ২/৩ জন গুলি করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here