‘সাক্ষ্য-প্রমাণ অদৃশ্য’ তারেক রহমান নির্দোষ

13

Tarek plবিদেশে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে করা মামলায় খালেদা জিয়ার ছেলে, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে খালাস দিয়েছেন আদালত। তবে তাঁর বন্ধু ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
গতকাল রোববার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মো. মোতাহার হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত আনা ২০ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ে বলা হয়, তারেক রহমান ২০০৭ সালের ৭ জুন দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করা অর্থের কথা উল্লেখ করেছেন। তারেক রহমান টাকা উত্তোলন ও ব্যয় করার বিষয়টি গোপন বা আড়াল করেননি। ফলে ২০০২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধ করেননি। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণ সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হননি।
দুদকের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, সম্পদ বিবরণীর বিষয়টি সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে উপস্থাপনই করা হয়নি। কিন্তু এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে আদালত কিছু কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রায় দিয়েছেন, তা আইনসিদ্ধ হয়নি। তিনি বলেন, তারেক রহমানের পক্ষে কোনো জেরা করা হয়নি। দুদকও সাক্ষ্য হিসেবে এ ধরনের কোনো কাগজ উপস্থাপন করেনি। তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে আদালতে তা কীভাবে এল?

অপর কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন বলেন, তারেক রহমানের সম্পদ বিবরণীর বিষয়টি মামলায় বিবেচ্য ছিল না। অথচ আদালত সম্পদ বিবরণীতে ওই অর্থের বিষয় উল্লেখ রয়েছে বলে তারেক রহমানকে খালাস দিয়েছেন। তিনিও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তারেকের সম্পদ বিবরণীর এই তথ্য কীভাবে এল।

রায় ঘোষণা: বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। সোয়া ১২টার দিকে রায় ঘোষণা শেষ করার পরপরই উপস্থিত বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ‘খালাস খালাস’ বলে উল্লাস প্রকাশ করে আদালতকক্ষ ত্যাগ করেন। আর এজলাসকক্ষে নির্ধারিত আসনে বসা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু এবং দুদকের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক, মোশাররফ হোসেনসহ বেশ কয়েকজনকে ঘিরে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা বিক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা মামলা পরিচালনায় তৎপর না থাকার অভিযোগ তোলেন। পরে অন্যান্য আইনজীবীর সহায়তায় সাড়ে ১২টার দিকে আনিসুল হক এজলাসকক্ষ ত্যাগ করেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা এজলাসকক্ষের বাইরের বারান্দায় ‘ধর ধর’ ও ‘দালাল দালাল’ বলে কটূক্তি করেন। পরে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা বিশেষ জজ আদালত-৩-এর নেজারত শাখার দরজায় ধাক্কা দেন। পুলিশ এসে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের সরিয়ে দেন। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি দুঃখিত। আমার শুধু এটুকুই বলার আছে।’

রায়ে যা বলা আছে: সংক্ষিপ্ত রায় পাঠ করে বিচারক বলেন, মামলায় ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে দুজন ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তাঁরা হলেন নির্মাণ কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান খাদিজা ইসলাম ও মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের প্রতিনিধি ডেবরা লাপ্রোভোত্তে। খাদিজা ইসলাম তাঁর সাক্ষ্যে কোথাও বলেননি যে তিনি গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ঘুষ দিয়েছেন। বরং বলেছেন, টঙ্গীতে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য পরামর্শক ফি হিসেবে তিনি এই টাকা দিয়েছেন। টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে মামুন দেশে লেনদেন করতে রাজি না হওয়ায় চীনের হারবিন কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে খাদিজা ইসলাম সাড়ে সাত লাখ মার্কিন ডলার ২০০৩ সালের ৩১ জুলাই সিঙ্গাপুরের সিটি ব্যাংকে জমা করেন।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সিঙ্গাপুরে সিটিব্যাংক এনএতে গিয়াসউদ্দিন মামুন তাঁর হিসাবে ওই অর্থ জমা করেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন ওই টাকার বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি বলে দুদক আইনে করা পৃথক মামলায় তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে। মামলার সাক্ষী খাদিজা ইসলাম ২০০৭ সালে চাঁদা দাবির অভিযোগে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। মামুন ওই মামলায় তারেক রহমানকে জড়িয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ফৌজদারি ওই মামলাটি এই মামলায় সাক্ষ্য হিসেবে আসবে না।

রায়ে বলা হয়, আসামি গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৬১৩ টাকা বাজেয়াপ্ত করা হলো। এই মামলায় মামুনের হাজতবাস সাজার মেয়াদ থেকে বাদ যাবে। গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়।

তারেক রহমান যে কারণে খালাস: সাক্ষী পর্যালোচনা করে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আসামি তারেক রহমান কাজ পাইয়ে দিতে খাদিজা ইসলামের কাছে কোনো অর্থ দাবি করেননি। কিন্তু মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিতে মামুন খাদিজার কাছে অর্থ দাবি করেন। এজাহার ও বাদীর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, খাদিজা ইসলাম মামুনকে ঘুষ দিতে বাধ্য হন। কিন্তু বাদী তদন্ত কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেননি যে আসামি তারেক রহমান খাদিজার কাছে অর্থ দাবি করেছেন। তাই তারেক রহমান মানি লন্ডারিং অপরাধে মামুনের সহযোগী ছিলেন তা আদৌ প্রমাণিত হয় না।

রায়ে বলা হয়েছে, সাক্ষী ডেবরা লাপ্রোভোত্তে সাক্ষ্যে বলেছেন যে তারেক রহমান ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছেন। এ বিষয়ে কিছু কাগজপত্র তিনি আদালতে দাখিল করেছেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, ৫৪ হাজারের বেশি ইউএস ডলার ব্যয় করেছেন এবং তারেক রহমান এই অর্থের উৎস প্রকাশ করেনি। অথচ সাক্ষ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারেক রহমান তাঁর সম্পদ বিবরণীতে ওই অর্থ দেখিয়েছেন। খরচ করা অর্থ আড়াল বা গোপন করেননি। তাই আসামি তারেক রহমানকে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ১৩ ধারায় মানি লন্ডারিং আইনের অপরাধের দায় হতে খালাস দেওয়া হলো।

আদালত চত্বর: তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে করা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত চত্বরে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। র‌্যাব ও পুলিশের প্রচুর সদস্য দাঙ্গা দমনের উপকরণসহ মোতায়েন ছিলেন। চত্বরে ঢোকার ফটকগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে, পরিচয় জিজ্ঞেস করে লোকজনকে ঢুকতে দিচ্ছিলেন পুলিশের সদস্যরা।

সকাল থেকেই বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা রায় ঘোষণার পর বিক্ষোভের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁরা ধরেই নিয়েছিলেন যে তারেক রহমানের বিপক্ষে রায় হবে। ক্যামেরাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা তখন আদালত ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠিক দুপুর সোয়া ১২টায় ছয়তলা থেকে একসঙ্গে বহু কণ্ঠের চিৎকার শোনা যায়। নিচে দাঁড়ানো কিছু বিএনপিপন্থী আইনজীবী হাত উঁচিয়ে স্লোগান শুরু করেন ‘জ্বালো জ্বালো’। তখনই ষষ্ঠতলা থেকে বিএনপিপন্থী অন্য আইনজীবীরা তাঁদের বিজয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘খালাস খালাস’। ষষ্ঠতলা থেকে কয়েকজন দৌড়ে নিচে নেমে আসেন। শুরু হয় আনন্দ মিছিল, স্লোগান ও টিভি ক্যামেরার সামনে আইনজীবীদের মুখ দেখানোর প্রতিযোগিতা, প্রচণ্ড ঠেলাঠেলি আর গুঁতোগুঁতি। তাঁরা স্লোগান দিতে থাকেন ‘তারেক জিয়ার বাংলাদেশ, বাকশালীদের দিন শেষ’। এর মধ্যেই প্রথম সারির বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা নিচে নেমে গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান।

এ সময় একজন আইনজীবী একটি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আসেন। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় প্যাকেট। এরপর তাঁরা মুড়ির মোয়া খেয়ে মিষ্টিমুখ করেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়া: বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন তারেক রহমানের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আদালত ন্যায়বিচার করেছেন। আজ প্রমাণিত হয়েছে, তারেক রহমান একটি পয়সাও কোথাও পাচার করেননি।

আনিসুল হক এ সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায় পূর্ণাঙ্গ পড়ে তার পরে আপিলের কথা চিন্তা করব।’

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যত মামলা: তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৬ জুলাই এ মামলার বিচারকাজ শুরু হয়েছিল। উল্লিখিত মামলাটি ছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২১ আগস্ট ছাড়া বাকি মামলাগুলোর কার্যক্রম হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। আর গ্রেনেড হামলা ও হত্যা মামলায় তারেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

এ ছাড়া, ২০১১ সালের ২৩ জুন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে পলাতক দেখিয়ে অর্থ পাচারের অপর এক মামলায় ছয় বছরের কারাদণ্ড এবং ১৯ কোটি টাকা জরিমানা করেন আদালত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here