সহিংস রাজনীতির শিকার গাছ অবরোধের নামে লক্ষাধিক গাছ নিধন, পরিবেশ কর্মীরা নিরব

26

Treeসহিংস রাজনীতির বলি হচ্ছে দেশের মূল্যবান বৃক্ষসম্পদ। বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের সাম্প্রতিক হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে গতকাল রবিবার পর্যন্ত সারাদেশে কাটা পড়েছে লক্ষাধিক গাছ। শুধু তাই নয় এসব কাটা গাছ হরিলুটেরও খবর পাওয়া গেছে। এদিকে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়ার নামে গাছ নিধনের এই মহোত্সব চালানো হলেও পরিবেশ কর্মীরা আশ্চর্যজনক ভাবে এ ব্যাপারে নীরব রয়েছেন। তাদের এই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।

জানা গেছে, এ পর্যন্ত ২০টি জেলায় সর্বাধিক গাছ কাটা হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা, যশোর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও চাঁদপুর জেলায় গাছ নিধন হয়েছে বেশি। ঐ সব জেলার সড়কগুলো প্রায় গাছশূন্য হয়ে গেছে। সাধারণত রাজনৈতিক কর্মসূচির আগের রাতে দলের কর্মীরা ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে রাখছে। তারা যে করাত দিয়ে গাছ কাটছে, তা সাধারণত এদেশে তৈরি হয় না। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ক্যাডার বাহিনীর কাছে এ করাত দেখা গেছে। তারাই গাছ কেটে সাবাড় করছে। আফগানিস্তানে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়ার জন্য গাছ কাটতে সেই করাত ব্যবহার করা হয় বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে।

পরিবেশ, বন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ এবং সড়ক ও জনপদ থেকে জানানো হয়, গত মে থেকে গতকাল পর্যন্ত সারাদেশে হরতাল -অবরোধে প্রায় এক লাখ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় সেই গাছ লুট হয়ে গেছে। মামলা করা ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকে এ বিষয়ে তেমন ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক গোলাম রাব্বানী বলেন, সামাজিক বনায়নের একটি অংশ গাছ। বেশির ভাগ গাছের মালিক বন বিভাগ। এ কারণে বন অধিদফতর গাছ কাটার বিষয়টি দেখছে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা দরকার তা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে মোকাবিলা করতে মুক্তিযোদ্ধারা কোন গাছ কাটেন নি। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। এ যেন আমাদের সন্তানদের মাথা কেটে ফেলার মতো ! এমন দৃশ্য আমরা আর দেখতে চাই না !

বন অধিদফতরের মহাপরিচালক ইউনুস আলী বলেন, বন বিভাগের অধীনে এ পর্যন্ত ১৫ সহস্রাধিক গাছ কাটার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে ১২৫টি মামলা হয়েছে। গাছ কাটার তালিকা ও মামলার কার্যক্রম হালনাগাদ অব্যাহত রয়েছে বলে মহাপরিচালক জানান।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুর রহমান বলেন, রাস্তার পাশে এলজিইডির অনেক গাছ রয়েছে। সেই সব গাছ কাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাযিত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। কি পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে, এলজিইডির পক্ষ থেকে তা নিরূপণের কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

এদিকে মাইলের পর মাইল বিভিন্ন জেলায় গাছ কেটে সাবাড় করে ফেলা হলেও দেশের পরিবেশবাদিদের নিশ্চুপ থাকার বিষয়টি রহস্যজনক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, রাজধানী ও এর আশপাশে জলাধারের পাশে ভবন ও কারখানা হলে কিংবা কোন গাছ কাটা হলে পরিবেশবাদিরা আন্দোলনে নেমে পড়েন। ওই সব কার্যক্রম বন্ধে তারা রাস্তা থেকে আদালত পর্যন্ত যান। অথচ হরতাল-অবরোধে নির্বিচারে গাছ কেটে উজাড় করার বিষয়টি দেখেও তারা নিশ্চুপ রয়েছেন। বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, সাম্প্রতিক অবরোধে কক্সবাজারে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং বনবিভাগের ৫৪টি গাছ কাটা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে থানায় আলাদাভাবে সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছে। কর্তিত গাছের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে মাত্র দুটি। তবে এসব ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, মহাসড়কের পাশে যেসব গাছ কাটা হয়েছে সেগুলো সবই স্থানীয় সড়ক বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সম্প্রতি একই এলাকায় ৬০ কিলোমিটার রাস্তার গাছ কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। সহকারী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানান, কড়ই গাছ ছাড়াও কেটে ফেলা অন্য গাছের মধ্যে আছে শিশু, মেহগনি, ইউক্যালিপটাস প্রভৃতি।

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের প্রাণী বিভাগের এক শিক্ষক জানান, নির্বিচারে গাছ কাটার পর গাছ পুনরায় রোপণ না করলে পরিবেশ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে। এ তাণ্ডব যারা চালিয়েছে, এক অর্থে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করল।

যশোর অফিসের স্টাফ রিপোর্টার আহমেদ সাঈদ বুলবুল জানান, গত আড়াই মাসে যশোরের ৬ উপজেলায় বিভিন্ন সড়কের হাজার হাজার গাছ কাটা হলেও জেলা পরিষদের এজাহারে ৩৭৬টি এবং বন বিভাগের ৯৩০টি গাছ কাটা পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা পরিষদের অত্যন্ত মূল্যবান প্রাচীন এসব গাছের দাম প্রকৃত মূল্যের অনেক কম ৩১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। বন বিভাগের গাছ ছোট ও চিকন হওয়ায় এগুলো তেমন দামি নয় বলে জানিয়েছেন জেলা বন কর্মকর্তা জহুরুল আলম।

যশোরের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, জেলা পরিষদের কাটা পড়া গাছ অত্যন্ত মূল্যবান। আমি তাদের বলেছি, দ্রুত এসব গাছ উদ্ধার করে যশোর শহরে এনে অকশন দিতে। কিন্তু তা না করে গোপনে বিক্রি করে থাকলে তো আরেক ‘মহামারি’ হবে! আমি দেখছি কত দ্রুত এটা উদ্ধার করা সম্ভব।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, হরতাল আর অবরোধের নামে সাতক্ষীরা জেলার সড়ক মহাসড়ক এমনকি গ্রামাঞ্চলের রাস্তার দু’পাশের গাছ কেটে সাবাড় করছে জামায়াত-শিবির। সাতক্ষীরার ফরেস্ট রেঞ্জার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এফ এন টি সি মো: তোজাম্মেল হক জানান, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ১২০০ কিলোমিটার রাস্তার দু’ধারে প্রায় তিন শতাধিক গাছ কেটেছে অবরোধকারীরা। এসব গাছ উদ্ধার করতে গিয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে জনগণ ও অফিসের কর্মকর্তারা। ফলে তাদের পক্ষে সব গাছ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে ১৬টি মামলা হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মনিরুজ্জামান জানান, তাদের অর্ধশত গাছ কেটেছে অবরোধকারীরা। মামলা হয়েছে তিনটি। তবে পরিবেশবাদীদের পক্ষ থেকে কোন মামলা করা হয়নি।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ৩২ কিলোমিটার গাইবান্ধা জেলার অন্তর্গত। সওজ এর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আব্দুস সালাম খান জানান, তার এলাকার অর্ধশতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটা হয়েছে। তবে এনিয়ে তিনি কোন মামলা করেন নাই। তার মতে মামলা করবে পুলিশ।

জেলা পরিষদের অধীন গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কের দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। এ সড়কের দুই ধারের প্রায় অর্ধশতাধিক গাছ কাটা হয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাহী কর্মকর্তা কল্লোল চক্রবর্তী জানান, দুই-তিন জায়গায় স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় সামান্য কয়েকটি গাছ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বেশিরভাগই হরিলুট হয়েছে। এনিয়ে পলাশবাড়ী থানায় একটি মামলাও করেছে জেলা পরিষদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here