সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে যা করা দরকার সবই করব, কমান্ড ও স্টাফ কলেজের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

21

pm1প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান বিশ্বে সশস্ত্র বাহিনীর বহুমাত্রিক ভূমিকার কথা বিবেচনা করে এই বাহিনীকে বাস্তবসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন নতুন পরিবর্তনের ফলে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ও দায়িত্বে এসেছে বহুমাত্রিকতা। সশস্ত্র বাহিনীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও পরিবর্তিত সময়ের এই চাহিদার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। সামরিক বাহিনী কমান্ড ও স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব আরোপ করায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে সামরিক বাহিনী কমান্ড ও স্টাফ কলেজের (ডিএসসিএসসি) স্নাতক ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে সার্টিফিকেট প্রদান করেন।

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ, মন্ত্রীবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, নৌ বাহিনী প্রধান ভাইস এডমিরাল ফরিদ হাবিব, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মুহাম্মদ এনামুল বারি, স্বরাষ্ট্র বাহিনী বিভাগের পিএসও, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণ, কূটনীতিক, উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনী আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূর্ত প্রতীক। প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সুমহান দায়িত্ব আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর উপর ন্যস্ত। এ পবিত্র দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমাদের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায়ও প্রশংসনীয় অবদান রাখছেন।

তিনি বলেন, শুধু দেশেই নয়, বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসা ও সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁদের সাফল্যে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে এ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্টাফ কলেজ আজ এক অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিগণিত।

তিনি বলেন, “আমাদের সমপদ সীমিত। আর সে সীমিত সমপদ দিয়েই আমরা একটি যুগোপযোগী, দক্ষ ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে চাই।” সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন অফিসারদের প্রশিক্ষণের জন্য ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, এমআইএসটি, আর্মস ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ সেনাবাহিনীর সমপ্রসারণ ও আধুনিকায়নে অনেকগুলো ইউনিট গঠন করা হয়। তিনি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, “আমাদের গত মেয়াদে ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে বহু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। এবারও সরকার গঠন করার পর আমরা এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছি। সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য যা যা করা দরকার আমরা সবই করব।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সবসময় জনগণের সেবক হিসাবে দেশ পরিচালনা করতে চায়, কখনই শাসক হিসাবে নয়। আমরা অনিয়ম-দুর্নীতির প্রশ্নে কাউকেই ছাড় দেইনি। সর্বাত্মক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছি। ডিজিটাল প্রযুক্তি সর্বব্যাপী করে জীবনযাত্রা সহজ ও স্বচ্ছ করেছি। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস নির্মূল করেছি। দেশসেবায় আমরা আপনাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা পেয়েছি।

আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশ হিসাবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে-এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং এ বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতিও হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে ১০৪৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে রপ্তানি আয় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী গ্র্যাজুয়েট অফিসারদের পেশাগত জীবনের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করে বলেন, “কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আপনারা সমর বিজ্ঞানে উচ্চতর জ্ঞানলাভ করেছেন। আমার বিশ্বাস, এ প্রশিক্ষণ অর্পিত দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন এবং যেকোন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আপনাদের আরও আত্মপ্রত্যয়ী করবে।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সকল দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসী। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। বিশ্ব শান্তি রক্ষা এবং সকল প্রকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট-একথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই আদর্শকে সামনে রেখে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

বন্ধুপ্রতীম দেশের গ্রাজুয়েট অফিসারদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সমপর্ক ক্রমেই গাঢ় হবে। এখানে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সমপর্কে বিদেশি গ্রাজুয়েটদের ধারণা হয়েছে এবং নিজ দেশে ফিরে গিয়ে তারা সম্মানিত এ্যাম্বাসেডর হিসাবে এ দেশের জনগণের শুভেছা এবং এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও অতিথিপরায়ণ জনগণের কথা তাদের দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দেবেন-এই প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ বছর মোট ১৮৮ জন অফিসার ডিএসসিএসসি কোর্স শেষ করেন। এর মধ্যে ১০০ জন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর, ২৩ জন বাংলাদেশ নেভির, ২১ জন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এবং অবশিষ্ট ৪৪ জন চীন, মিসর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, আইভরি কোস্ট, জর্ডান, কুয়েত, লাইবেরিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সৌদি আরব, সিয়েরা লিয়েন, শ্রীলংকা, তানজানিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, এবং জিম্বাবুয়ের।

ডিএসসিএসসি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর তিন বাহিনীর প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। এই ইনস্টিটিউটের উদ্দেশ্য হচ্ছে কমান্ড ও স্টাফ নিয়োগে তিন বাহিনীর কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত করা। এ পর্যন্ত ২৯৬৫ জন বাংলাদেশি অফিসার ও ৩৭টি দেশের ৮০৮ জন বিদেশি অফিসার এ কলেজ থেকে স্নাতক কোর্স করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here