সরকার অবৈধ’ প্রশ্নে সংসদ উত্তপ্ত

15

parliamentপয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন আজ রবিবার রাতে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন রেখে বলেন, ডেপুটি স্পিকার আপনার কাছে জানতে চাই, বিরোধী দলীয় নেতার কথা অনুযায়ী বর্তমান সরকার অবৈধ কি না? জবাব দিতে গিয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, অনেকে অনেক কথা বলেন। এসব কথার কোন সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। আমরা সংবিধান মেনে চলব। মহাজোটের সংসদ সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিরোধী দলের নৈরাজ্য কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। কারণ প্রধানমন্ত্রী সংলাপের উদ্যোগ নিলেই বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া আল্টিমেটাম দিয়ে তা নস্যাত্ করে দেন।

প্রায় ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাতীয় পার্টির (এ) মো. মুজিবুল হক ও জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল।

আমির হোসেন আমু বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার আন্দোলন তত্ত্বাবধায়কের ছাতির নীচে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার আন্দোলন। তিনি কোনদিনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বিশ্বাস করেননি। এখনও যে বিশ্বাস করেন না, তা আমরা বারবার প্রমাণ দিয়েছি। তাদের আন্দোলন গণতান্ত্রিক নয়। বাংলাদেশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার আন্দোলন। আসলে খালেদা জিয়া জামায়াতের কাছে জিম্মি। প্রধানমন্ত্রী ফোন করে প্রমাণ করেছেন তিনি দেশ ও জাতির ভাল চান। হানাহানির বদলে শান্তি চান। অথচ খালেদা জিয়া সামান্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার দেখাতে পারেননি।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া এমন এক পর্যায়ে গিয়েছেন যে, বলতে পারেন আওয়ামী লীগ একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাও আওয়ামী লীগ করেছেন এমন কথা বলতে পারেন। জাতীয় পতাকা, সংবিধান, স্বাধীনতার প্রতিও তাঁর ন্যুনতম শ্রদ্ধাবোধ নেই। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে বিপন্ন করতে খালেদা জিয়া নৈরাজ্যের পথ বেছে নিয়েছেন। আন্দোলনের নামে দেশের শান্তি বিনষ্ট, হরতালের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনেও দেশের মানুষ খালেদা জিয়াকে চিরতরে প্রত্যাখ্যান করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে ইনশাল্লাহ।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়া তার কথা রাখেননি। তিনি দু’দিনের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ না নিলে ৬০ ঘণ্টার হরতাল করবেন বলে সমাবেশে বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী একদিনের মধ্যেই বিরোধী দলের নেতাকে ফোন করে সংলাপে বসার আহ্বান জানালেন। সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণের পরও বিরোধী দলীয় নেতা কেন হরতাল দিয়ে মানুষ হত্যা করছেন? দেশ ও জাতির প্রতি ন্যুনতম শ্রদ্ধাবোধ থাকলে বিরোধী দলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিতেন। যখনই প্রধানমন্ত্রী সংলাপের উদ্যোগ নেন, তখনই খালেদা জিয়া আল্টিমেটাম দিয়ে তা নস্যাত করে দেন। ২৭ তারিখ থেকে সরকার অবৈধ হলে, এখন সরকার কে? তিনি (খালেদা জিয়া) কী অন্য কাউকে দাওয়াত দিচ্ছেন, গনতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন?

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী টেলিফোনে খালেদা জিয়াকে বলেছেন, আমি আপনার দলের লোককে নিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে চাই। আপনি কী আপনার দলের লোককেও বিশ্বাস করেন না? জামায়াত একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের নিয়ে চলছেন কেন? প্রধানমন্ত্রীর একথার জবাবে খালেদা জিয়া উত্তরে বলেন, আপনারাও তো একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছেন? একথা যে নেত্রী বলতে পারেন, তিনি কী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করতে পারেন? দেশের মানুষকে বিচার করতে হবে, খালেদা জিয়া দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান? খালেদা জিয়ার আন্দোলন যে স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য- এটা আজ দেশবাসীর সামনে দিবালোকের মতো পরিস্কার। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুসহ ছোট শিশু রাসেলেও নির্মম হত্যাকান্ডের দিন মিথ্যা জন্মদিন পালন না করার অনুরোধ জানালে খালেদা জিয়া বলেন, ১৫ আগস্ট কী কারোর জন্মদিন পালন হতে পারে না? কী হূদয়হীন নেত্রী তিনি।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, কোন আইনে সরকার অবৈধ হয়েছে বিরোধী দলীয় নেতাকে তার ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি আসলে সমঝোতা নয়, চান নৈরাজ্য। অবৈধভাবে হরতাল ডেকে খালেদা জিয়া ১১ জন মানুষকে হত্যা করেছেন, এর দায়-দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে।

তিনি বলেন, দেশ ও জাতির স্বার্থে রাজনৈতিক ৪২ বছরের ইতিহাস ভঙ্গ করে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীর কাছে ফোন করেছেন। সেখানেও শালীনতা প্রদর্শন করেননি খালেদা জিয়া। নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নিলেই রাষ্ট্র, সরকার কিংবা সংসদ অবৈধ হয়ে যায় না। ক্ষমতা পরিবর্তনের একটিই পথ তা হলো নির্বাচন। আরেকটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সরকার বৈধ। সরকারকে অবৈধ বলে খালেদা জিয়া ‘রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ ও সংবিধান লংঘন’ করেছেন। সরকার অবৈধ হলে সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারাও অবৈধ হয়ে যাবে, বেতন-ভাতা কী বিরোধী দলীয় নেত্রী দেবেন? আপনি দেশে কী করতে চান? স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চান, জবাব পাবেন। আগুন নিয়ে খেলবেন না। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করতে চান, সরকারকে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। বিএনপিকে চালাচ্ছে জামায়াত, খালেদা জিয়াও চলছেন এই স্বাধীনতাবিরোধী দলটির ইশারায়।

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, খালেদা জিয়া যখনই আল্টিমেটাম দেন, তখনই গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতির স্বার্থে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানালেন। অথচ খালেদা জিয়া হরতাল প্রত্যাখ্যান না করে জ্বালাও-পোড়াও করে মানুষ হত্যা করছেন। এমনকি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার মেনে নিলেই তিনি সংলাপে আসবেন- এমন পূর্ব শর্তও জুড়ে দিয়েছেন তিনি। আসলে জামায়াত এখন খালেদা জিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি বলেন, সরকার অবৈধ হলে অবৈধ হবে সংসদও। সরকার অবৈধ হলে রক্তস্নাত পতাকা নিয়ে খালেদা জিয়া আপনি কীভাবে ঘুরেন, আপনিও তো অবৈধ। আপনি তো স্বাধীনতাই মানেন না, আপনার তো এদেশেই থাকার কোন অধিকার নেই।

মেনন বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা সংবিধানের বাইরে একটি অসাংবিধানিক সরকার করতে চাচ্ছেন। তারা কাউন্টার রেভুলেশনের মাধ্যমে একাত্তরের মত একটি ঘটনা দিয়ে একাত্তরের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তারা সাঈদীর রায় নিয়ে ৪১টি জেলায় মুক্ত অঞ্চল চালাচ্ছেন। বিচারপতি, মন্ত্রীর বাসায় বোমা মেরেছে। একাত্তর টিভি ও দেশ টিভিতে হামলা করেছে। এছাড়া যেসকল সংবাদপত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলে তাদের ওপর হামলা করেছে। আর এসব ঘটনা ঘটিয়ে তারা তাদের আসল চেহারা উন্মুক্ত করেছে।

তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া প্রেসক্লাবে পেশাজীবী সমাবেশে বলেছেন ২৪ অক্টোবরের পর এ সরকার অবৈধ। আবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে বলেছেন ২৭ অক্টোবর থেকে সরকার অবৈধ এটা সাংবিধানিকভাবে বলতে পারেন কি না সেটা দেখা দরকার। সরকারের বৈধতা নিয়েও তিনি একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি প্রশাসনকে সহায়তা না করার কথা বলছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here