সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে দেশ : প্রধানমন্ত্রী অমর একুশের গ্রন্থমেলা উদ্বোধন

42

J News

সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে দেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য অনুবাদ সাহিত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, আমাদের সাহিত্যের ধ্রুপদী ও স্বনির্বাচিত সাহিত্য সম্ভার বিশ্ব পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাপকভিত্তিক ও মানসম্মত অনুবাদ অতীব জরুরি। আমি প্রতিবারই যখন বইমেলায় আসি অনুবাদের ওপর খুব গুরত্ব দিয়ে থাকি। আমাদের গ্রন্থ, সাহিত্য যেমন অন্যভাষায় অনুবাদ হবে তেমনি অন্যভাষার সাহিত্যও বাংলা ভাষায় অনুবাদ হলে আমরা সেদেশের ভাষা-সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারব। তিনি বলেন, বাঙালি জাতি কোনো দিন মাথা নত করেনি। আমাদের যত অর্জন সবগুলো ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। এই জাতিকে সব সময় আন্দোলন-সংগ্রাম করে, বুকের রক্ত দিয়ে যুগে যুগে ন্যায্য দাবি আদায় করতে হয়েছে। যারই মহত্তম প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশ মানে প্রেরণা। একুশ আমাদের প্রতিবাদের ভাষা শেখায়, বিজয়ের পথ দেখায়। একুশ মানে মাথা নত না করা। গতকাল সোমবার বিকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে বসেছে। এখন আর কেউ আমাদের দরিদ্র বলে গালি কিংবা অবহেলা করতে পারে না।

শিশুদের নিয়ে আরো বেশি বই প্রকাশ এবং তৃণমূলের গণমানুষের জীবন ও সংগ্রাম সাহিত্যকর্মে ফুটিয়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সকল নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা-সংরক্ষণ ও বিকাশেও আপনাদের সবাইকে আরো মনোযোগী হতে হবে। শিগগিরই মীর মশাররফ হোসেনের অমর উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’র ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার দিনগুলোতে সেই ক্যাম্পাস জীবনের আনন্দের কথা শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন। সেইসঙ্গে সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকায় নিয়মের কড়াকড়িতে এখন আর সেই তরুণ দিনের মতো বইমেলায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয় না বলে আক্ষেপ করেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলা একাডেমি নিয়ে তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, বাংলা একাডেমিতে তার অনেক সময় কেটেছে। এখানকার লাইব্রেরিটা আমার বেশ প্রিয় ছিল। আমি ও আমার বান্ধবী বেবী মওদুদ লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতাম, অনেক সময় কাটাতাম।

বাংলা ভাষার ?অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং এতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথা। ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে রফিক, জব্বার, বরকত, সালামসহ অনেক নাম না জানা ছাত্র-জনতার আত্মদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারির আঘাত শুধু আন্দোলনকারীদের উপরই ছিল না, এটা ছিল বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতিসত্তার উপর আঘাত। ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে শিক্ষা আন্দোলন, ছয়-দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছর ধরে একুশে গ্রন্থমেলার মঞ্চে দেশের বাইরের বিদেশি লেখক-পণ্ডিতদেরও সমাগম হচ্ছে। তাদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলার সমৃদ্ধ ভাষা-সাহিত্যের বার্তা যেমন বহির্বিশ্বে পৌঁছে যাবে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোয় আমরা নিজেদের সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবো। এবারের বইমেলায় বঙ্গবন্ধুর একটি জীবনীগ্রন্থকে ব্রেইল মাধ্যমে প্রকাশ করায় বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস ও সাহিত্য পড়ার ক্ষেত্রে এই ব্রেইল প্রকাশনা সহায়ক হবে। তিনি বলেন, যে মানুষটি বাংলার সকল শ্রেণির মানুষের মুক্তির জন্য তার জীবন উত্সর্গ করেছেন, আমরা তারই প্রদর্শিত পথে দেশের সুবিধাবঞ্চিত শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি।

দুপুর ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রী মেলা প্রাঙ্গণ বাংলা একাডেমি চত্বরে এসে পৌঁছান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ২৬ মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিকাল ৪টা ৪৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী অমর একুশে গ্রন্থমেলার অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। আর এর মধ্য দিয়ে পর্দা উঠল মাসব্যাপী একুশের গ্রন্থমেলার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব বেগম আকতারী মমতাজ, চেক প্রজাতন্ত্রের লেখক-গবেষক রিবেক মার্টিন, বৃটিশ কবি এবং জীবনানন্দ অনুবাদক জো উইনটার, অন্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থার সভাপতি (আইপিএ) রিচার্ড ডেনিশ পল সারকিন প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলানসহ মন্ত্রী পরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষক, গবেষক, কবি, সহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। মহান একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠানের শুরুতে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথির মধ্যে রিবেক মার্টিন বলেন, বাঙালির ভাষা আন্দোলন এক বৃহত্ মানবিক অভিজ্ঞতা। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন সারা বিশ্বের উপনিবেশবাদ বিরোধী শেকল ভাঙার গানে প্রেরণাদায়ী মন্ত্রের নাম। পৃথিবীর সকল বৃহত্ ও ক্ষুদ্র জাতির প্রগতিশীল-সংগ্রামী অভিযাত্রায় একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে। একুশের শহীদের স্মৃতি আমাদের ভবিষ্যতের আলো। তিনি বলেন, ইন্টারনেট বই পড়ার নেশাকে স্তব্ধ করতে পারবে না। আমাদের সবাইকে অনুবাদ, ভ্রমণ ও অন্য ভাষা শেখার মধ্য দিয়ে এক মানসিক ভাষা তৈরি করতে হবে যা ভবিষ্যতের মানবিক পৃথিবী গড়ার আন্দোলনকে সফল করে তুলবে।

জো উইন্টার বলেন, আমি রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ অনুবাদ করেছি, অনুধাবন করেছি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গভীরতা এবং মানবিক আবেদনের মর্ম। রিচার্ড ডেনিস পল শার্কিন বলেন, মুদ্রিত ও ডিজিটাল—উভয় বইয়ের পাইরেসি রোধ করতে বিশ্বের সকল প্রকাশক ও লেখকের সচেতনতা প্রয়োজন। শিক্ষা ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জকে আমরা এই বইয়ের মাধ্যমেই সফল করে তুলতে পারি। মানুষের সৃজনশীল অভিযাত্রায় লেখা, লেখক এবং বইয়ের কোন বিকল্প কখনও গড়ে উঠতে পারে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here