সন্ত্রাসের জনপদ ফেনী-লক্ষ্মীপুর!

51

একের পর এক খুন, বিশেষ অভিযানে আটক দুই শতাধিক, ঘাতকরা বহাল তবিয়তে

আবুল খায়ের

 

একের পর এক খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিণত হয়েছে দেশের ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলা। গত তিন মাসে এই দুই জেলায় ৩৫ টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ তিন আওয়ামী লীগ নেতা হত্যাকাণ্ডের পর টনক নড়ে প্রশাসনের। শুরু হয় পুলিশ ও বিজিবির বিশেষ অভিযান। গত বুধবার থেকে চলা বিশেষ অভিযানে দুই জেলায় ২ শতাধিক ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত খুনি ও তাদের গডফাদাররা রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

স্থানীয় সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানান, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে হত্যা করলে খুনিরা নিরাপদ, এটা বহু বছর ধরে চলে আসছে। এর থেকে লক্ষ্মীপুর ও ফেনীবাসী বাঁচতে চান। ফেনীতে তিন গডফাদারের এক ডজন সন্ত্রাসী ও কিলার বাহিনী রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে ফেনী। অপরদিকে ১২টি সন্ত্রাসী বাহিনী লক্ষ্মীপুরকে নিয়ন্ত্রণ করছে বহু বছর ধরে। এসব সন্ত্রাসী বাহিনীকে নেপথ্যে নিয়ন্ত্রণ করছেন জেলার তিন গডফাদার। মূলত গডফাদার আর সন্ত্রাসী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই চলে এ দুই জেলা। আর খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, অপহরণ, গুম, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা ওই দুই জেলার সন্ত্রাসীদের কোটি কোটি টাকা আয়ের প্রধান উত্স।

সর্বশেষ গত ২০ মে ফেনী শহরের একাডেমি রোডে বিলাসী সিনেমা হলের সামনে প্রকাশ্যে ৪০ জন সন্ত্রাসী ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক একরামকে গুলি করে, কুপিয়ে ও গাড়িসহ পুড়িয়ে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কিলাররা তিন গডফাদারের ক্যাডার বাহিনীর সদস্য। স্মরণকালের এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশ-বিদেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঘাতকদের গ্রেফতারে স্থানীয় পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চরম ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠে।

অপরদিকে একরাম হত্যাকাণ্ডের পর দিন ২১ মে লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান ও রায়পুর উপজেলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মজিদকে নৃশংসভাবে হত্যা করে খুনিরা। এ সব হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হয় পুলিশ ও বিজিবির বিশেষ অভিযান। অভিযানে ২ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। তবে তারা কেউ এলাকার গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাডার বাহিনী কিংবা কিলার গ্রুপের সদস্য নয়। অধিকাংশই স্থানীয় পুলিশ, গডফাদার ও সন্ত্রাসী বাহিনীর সোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ অভিযান কিংবা র্যাব-পুলিশের অভিযানের আগাম সংবাদ জেনে যাওয়ায় আগেই সন্ত্রাসী ও কিলাররা নিরাপদ স্থানে আত্মগোপন করে। এলাকাবাসী জানান, অভিযান শুরু হলে কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিসহ বিভিন্ন স্থানে ওরা ‘হানিমুনে’ থাকে। অভিযান শেষ হলে আবার এলাকায় ফিরে আসে।

পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার এ প্রসঙ্গে বলেন, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ অভিযান চলছে। জেলা দুটির আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। খুন কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হলেই আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে তা সঠিক নয়। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আইজিপি জানান।

একটি সূত্র জানায়, ওই দুই জেলায় ভাগাভাগি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অধিকাংশ খুনের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও এর সত্যতা স্বীকার করেছে। সূত্র মতে, ঐ সকল সন্ত্রাসী বাহিনী ও গডফাদারদের কোন দল নেই। যে সরকার ক্ষমতায় সেই সরকারের দলীয় নেতাকর্মী সেজে ওরা ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের অপরাধ জগত প্রকাশ্যে নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণে প্রশাসন ঐ সব অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থ। তাদের হাত স্থানীয় প্রশাসনের চেয়ে অনেক লম্বা বলে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করেন। একের পর এক খুন করে ওরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। এ সুযোগে স্থানীয় একশ্রেণীর পুলিশ কর্মকর্তা ঐ সকল অপরাধীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা উেকাচ আদায় করছে। তাছাড়া খুনের ঘটনায় মামলা করতে স্বজনরা সাহস পান না। মামলা করলে খুনিদের নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাত পরিচয় হিসাবে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ সাদামাটা তদন্ত করে মামলার ফাইনাল রিপোর্ট কিংবা দুর্বল চার্জশীট আদালতে দাখিল করে। এ কারণে ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে একের পর এক হত্যা করেও খুনিরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

লক্ষ্মীপুরে ১২টি সন্ত্রাসী বাহিনী, তিন মাসে ২৫ খুন

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুরে ১২টি সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় থাকায় প্রতি মাসেই খুন হচ্ছে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। ঘটছে অপহরণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, ডাকাতিসহ নানা অপকর্ম। আর এদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে গত ৩ মাসে এ জেলায় খুন হয়েছে ২৫ জন। জেলার ১৮ লাখ সাধারণ মানুষের দিন কাটছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় ও আতঙ্কের মধ্যে।

লক্ষ্মীপুরে ২১ মে বুধবার মধ্য রাতে আওয়ামী লীগ এর দুই নেতা দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন। পুলিশ জানায়, মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে তাদের হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। গত ১৮ মে সদর উপজেলার হাজীপাড়ায় বটতলায় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে গুলীতে ছাত্রলীগ নেতা আবু নোমান (৩০) ও যুবদল কর্মী জাহাঙ্গীর হোসেন (৩২) নিহত হন। ১৭ মার্চ লক্ষ্মীপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে বাবর হোসেন (২৬) নামে এক যুবদল কর্মী নিহত হয়েছেন। ১২ এপ্রিল সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বড়ালিয়া গ্রামে যুবদল কর্মী কামাল হোসেন বাবুলকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ১২ মার্চ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার কুশাখালী ইউনিয়নের ঝাউডগী এলাকার একটি মত্স্য খামার থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৪ এপ্রিল উপজেলার দক্ষিণ হামছাদী ইউনিয়নের গোপীনাথপুর এলাকায় ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা রবিউল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

এর আগে ৩১ মার্চ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের দিন সদর উপজেলার দিঘলী ইউনিয়নের দুর্গাপুর এলাকায় আ’লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পোস্টার লাগাতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের গুলিতে কবির হোসেন নামের এক যুবলীগ নেতা নিহত হন । ২০ মার্চ রামগঞ্জে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নুর হোসেন (২৯) নামের এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নিহত হন। ২ মে লক্ষ্মীপুরে রিপন হোসেন (২৪) নামের এক ইউনিয়ন যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ৪ এপ্রিল ঢাকার উত্তরা থেকে অপহরণের দুইদিন পর লক্ষ্মীপুর জেলা যুবদলের যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক মো. সামছুল ইসলাম সোলায়মানের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এছাড়া ৩১ মার্চ লক্ষ্মীপুরের রায়পুর শহরের বৈদ্যুতিক জেনারেটর ব্যবসায়ী মো. মিজানের (৪৫) মৃতদেহ ডাকাতিয়া নদী থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।

গত ৩মাসে জেলায় ২৫ জন খুন হলেও থানায় মামলা হয়েছে ১৬টি। নিরাপত্তার অভাবে বাকি খুনের ঘটনায় কোন মামলা করেনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। জানা গেছে, বেশির ভাগ খুন হয় কোন না কোন সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে। তাই পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে এসব খুনি ও সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মামলা করার সাহস পাচ্ছে না।

ফেনীতে দুই মাসে ১০ খুন

ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে হাত বাড়ালেই মিলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র আর মাদক। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, খুন, গুম, ছিনতাই ও ডাকাতি ঘটছে অহরহ। গত এপ্রিল থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় দুই মাসে ১০টি খুন হয়েছে। ফেনীর প্রশাসন খুন, গুম, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ সব অপরাধ ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। রামগঞ্জ থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত ফেনীর সীমান্ত পথে ভারত থেকে আসছে মাদক আর অস্ত্রের চালান। সর্বশেষ ফেনী শহরে প্রকাশ্যে সশস্ত্র তরুণরা ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক একরামকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডে পুলিশ গতকাল পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেফতার করেছে।

এর আগে গত ১৯ এপ্রিল যুবদল নেতা শহীদুল আলম সুমন, ১৪ এপ্রিল শহীদুল ইসলাম নামে এক যুবলীগ কর্মী, ১২ এপ্রিল ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মধুগ্রাম এলাকায় সালেহ্ আহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি, ১১ এপ্রিল ফেনী শহরের রেজিষ্ট্রি অফিস সংলগ্ন ভুঁইয়া বাড়ির সামনে ব্যবসায়ী কায়সার মাহমুদকে সন্ত্রাসীরা নির্মমভাবে হত্যা করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here