সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে, দিনাজপুরে ফের জামায়াত-শিবিরের হামলার আশংকা

19

newজামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু পাড়াগুলোতে বর্তমানে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত ১৩ ডিসেম্বর রাতে জামায়াতের সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি জেলার খানসামা উপজেলার রামনগর এবং চিরিরবন্দর উপজেলার ভূষিরবন্দর এলাকার সংখ্যালঘু পল্লীগুলো। গত ১৮ ডিসেম্বর ইত্তেফাকের কাছে সে রাতের ভয়াবহ তাণ্ডবের বিবরণ দিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের চোখে-মুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ। কিন্তু ভয়ে কেউ হামলাকারীদের নাম বলতে চাননি। তারা সবাই ফের হামলার আশঙ্কা করছেন।

জামায়াতি তাণ্ডবে সেই রাতে খানসামা উপজেলার ৫ নং ভাবকি ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের ফোকাসাপাড় নিবাসী গৌরহরি শাহের ১০০ বিঘা জমির ১৬টি ধানের গাদাসহ বাইরের খোলানে থাকা ৫টি ঘর, নিখিল চন্দ্র রায়ের ২টি শোবার ঘরসহ মালামাল, নিরঞ্জন রায়ের ২টি ঘরের মালামাল, রামনগর-মণ্ডলপাড়ার ফনিন্দ্রনাথ রায়ের বাড়ি ও ধানের গাদা পোড়ানো হয়।

একই রাতেই ভূষিরবন্দরে ব্যবসায়ী ও দিনাজপুর জেলা মোটর পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি ভবানী শংকর আগরওয়ালার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। তারা ওই প্রতিষ্ঠানের ৭টি ট্রাক আগুনে পোড়ায়। লুট করে ২টি গুদামের সারসহ কোটি টাকার মালামাল। চিরিরবন্দর উপজেলার ১১ নং তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সুনীল কুমার সাহার ২০ বিঘা জমির ধানও পুড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়াও ওই এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারের বিপ্লব শাহা, বিধান দাস, দুলাল রায়, মানিক রায়, বিপ্লব রায়, সুবোধ দাস, প্রমোদ রায়, লাল বাবু, পুর্ণ্য রায়, জগদিশ রায়, কুশরাম দাসের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। হামলাকারী জামায়াত-শিবিরের কর্মী স্থানীয় সংখ্যালঘু নারী-পুরুষ ও শিশুদের বেদম মারধরও করে। হামলাকারীরা ৪ নং খামারপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাপাড়ায় বটেরহাটে অবস্থিত গৌরহরি শাহের হাসকিং মিল ভেঙে ফেলে। কালীর বাজারে অবস্থিত নিরঞ্জন রায়ের ওষুধের দোকান তছনছ করে।

ক্ষতিগ্রস্তদের মতে, সেই রাতে দুই থেকে তিন হাজার লোক ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোটা ও মশাল হাতে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহ আকবর’ শ্লোগান দিয়ে হিন্দু জনপদগুলোয় হামলা চালায়। তবে হামলাকারীদের নাম বলার সাহস করেননি কোন সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য।

৭৮ বছর বয়সী গৌরহরি হামলার সময় বাড়ির দরজা খুলে বাইরে এসেছিলেন হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে। কিন্তু হামলাকারীরা তাকে দেখেই এই যে মালাউন পাওয়া গেছে’ বলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বেদম মারধর করে। লাঠির প্রচণ্ড আঘাতে তার ডান হাতের উপরের অংশে বিরাট কালশিরা দাগ পড়েছে। সেই দাগ দেখিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, স্বাধীন দেশে এইভাবে কেন আমাদের মার খেতে হবে? আমাদের কী অপরাধ?

৭০ বছর বয়সী ফনীন্দ্রনাথ রায় বলেন, কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে কি, হয়নি, আমরা জানতাম না। কিন্তু ফাঁসির রাতে হঠাত্ করে হাজারখানেক লোক এক সঙ্গে আমাদের গ্রাম ঘেরাও করে বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগানো শুরু করে। তারা বেছে বেছে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেয়। তারা চিত্কার করে বলতে থাকে ‘হিন্দুক ধরো, আগুন লাগাও।’ কেউ কেউ বলতে থাকে ‘গণহত্যা হবে, সব হিন্দুকে কচুকাটা করা হবে।’

সাবেক ইউপি সদস্য গণেশ চন্দ্র রায় বলেন, এই হামলা বন্ধ না হলে পরিণতি খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। কাচিনিয়া হাই স্কুলের সাবেক শিক্ষক ক্ষণিষ চন্দ্র রায় বলেন, হিন্দুদের নিরাপত্তায় সরকারের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

এ ব্যাপারে দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন বলেন, খুব শিগগিরই দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোন সহিংসতা ও নির্যাতন বরদাস্ত করা হবে না। গত মঙ্গলবার রাতে এই সকল এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিছু আসামিকে ধরা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

সিদ্ধিরগঞ্জে সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ

সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, থানার চরশিমুল পাড়া এলাকায় একটি চক্র সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ করে দখল করে নিয়েছে ৭ একর জমি। ভারত থেকে বিতারিত ৪শ’ মুসলিম ও ৬টি হিন্দু রিফিউজি পরিবার সরকারের দেয়া এ জমিতে ১৯৬৪ সাল থেকে বসবাস করে আসছে। সম্প্রতি সংখ্যালঘু ৬টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে জমি দখলের পর মুসলিমদের মাঝেও আতংক বিরাজ করছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ে অধুনাবিলুপ্ত আদমজী জুট মিল সংলগ্ন চরশিমুল পাড়া আদর্শ গ্রামের কালিপদ (৫০), শ্রীকৃষ্ণ (৪৫), সনজীবন (৫২), সুবল সরকার (৪৭) ও দেবেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাসের মেয়ে মঞ্জু দের (৩২) পরিবারকে উচ্ছেদ করে দখল করা হয়েছে তাদের জমি ও ভিটেমাটি। বর্তমানে বিতাড়িত হওয়া সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন জায়গায় মানবেতর ভাবে জীবনযাপন করছে।

উচ্ছেদ হওয়া মঞ্জু দে জানায়, হঠাত্ স্থানীয় একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রাতের আধারে তাকে ও তার পরিবারের সকলকে জায়গা খালি করতে বলে। অন্যথায় পরিবারের সবাইকে ড্রামে ভরে নদীতে ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়। এরপর সন্ত্রাসী চক্রটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখে এলাকা থেকে জোরপূর্বক তাদের তাড়িয়ে দেয়।

এ ঘটনায় এলাকার মুসিলম রিফিউজিরাও উচ্ছেদ আতংকে রয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাসিন্দা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী চক্রটি জমি দখলের পাঁয়তারা করে আসছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বরাবরে আবেদন করলেও কোন সুরাহা হয়নি বলে জানান স্থানীয় মোকসেদ আলী। তিনি বলেন, বর্তমানে এখানে ৪ শ’টি পরিবারের প্রায় দুই হাজার সদস্য বসবাস করছে। এরা বর্তমানে উচ্ছেদ আতংকে ভুগছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here