সংকট বাড়ল মহানায়িকার

19

image_41183.suchittra-senমাঝ আকাশে যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে যাত্রীবোঝাই বিমান ঝোড়ো হাওয়ার কবলে পড়লে পাইলটের যা দশা হয়, এখন আমাদেরও ঠিক সেই অবস্থা’ বললেন এক চিকিৎসক ৷ তিনি সেই মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য, যাঁরা ক’দিন ধরে নাওয়া খাওয়া ভুলে লড়াই করে জিইয়ে রেখেছেন সুচিত্রা সেনকে। মিডিয়া তো বটেই, তাঁদের সাফল্য-ব্যর্থতার চুলচেরা বিশ্লেষণ এখন বাঙালির আতস কাচে। বুঝছেন তাঁরাও। সুচিত্রা তো আর নিছক ভিআইপি নন, অর্ধশতক জুড়ে তিনি বাঙালির প্রিয়তমা নারীচরিত্র। এহেন রোগিণীর ঘোরতর সংকট সামলাতে গিয়ে, ঘর-সংসার শিকেয় তুলে নিজেদের তাই নিংড়ে দিচ্ছেন ডাক্তাররা।
সোমবার সন্ধ্যা নাগাদ চিকিৎসক সুব্রত মৈত্র জানান, তাঁর ব্লাড গ্যাস রিপোর্ট ভালো আসেনি। রক্তে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়ছে এবং অক্সিজেনের মাত্রা কমছে। তাঁকে এখন রাখা হয়েছে নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেশনে। সন্ধ্যা নাগাদ তাঁর ফিজিওথেরাপি শুরু করা যায়নি বলে জানিয়েছেন সুব্রত মৈত্র। এদিন সন্ধ্যে বেলা ফের মহানায়িকাকে দেখতে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন তাঁর এনডোট্র্যাকিয়াল টিউব খুলে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসক সুব্রত মৈত্র। শুরু হয়েছিল ফিজিওথেরাপি। সুচিত্রা সেন চিকিৎসায় সাড়া না দিলেও তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কেউ টানা ৭২ ঘণ্টা জেগে। কেউ চার দিন বাড়ি যাননি৷ সপ্তাহখানেক ধরে কারো আবার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ টিকে আছে স্রেফ মোবাইল ফোনে৷ কিন্তু পান থেকে চুন খসার জো নেই৷ বিধ্বস্ত চেহারায় সুবীর মণ্ডল বলছিলেন, ‘ভাবতে পারবেন না কী চাপ! উনি ভিআইপি৷ তার উপর ২৪ ঘণ্টার মিডিয়া অ্যাটেনশন৷ আমাদের সবারই প্রাইভেট চেম্বার এখন বন্ধ৷ দিনরাত পড়ে রয়েছি হাসপাতালে৷ বাড়ির রুটিনও ওলটপালট হয়ে গেছে৷’ মেডিক্যাল বোর্ডের অন্যতম এই ফুসফুসরোগ বিশেষজ্ঞ জানাচ্ছেন, সুচিত্রার চিকিৎসায় ছিটেফোঁটা ঢিলেমির সুযোগ দিতেও তাঁরা নারাজ৷ তাই নববর্ষে আর নতুন রোগীর দায়িত্ব তাঁরা নিচ্ছেন না।
চাপ সওয়াকে রুটিনে পরিণত করে ফেলা সুব্রত মৈত্রের কণ্ঠেও একই বক্তব্যের অনুরণন৷ অনিদ্রার ছাপ স্পষ্ট তাঁর চোখের কোলে৷ মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান চিকিৎসক বলছিলেন, ‘দিনে ২০ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে৷ ওঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি অন্য রোগীদেরও তো দেখতে হচ্ছে৷ তার মধ্যেই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা, ওঁকে দেখতে আসা ভিআইপিদের অ্যাটেন্ড করা- সবই করতে হচ্ছে৷ ঘুমানোরও সময় মিলছে না৷ স্ট্রেস কমাতে মাঝেমধ্যে গান শুনছি৷’
কার্ডিওলজিস্ট, পালমোনোলজিস্ট, ক্রিটিক্যাল কেয়ার স্পেশ্যালিস্ট– সকলেরই গত ক’দিনের ধ্যানজ্ঞান আবর্তিত হচ্ছে সুচিত্রাকে ঘিরে৷ তাঁর ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান সমরজিত্‍ নস্কর আবেগতাড়িত৷ তাঁর চাপেই শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কলকাতার বাড়ি থেকে হাসপাতালে আসতে রাজি হয়েছিলেন নায়িকা৷ সেই ২৪ ডিসেম্বর থেকে বারুইপুরের বাসিন্দা সমরজিত্‍বাবুর নয়া ঠিকানা এই হাসপাতাল৷ ‘জানেন, আমার সঙ্গে ওঁর একটা আত্মিক টান আছে৷ টানা চার রাত হাসপাতালেই পড়ে আছি৷ কিভাবে আছি, কেমন করে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছি, বলতে পারব না৷ একটাই চ্যালেঞ্জ, সুস্থ করে ওঁকে যে করেই হোক বাড়ি পাঠাতে হবে,’ ক্লান্ত চেহারার অভিব্যক্তি নিমেষে বদলে কঠিন সমরজিত্‍বাবুর৷
শুধু চিকিৎসকরাই দিনরাত এক করে লড়ে চলেছেন বললে অবশ্য ভুল হবে৷ সুচিত্রার সংকট কাটানোর যুদ্ধে শামিল এঁদের পরিবার পরিজনও৷ যেমন, জয়িতা নস্কর৷ হাওড়ার বালিটিকুরিতে একটি স্কুলের শিক্ষিকা৷ রোজ বারুইপুর থেকে যাতায়াত৷ অকপটেই জানাচ্ছেন, স্বামী সমরজিত্‍ নস্করেরর সঙ্গে কার্যত দেখাই হয়নি গত কয়েক দিন৷ চিকিৎসকের ঘরণীর এখন সয়ে গেছে, ব্যস্ত ডাক্তারবাবু কখনো ফেরেন রাত দুটোয়, তো কখনও ভোর ৫টায়৷ বারোটা বেজে গিয়েছে দৈনন্দিন রুটিনের৷ ব্যস্ত স্বামীকে মোবাইল ফোনে ধরতেও ইতস্তত করেন৷ যদি কাজে বিঘ্ন ঘটে! তাই ড্রাইভারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, সুযোগ বুঝে ফোন করেন স্বামীকে৷ ‘কিছু করার নেই৷ যাঁর চিকিৎসার ভার ওঁদের কাঁধে, তাঁর জন্য তো গোটা বাংলা প্রার্থনা করছে৷ এটুকু তো সইতেই হবে,’ মন্তব্য সংবেদনশীল স্ত্রীর৷
পরিবারের অবদান আর স্বার্থত্যাগের কথা অবশ্য স্বীকার করেন চিকিত্‍সকরাও৷ ‘ফ্যামিলি সাপোর্ট ছাড়া সম্ভবই ছিল না,’ একবাক্যেই বলছেন সুব্রতবাবু, সুবীরবাবু কিংবা সমরজিত্‍বাবু৷ কার্ডিওলজিস্ট সুনীলবরণ রায়ের কথায়, ‘২৪ ঘণ্টা হাজির থাকাটা একান্ত দরকার৷ অবস্থার আচমকা অবনতি হলে, তাত্‍ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব জরুরি৷ ঠিক যেমন, শনিবার সুচিত্রার গলায় নল ঢুকিয়ে কফ বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পালমোনোলজিস্ট অনির্বাণ মণ্ডল৷ ঠিক তখনই সিদ্ধান্তটা না নিলে বিপদ হতে পারত৷’
চিকিৎসক, তাঁদের পরিবার তো বটেই, সুচিত্রার সঙ্কটমুক্তির যুদ্ধে সামিল নার্স থেকে শুরু করে হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা৷ সুচিত্রার ইচ্ছায় তাঁর পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা দুজন গ্রুপ ডি আর তিনজন নার্সের ছুটি বাতিল হয়েছে ইতিমধ্যেই৷ তবুও তারা হাসিমুখে অশীতিপর নায়িকার সঙ্গে লড়াইয়ে শামিল৷ বাদ যাননি ডাক্তারবাবুদের গাড়ির চালকরাও৷ সমরজিত্‍বাবু বলছিলেন, ‘জানেন, আমার ড্রাইভারকে এত দিন পর, রবিবার রাতে ছুটি দিলাম৷ তা-ও মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য৷ ওরও তো ঘরবাড়ি আছে৷’
ঘরবাড়ি তো অবশ্যই আছে৷ কিন্তু সবাই আপাতত সে সব ভুলেছেন৷ মগ্ন কেবল সুচিত্রা সেনকে ঘরে ফেরানোর সংকল্পে৷ সূত্র: এই সময়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here