শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ

17

safe_image.php

আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নিধনের মর্মন্তুদ স্মৃতিঘেরা একটি দিন। বাঙালির মেধা-মনন-মনীষা শক্তি হারানোর দিন আজ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস রক্তগঙ্গা পেরিয়ে গোটা জাতি যখন উদয়ের পথে দাঁড়িয়ে, ঠিক সেই সময়ই রাতের আঁধারে পরাজয়ের গ্লানিমাখা পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বেছে বেছে হত্যা করে।

বিজয়ের মাত্র দুইদিন আগে এই দিনে দেশকে মেধাশূন্য করার পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে ঘর থেকে তুলে নিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বাঙালি জাতির সেরা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিত্সক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ বরেণ্য কৃতী সন্তানদের। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪২ বছর পরে হলেও যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে কলঙ্ক মোচনের শুভ সূচনা হওয়ায় জাতি আজ অধীর আশায় বুক বেঁধেছে। বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তুলে দেয় তত্কালীন জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র ক্যাডার গ্রুপ কুখ্যাত আলবদর ও আল শামস বাহিনীর হাতে। পেছন থেকে মদদ যোগায় পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্বে থাকা পাক জেনারেল রাও ফরমান আলী। ডিসেম্বরের ১০ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত সে তালিকা ধরে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘৃণ্যতম অপকর্মটি করে এই ঘাতক চক্র। সান্ধ্য আইনের মধ্যে রাতের আঁধারে তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে চোখ বেঁধে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দেয়া হয়েছে সে অনুযায়ী একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিত্সক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রকৌশলী।

স্বাধীনতা লাভের পর দীর্ঘ ৪২ বছরেও বুদ্ধিজীবী হত্যার কোন কিনারা আজো হয়নি। বুদ্ধিজীবীদের কে কোথায় কিভাবে শহীদ হয়েছেন তারও কোন কিনারা হয়নি। তাদের পরিবারবর্গও জানতে পারেনি প্রিয় এই মানুষগুলোর লাশ কোথায়? এ নিয়ে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হত্যা রহস্য উন্মোচন এবং দোষীদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বাস্তবের মুখ দেখেনি।

গোটা বাঙালি জাতি আজ গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে দেশের শহীদ কৃতী সন্তানদের। আজ শোকাহত মানুষের ঢল নামবে সেদিনের সেই হত্যাযজ্ঞের স্মৃতিবিজড়িত রায়েরবাজারে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিস্তম্ভে। অর্পণ করা হবে পুষ্পার্ঘ্য। দেশের সর্বত্র আজ জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। শোকের প্রতীক কালো পতাকাও উড়বে। রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় নেয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেছেন, জাতির সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীরা দেশের বিভিন্ন সঙ্কটে জাতিকে বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে কান্ডারির ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য বিজয়ের প্রাক্কালে হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে এ দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, চিকিত্সক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পীসহ বহু গুণীজনকে হত্যা করে। জাতিকে মেধাহীন করাই ছিল তাদের হীনউদ্দেশ্য। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের সকলকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করুক এ প্রত্যাশা করি।

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এক কলঙ্কময় দিন। তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী বাঙালি শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিত্সক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, শিল্পী, প্রকৌশলী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদসহ দেশের সেরা সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে। তারা এই পরিকল্পিত নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়। তাদের সেই প্রতিশোধ স্পৃহা আজো থেমে নেই। দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিককে একাত্তরের ঘাতক, মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত চক্রের সকল ষড়যন্ত্র পতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় এনেছি। রায় ঘোষণা ও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কোন ষড়যন্ত্রই জাতিকে এ পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। এই কুখ্যাত মানবতাবিরোধীদের যারা রক্ষার চেষ্টা করছেন তাদেরও একদিন বিচার হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মা শান্তি পাবে, দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে।

বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া তার বাণীতে বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আমি বিজয়ের চূড়ান্তক্ষণে শাহাদত বরণকারী বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। ১৪ ডিসেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে এক শোকাবহ দিন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে হানাদার বাহিনীর দোসররা এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বেছে বেছে হত্যা করেছিল। পৈশাচিক সে হত্যাকাণ্ড জাতির জীবনে সৃষ্টি করেছিল এক গভীর ক্ষত। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, যার আদর্শ হবে গণতন্ত্র। তাদের স্বপ্ন পূরণে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আজকের এ দিনে আমি সকলের প্রতি সে আহ্বান জানাই।

জাতীয় পার্টির (জেপি) বাণী

জাতীয় পার্টি (জেপি) এক বাণীতে বলেছে, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পূর্বলগ্নে জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস জাতির বরেণ্য সন্তানদের হত্যা করে। সেদিন ঘাতকদের কবলে পতিত হন বাংলাদেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, ক্রীড়াবিদসহ বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীগণ। দলটি মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ৪২তম বার্ষিকীর ঠিক পূর্বলগ্নে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানায় এবং তাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে। একই সঙ্গে যারা এই ঘৃণ্য কার্যকলাপে সেদিন লিপ্ত ছিলেন তাদের বিচার দাবি করে। বাণীতে বলা হয়, আজ যদিও এই বুদ্ধিজীবীরা আমাদের মাঝে নেই তবুও তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অমর অবদান জাতি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। জাতি সেজন্যই এ বুদ্ধিজীবী দিবসে তাদের প্রতি কেবল শ্রদ্ধাই জানান না তাদের আদর্শ এবং ত্যাগকে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেদের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যে দেশপ্রেমের বাণী নিয়ে আগামী প্রজন্মকে উজ্জীবিত হওয়ার আহ্বান জানায় জেপি।

কর্মসূচি

এদিকে যথাযোগ্য ও শোকের আবহে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালনে দেশব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, আলোচনা সভা, গান, আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা প্রভৃতি।

সকাল ৭টায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং মুক্তিযোদ্ধারা স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। তারা চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।

আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সূর্যোদয় ক্ষণে ৬টা ৪৩ মিনিটে কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারাদেশের দলীয় সংগঠনের কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, সকাল ৭টা ৫ মিনিটে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, ৭টা ৩৫ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে এবং সকাল ৮টা ৫ মিনিটে রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং বিকাল ৩টায় খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীগণ বক্তব্য রাখবেন।

জেপি

আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং সকাল সাড়ে ৯টায় রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হবে। বিকাল ৪টায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাত্কার ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া সকাল ৭টা জেপির সকল কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে।

এছাড়া জাতীয় পার্টি (এ), সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সংগঠন বুদ্ধিজীবী দিবস পালনে নিয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here