র‌্যাবের সেই ৩ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা মিলেছে,আদালতকে জানালেন তদন্ত কর্মকর্তা

18

Rab 3

এম এম রানা আরো ৮ দিনের রিমান্ডে। সাবেক ডিসি ও এসপিকে জিজ্ঞাসাবাদ

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাতজনকে অপহরণ ও পরে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তারই সম্পৃক্ততা মিলেছে। আগেই র্যাব-১১ এর তত্কালীন কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের সম্পৃক্ততার কথা আদালতকে জানিয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মামুনুর রশীদ মন্ডল। আর গতকাল রবিবার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানালেন গ্রেফতার হওয়া র্যাবের অপর কর্মকর্তা লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানাও এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত। তাই নতুন করে গতকাল তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল নারায়ণগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়াল ও পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

এম এম রানাকে আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মামুনুর রশীদ মন্ডল বলেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণে এটা প্রতীয়মান যে, রিমান্ডে থাকা র্যাবের সাবেক দুই কর্মকর্তা সাত খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেও ইতিমধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। র্যাবের অপর কর্মকর্তা এম এম রানারও এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য মিলেছে। তবে সাতজনকে অপহরণ করে হত্যার পর লাশ নদীতে ডুবিয়ে দেয়া তিনজনের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এর সঙ্গে আরো কারা জড়িত তাদের সনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য রানাকে আরো রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তাই হত্যা মামলায় রানাকে গ্রেফতার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত তার ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে র্যাবের অপর দুই কর্মকর্তাকেও দ্বিতীয় দফায় ৮ দিন করে রিমান্ডে নেয়ার সময় আবেদনে একই কথা বলেছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা।

আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল বিকাল সোয়া ৫টার দিকে কঠোর নিরাপত্তায় রানাকে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে হাজির করা হয়। এ আদালতে প্রায় ২০ মিনিট শুনানির পর ৫টা ৩৫ মিনিটে বিচারক তার ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে আবারো কঠোর নিরাপত্তায় রানাকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে নেয়া হয়। এ সময় আদালতে উপস্থিত বিভিন্ন সময়ে গুম ও অপহরণের ঘটনায় ভুক্তভোগী লোকজন রানাকে গালাগাল ও জুতা নিক্ষেপ করে। রিমান্ড শুনানিতে এদিনও রানার পক্ষে কোন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। আদালতে শুনানির সময়েও রানা কোন ধরনের বক্তব্য দেননি। এর আগে গত ২২ মে একই মামলায় তারেক সাঈদ ও আরিফ হোসেনকে গ্রেফতার দেখানোর পর তাদের আবারো দ্বিতীয় দফায় ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করলে সেদিন আদালত ৮ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

প্রসঙ্গত, সাত খুনের ঘটনায় এম এম রানাকে গত ১৭ মে গভীর রাতে ঢাকার সেনানিবাস এলাকা থেকে গ্রেফতার করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। ১৮ মে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ৭ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে জেলা পুলিশ লাইনে জিজ্ঞাসাবাদ করে উচ্চ পর্যায়ের ১২ সদস্যের বিশেষ টিম। র্যাব-১১ এ নারায়ণগঞ্জ শহরের পুরাতন কোর্ট ক্যাম্পের অধিনায়ক ছিলেন এমএম রানা। সেখানেই সাতজনকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেছেন নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম।

সাবেক ডিসি ও এসপিকে জিজ্ঞাসাবাদ

নারায়ণগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়াল এবং সাবেক পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামের সাক্ষ্য নিয়ে সাত খুন তদন্তে গঠিত কমিটি বলেছে, ‘প্রয়োজনে’ যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তারা। এ কে এম শামীম ওসমানের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নূর হোসেনের ফোনালাপ প্রকাশ হওয়ার পর এই সংসদ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি-না, জানতে চাইলে এ কথা বলেন তদন্ত কমিটির প্রধান শাহজাহান আলী মোল্লা।

গতকাল সচিবালয়ে সাক্ষ্যে সাতজনকে অপহরণের সময় নারায়ণগঞ্জ প্রশাসনে দায়িত্বে থাকা মনোজ কান্তি বড়াল ও নুরুল ইসলাম কী বলেছেন, সে বিষয়ে মুখ খোলেননি কমিটির সদস্যরা। তবে তদন্তের অগ্রগতি হচ্ছে এবং তা শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত সাত সদস্যের এই তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন, নিহতদের স্বজনদের সাক্ষ্য নেয়ার পর নারায়ণগঞ্জ শহর এবং সিদ্ধিরগঞ্জে গণশুনানি করে।

এরপরই তারা গতকাল ঢাকায় শুনানিতে সাবেক ডিসি ও সাবেক এসপিকে ডাকে। তদন্ত চলার মধ্যেই দু’দিন আগে শামীমের সঙ্গে পলাতক নূর হোসেনের ফোনালাপ প্রকাশ হলে সংসদ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে, যদিও এই আওয়ামী লীগ নেতার দাবি, নূর হোসেনকে আটকাতে তিনি পুলিশের পরামর্শে তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা শামীমকে ডাকা হবে কি না- প্রশ্ন করা হলে সরাসরি উত্তর না দিয়ে শাহজাহান মোল্লা বলেন, তাকে ডাকা হবে কি না, তা সময়মতো দেখতে পাবেন, অপেক্ষা করুন। তদন্তের প্রয়োজনে যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করব আমরা। তদন্ত কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৫ জুন অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।

তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে শাহজাহান মোল্লা বলেন, আমরা এগুচ্ছি, যথাসময়ে জানতে পারবেন। সচিবালয়ে সকাল ১০টা থেকে বেলা সোয়া ১টা পর্যন্ত এসপি নুরুল ইসলাম এবং বেলা পৌনে ৩টা থেকে ৩টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত মনোজ কান্তি বড়ালের সঙ্গে কথা বলেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। শাহজাহান মোল্লা বলেন, অতীতেও অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা (ডিসি-এসপি) যেহেতু ওই সময় সেখানে দায়িত্বে ছিলেন, তাই তারা কতটুকু জানেন, তা জানার দরকার ছিল। প্রসঙ্গত, ৭ জন অপহূত হওয়ার পর মনোজ কান্তি বড়াল ও নুরুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ থেকে সরিয়ে আনা হয়। তখন র্যাবের তিন কর্মকর্তাকেও সরিয়ে আনা হয়েছিল।

তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব আবুল কাশেম জানিয়েছেন, আজ সোমবার বিকাল ৩টা থেকে নারায়ণগঞ্জ সার্কিট হাউজে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাক্ষ্য নেবেন তারা। নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাত খুনের ঘটনায় র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর হাইকোর্টের নির্দেশে গত ৭ মে এই তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here