রাবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি: বিদ্ধ ৩০, আহত আরো শতাধিক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা , হল ত্যাগের নির্দেশ

10

Rajshahiরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি ও বিভিন্ন বিভাগে সান্ধ্য মাস্টার্স কোর্স বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় আট সাংবাদিকসহ ৩০ জন রাবার বুলেট বিদ্ধ ও অন্তত শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আজ রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনের এই হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের দুটি আবাসিক হল লক্ষ্য করে শর্টগানের গুলিবর্ষণ করে এবং ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের বেধড়ক লাঠিপেটা করে। পরে বেলা আড়াইটার দিকে একদল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনের সামনে রাখা কয়েকটি গাড়ি এবং শিক্ষকদের ক্লাবে ঢুকে হামলা ও ভাংচুর চালান। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা জুবেরী ভবনে হামলা ও ভাংচুর চালিয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর সাখাওয়াত হোসেনসহ একাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন। এ সব ঘটনায় ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত পুলিশ ছাড়াও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। প্রক্টরের উদ্ধৃতি দিয়ে জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাস প্রফেসর মো. ইলিয়াছ হোসেন ক্যাম্পাসে বিজিবি মোতায়েনেরে সত্যতা স্বীকার করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার সকাল ৮ টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ দিকে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা হামলার ঘটনাকে পরিকল্পিত আখ্যায়িত করে ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দায়ী করেছে এবং শিক্ষার্থীদের আগের তিন দফা দাবিসহ আজকের হামলাকারীদের শাস্তি ও আহতদের চিকিত্সার ব্যায়ভার নেয়াসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে আন্দোলনকারীরা। অন্য দিকে, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার প্রতিবাদে কাল সোমবার থেকে ক্যাম্পাসে লাগাতার ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পরস্পর-বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। এ নিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্যাম্পাস সূত্রগুলো জানায়—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও সান্ধ্য মাস্টার্স কোর্স বিরোধী চলমান আন্দোলনের ষষ্ঠ ও টানা ধর্মঘটের তৃতীয় দিন আজ সকালে পুলিশ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে বাধা দেয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করে। বিক্ষোভ মিছিল শেষে তারা প্রশাসন ভবন ঘেরাও করে সমাবেশ শুরু করেন। সমাবেশ শুরুর কিছুক্ষণ পর সমাবেশের পাশে দুটি ককটেল বিম্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্ট্রর জুলফিকার আলী, হেলাল উদ্দিন ও সিরাজুল ইসলাম আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রশাসন ভবনের সামনে থেকে উঠে যাবার নির্দেশ দেন। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করেন। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দলীয় টেন্ট থেকে আন্দোলন-বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সমাবেশের ভেতর ঢুকে যায়। এ সময় বসে থাকা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উঠে গিয়ে মিছিলের জন্য জায়গা করে দেন। মিছিলটি সমাবেশস্থল অতিক্রম করে চলে যাওয়ার কিছু সময় পর মিছিলকারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা আকস্মিকভাবে পেছনে ঘুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘ধর, ধর..’ বলে ধাওয়া করে। তারা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে প্রথমে দুটি ককটেল বিম্ফোরণ ঘটান এবং পরে গুলিবর্ষণ করেন। এ সময় ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত সালাম, মোস্তাকিম বিল্লাহ, ফয়সাল আহম্মেদ রুনুকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ করতে দেখা যায়। একই সাথে সমাবেশের পাশে লিচুতলায় আগে থেকে অবস্থান নেয়া পুলিশ সদস্যরা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ শুরু করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে ছত্রভঙ্গ হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে। আহত শিক্ষার্থীদের আর্ত-চিত্কারে ক্যাম্পাসে ভয়ঙ্কর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের লিচুতলা, শহীদুল্লাহ কলাভবন ও পুরাতন ফোকলোর চত্বরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বেধড়ক মারধর করে। ছাত্রলীগের হামলা, পুলিশের রাবার বুলেট ও শর্টগানের গুলিবর্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কর্মরত আট সাংবাদিকসহ ৩০ জন বিদ্ধ ছাড়াও অন্তত শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। আহতদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি ও চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অমিত গ্বোসামী, তারিন, স্বপন, রাজিব, তাওহিদ, বিলকিস নাহার, আতিক, শোভন, সালমা, মায়া, আশুরা, রবিউল, পরাগ, আশিক, রাখি, সাজু, আবদুর রশিদ, যুঁথির নাম জানা গেছে।

জানা যায়—হামলার পর ছত্রভঙ্গ হয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারসহ বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নেন। এ সময় বিপুল-সংখ্যক পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ও টুকিটাকি চত্বরে অবস্থান নেয়। ছাত্রলীগ নেত-কর্মীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। কিছুক্ষণ পর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা রবীন্দ্র কলাভবনের দিকে সরে যান। অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে আটকেপরা শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকে। এর কিছুক্ষণ পর ভেতরে আটকেপড়া আহত শিক্ষার্থীদের বাইরে বের করে আনা হয়।

এ দিকে, ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে। বেলা ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা মাদার বখশ হলের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় ছাত্রলীগ ও পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে শহীদ সোহরওয়ার্দী ও মাদার বখশ হলের ভেতর ঢুকে যায়। এ সময় পুলিশ ওই দুটি হল লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। একপর্যায়ে পুলিশ হলে ঢুকে শিক্ষার্থীদের বেধড়ক লাঠিপেটা করে। অন্য দিকে, বেলা দেড়টার দিকে আন্দোলনের সমর্থনকারী পাঁচজন শিক্ষক কেন্দ্রীয় গ্রন্থগারের সামনে এসে ভেতরে অবস্থানকারী উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে তারা সেখানে প্রেস ব্রিফিং করে হামলার নিন্দা জানান। তারা বলেন, ‘চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের গুন্ডা ও পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে প্রশাসন আন্দোলন নস্যাত্ করতে চাচ্ছে। শিক্ষকরা হলেন, ‘নৃবিজ্ঞান বিভাগের বখতিয়ার আহমেদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কাজী মামুন হায়দার রানা, ফোকলোর বিভাগের সুস্মিতা চক্রবর্তী এবং পরিসংখ্যান বিভাগের আবু নাসের।

অপর দিকে, বেলা ২টার দিকে বিভিন্ন আবসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে বিশ্বদ্যািলয়ের দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনে থেকে মিছিল বের করে। মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্র্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এসে জড়ো হয়। এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় শিক্ষার্থীরা আবার জড়ো হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আবাসিক কোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত জুবেরী আন্তর্জাতিক অতিথি ভবনে হামলা ও ভাংচুর চালান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর সাখাওয়াত হোসেনসহ একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ছাত্রশিবিরের ক্যাডার ও সন্ত্রাসীরা জুবেরী ভবনে হামলা ও ভাংচুর চালিয়েছে। পরে তারা উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালাতে আসলে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে বেলা ৩টার দিকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান থেকে একদল শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনের রাস্তায় উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান দেয়।

এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সাংবদিকরা হামলার বিষয়ে রাজশাহী মহানগর উপপুলিশ কমিশনার প্রলয় চিচিমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় ক্যাম্পাসে গুলিবর্ষণের কারণ জানতে চাইলে সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে আসেন পুলিশের একদল সদস্য। এক পর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য সাংবদিকদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ছোড়ে ও সাংবাদিকদের ওপর লাঠিচার্জ করেন। এতে আট সাংবাদিক আহত হন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা নিউএইজের রাবি প্রতিনিধি নাজিম মৃধা, শীর্ষ নিউজের রাবি প্রতিনিধি তমাল, মানবকণ্ঠের ফাহিম, ফ্লাশ নিউজের সজীবন, এবি নিউজের মুন প্রমুখ। এ ছাড়া, সংঘর্ষ চলাকালে আহত হন দৈনিক সোনার দেশের ফটোসাংবাদিক শামস উর রহমান রুমি এবং দৈনিক যায়যায়দিনের ফটোসাংবাদিক জুয়েল। হামলার প্রতিবাদে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত সহকারী প্রক্টর সিরাজুল ইসলাম, সাখওয়াত হোসেন, হেলাল উদ্দিনকে অপসারণ ও পুলিশ উপকমিশনার প্রলয় চিসিমকে রাজশাহী থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান।

শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ব্যাপারে মহানগর পুলিশের উপকমিশনার প্রলয় চিসিম অবশ্য বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে শান্তিপূূর্ণভাবে আন্দোলন চলছিল। আজ সমাবেশ চলাকালে একটি মিছিল আসে। পরে ওই মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অ্যাকশনে যায়।’

এ ব্যাপারে উপাচার্য প্রফেসর মুহম্মদ মিজান উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে কখনো অ্যাকশননে যেতে পারি না। কিন্তু তারা আন্দোলনকালে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন। পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আজকের ঘটনাকে অনাকাঙ্খিত আখ্যায়িত করে সবাইকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেন।

উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বর্ধিত ফি বাস্তবায়ন স্থগিত করে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে উপাচার্য প্রফেসর মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কয়েক দিন ধরে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করছে। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নস্যাতত্ হতে দিতে চাই না। তাই আমরা সব ধরনের বর্ধিত ফি বাস্তবায়ন স্থগিত করছি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

সান্ধ্যা কোর্স বন্ধ করা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নিয়মিত কোর্সকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা হবে না—এমন নিশ্চয়তা নিয়েই উত্তরাঞ্চলের অনগ্রসর শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে বিভাগগুলোতে এই কোর্স চালুর অনুমতি দেয়া হয়েছে।’ কিন্তু উপাচার্য শিক্ষার্থীদের দাবি পুরোপুরি মেনে না নেয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সিন্ধান্তকে প্রত্যখান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন শিক্ষার্থীরা।

এ দিকে, বেলা ২টায় বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ দপ্তর থেকে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বর্ধিত ফি স্থগিতের ঘোষণা সংবলিত একটি প্রেসবিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক প্রফেসর মো. ইলিয়াছ হোসেন স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মুহম্মদ মিজানউদ্দিন শনিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রকার বর্ধিত ফি বাস্তবায়ন স্থগিত করার ঘোষণা দেন। সে প্রেক্ষিতে আজ রবিবার তিনি প্রশাসনিক নির্দেশে ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক/স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তিসহ সকল প্রকার ফি এবং পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের অধীনে বর্ধিত সকল ফি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে পুরাতন ফি বহাল করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সকল বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে এবং তারা ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।’

অপর দিকে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা ও সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল হাসান তুহিন পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। এ ব্যাপারে মিজানুর রহমান রানা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমাবেশে লুকিয়ে থাকা ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা ছাত্রলীগের মিছিল লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করলে ছাত্রলীগ তাদের প্রতিরোধ করে। এ নিয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধে যায়।’ অপর দিকে, ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল হাসান তুহিন ইত্তেফাককে বলন, ‘হামলার সঙ্গে ছাত্রলীগের কোনো সম্পর্ক নেই। এ বিষয় কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্তও ছিল না। তবে হামলায় ছাত্রলীগের কেউ যদি অংশ নিয়ে থাকে তারা নিজ দায়িত্বে নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আজ ক্যাম্পাসে সংঘটিত হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় ছাত্রশিবিরের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার সম্পাদক জিয়াউদ্দিন বাবলু জানান—আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সম্মতি থাকলেও তারা এতে অংশ নেননি। সুতরাং হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রশ্নই আসে না।

এ ছাড়া, বর্তমান ঐক্যমত্যের সরকারের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক মামুনুর রশীদ জন, যুগ্ম-আহ্বায়ক মাহবুব আলম সুজন, রিফাত রাজশাহী মহানগর কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান মতি, সাধারণ সম্পাদক আকছারুজ্জামান সুমন, সংগঠনিক সম্পাদক বিমান চক্রবর্তী এক যুক্ত বিবৃতিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি আক্রমণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সংগঠনের রাজশাহী মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আকছারুজ্জামান সুমন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে তারা আন্দোলনের দাবির সাথে একমত পোষণ করে অবিলম্বে সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিল এবং বর্ধিত সকল ফি প্রত্যাহারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে সন্ধ্যাকালীন মাস্টার্স কোর্স চালু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ফি দুই থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। অথচ কয়েক বছর আগে এর আগে থেকেই আইন ও বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু রয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও প্রশাসন ভবন ঘেরাও করার পর বৃহস্পতিবার থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও ধর্মঘট করে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া, শিক্ষার্থীদের ‘আন্দোলনের নামে নৈরাজ্যের’ প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here