রাবিতে নিজ কক্ষে ছাত্রলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকাল ধর্মঘট ছাত্রলীগের

19

RUরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের নিজ কক্ষে ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে হল মসজিদে জুম্মার নামাজ চলাকালে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এদিকে রুস্তম হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে রুস্তমকে হত্যা করেছে বলে তাদের অভিযোগ।

নিহত রুস্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষার্থী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ২৩০ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। আজ শনিবার তার ৪০৪ নং কোর্সের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার জন্য নিজ কক্ষে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রুস্তম সোহরাওয়ার্দী হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আগামী ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য কাউন্সিলে ওই হলের সভাপতি পদের প্রার্থী ছিলেন। তিনি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার চক নারায়ণ গ্রামের শাহজাহান আলীর ছেলে।

হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা জানান, শুক্রবার দুপুর সোয়া ১টার কিছু পর হলের মধ্যব্লকের ২৩০ নম্বর কক্ষ থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসে। এসময় হলের মসজিদে জুম্মার খুতবা চলছিল। ওই ব্লকের শিক্ষার্থীরা দ্রুত ঐ কক্ষে গিয়ে রুস্তমকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিত্সকরা জানান-তার বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে পেছনের দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে। এতে হার্ট ও ফুসফুস থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

রুস্তম হত্যাকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগ ছাত্রশিবিরকে দায়ী করলেও সংগঠনটি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মতিহার থানার ওসি এবি এম রেজাউল ইসলাম বলেন, এ হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে পুলিশ এখনও নিশ্চিত নয়। ছাত্রশিবিরও ঘটিয়ে থাকতে পারে। আবার ঘটনাটি ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও হতে পারে। এদিকে ক্যাম্পাসের ওয়াকিবহাল সূত্রগুলোর অভিমত, প্র্যাকটিস করার সময় নিজের গুলিতেও মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে রুস্তমের। তবে মতিহার থানার ওসি বলেছেন, নিজের গুলিতে রুস্তমের মৃত্যু হয়ে থাকলে ঘটনাস্থলে অবশ্যই আগ্নেয়াস্ত্রটি থাকার কথা। কিন্তু তাকে উদ্ধারের সময় সেখানে কোন অস্ত্র পায়নি পুলিশ। ফলে ঘটনাস্থলে অন্যপক্ষের উপস্থিতির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। খুনিদের চিহ্নিত এবং হত্যায় ব্যবহূত অস্ত্রটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা কোনো দলীয় কোন্দল বা নিজের গুলি নিজের গায়ে লাগার ঘটনা নয়। শিবিরের কেউ এসে মেরে গেছে। হত্যার সঙ্গে জড়িত শিবির ক্যাডারদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট চলবে। গতকাল বিকালে রুস্তমকে হত্যার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমতলায় আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এই ধর্মঘট আহ্বান করেন। তিনি আরো বলেন, ‘রুস্তমকে কয়েকদিন ধরে শিবিরের ক্যাডাররা হুমকি দিয়ে আসছিল। বিভিন্ন এসএমএস ও ফোনকলের মাধ্যমে এসব হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি গতকাল (বৃহস্পতিবার) সোহরাওয়ার্দী হলে গিয়ে রুস্তমসহ অন্য নেতাকর্মীদের সান্ত্বনা দিয়ে এসেছিলাম। এর একদিন পরেই শিবিরের ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করল।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক জিয়াউদ্দিন হাসিব দাবি করেন, ‘ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রুস্তম খুন হয়েছেন। ঘটনার সঙ্গে ছাত্রশিবিরের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই ও ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’ তবে ছাত্রলীগের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, শিবির থেকে ছাত্রলীগে আসা নেতা-কর্মীরাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক তারিকুল হাসান বলেন, কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানতে পারিনি। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে তিনি জানান ।

মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার প্রলয় চিসিম জানান, ‘আমরা ঘটনাটি তদন্ত করছি। এখনো পর্যন্ত কোনো ক্লু বের করতে পারিনি।’

‘হামার বুক কেটা খালি করলো বাবা’

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, রুস্তম আলীর বাড়ি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের চকনারায়ণপুর গ্রামে গতকাল শুক্রবার ছিলো শোকের মাতম। নিহতের মা রওশন আরা বেগম ছেলের ছবি দেখিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘হামার ছোলট্যা নেকাপড়া করব্যার গেচে। তাঈ কোন অন্যায় করে নাই। হামার বুক কেটা খালি করলো বাবা, তোমরা হামার ছোলোক আনি দ্যাও।’ বাবা শাহজাহান আলী বাড়ির উঠোনে ছেলেকে হারিয়ে জীবন্ত লাশ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে রুস্তমের বড়ভাই রওশন আলমও নির্বাক। মায়ের আহাজারি দেখে নিহতের ছোট ভাই রাকিব মিয়াও কাঁদছিল।

নিহত রুস্তম তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। বড় ভাই রওশন আলম কমিউনিটি ক্লিনিকে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার পদে চাকরি করেন। ছোট ভাই রাকিব মিয়া পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। তার বাবা শাহজাহান আলী পেশায় কৃষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here