রাজধানীতে সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলা হবে :প্রধানমন্ত্রী

12

pmপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪ উদ্বোধনকালে বলেছেন, রাজধানীতে একটি সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বাংলা একাডেমি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা বটমূল, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও শিল্পকলা একাডেমি এলাকা নিয়ে এ সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলা হবে। বাংলার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গতকাল শনিবার বিকালে রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী মাসব্যাপী এই গ্রন্থমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের প্রতিটি দেশের রাজধানীতে একটি সাংস্কৃতিক বলয় থাকে। সেখানে সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলা একাডেমি থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য একটি সুন্দর ওভারব্রিজ অথবা আন্ডারপাস করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পরে তাঁর সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে রমনা বটমূল পর্যন্ত ওভারব্রিজ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, আবার রমনা পার্ক থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও শিল্পকলা একাডেমি পর্যন্ত আরেকটি আন্ডারপাস করে দেয়া যায়। তাহলে পুরো এলাকার মধ্যে একটা সংযোগ হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিধি আরো সমপ্রসারিত করার সরকারি পরিকল্পনার কথাও জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রবাসী বাঙালিদের সহায়তায় এবং তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় একুশে ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কো কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি পায়। আজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালির একুশের চেতনা। এখন বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। যদিও কিছু সমস্যা আছে। তারপরও আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

জাতিসংঘে বাংলায় দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্মৃতি স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমিও সরকার প্রধান হিসাবে জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, যে জাতি ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে সে জাতি আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এজন্য সবার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আবারো সরকার গঠন করতে পেরেছি। বর্তমান সরকার সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। এই সরকারের আমলেই আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করতে সক্ষম হবো এবং এ রায় কার্যকরের ফলে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হবে। বাংলার মাটিতে এই অপশক্তির কোন ঠাঁই হবে না। হরতাল-অবরোধসহ শত প্রতিকূলতার মধ্যেও এবার বছরের শুরুতে মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩০ কোটি পাঠ্যবই বিতরণের বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশে পরিণত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, লেখক-প্রকাশকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকার সচেতন ও আন্তরিক রয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার জাতীয় গ্রন্থ নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকাশকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, বইমেলা প্রেরণার উত্স। আমরা সারা বছর বসে থাকি, কখন গ্রন্থমেলা শুরু হবে। দ্রোহের দীপাবলি জ্বেলে বছর ঘুরে আবার এসেছে অমর একুশে। তিনি বলেন, অনেক দিন ধরেই চিন্তা ছিল কীভাবে মেলার স্থান সমপ্রসারিত করা যায়। এবার গ্রন্থমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারণ হওয়া বাংলার প্রতিটি মানুষের জন্য গর্বের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সম্প্রসারণ এমন জায়গায় হয়েছে যেখানে ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার একুশে গ্রন্থমেলা উত্সর্গ করা হয়েছে সদ্য প্রয়াত ভাষা সৈনিক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের স্মৃতির উদ্দেশে। এ সময় বাংলা ভাষা সম্পর্কিত গবেষণায় আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ এই মহান ভাষা সৈনিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শামসুজ্জামান খান তার ও গোলাম মুর্শিদের সম্পাদনায় তিন খণ্ডের ‘বাংলা ভাষা বিবর্তনের অভিধান’ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। বইগুলো পেয়ে প্রধানমন্ত্রী খুবই খুশি হন। এর আগে জাতীয় সঙ্গীত ও চার ধর্মের গ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় উদ্বোধন অনুষ্ঠান। অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার পর সর্বসাধারণের জন্য মেলা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন তথ্য প্রযুক্তির যুগে হয়ত কাগজে ছাপা বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ইতিবাচক। মনে হয় আরো কিছুকাল হয়তো এ ধরনের আশঙ্কা না করলেও চলবে।

সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর মেলার পরিসর বাড়ানোর কথা তুলে ধরে বলেন, এটি ছিল দীর্ঘদিনের দাবি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে মেলার পরিসর বাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গ্রন্থমেলার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্রন্থমেলার মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে।

বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, বিদেশি প্রকাশকরাও যেন মেলায় অংশ নিতে পারে, সেজন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মেলার পরিধি বাড়ানো হলেও মেলার মূল আয়োজন একাডেমি প্রাঙ্গণেই থাকবে।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন ১১ জন

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এবার বাংলা একাডেমির পুরস্কার পেয়েছেন ১১ জন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন কবিতায় হেলাল হাফিজ, কথাসাহিত্যে পুরবী বসু, প্রবন্ধে মফিদুল হক, গবেষণায় যুগ্মভাবে জামিল চৌধুরী ও প্রভাংশু ত্রিপুরা, অনুবাদ সাহিত্যে কায়সার হক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে হারুন হাবীব, স্মৃতি কথা ও ভ্রমণ কাহিনী মাহফুজুর রহমান, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও পরিবেশ সাহিত্যে শহীদুল ইসলাম এবং শিশু সাহিত্যে যুগ্মভাবে কাইজার চৌধুরী ও আসলাম সানি।

এ বছর বাংলা একাডেমির ফেলো হিসাবে বিশেষ সম্মাননা পত্র ও ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয় প্রখ্যাত মূকাভিনয় শিল্পী পার্থ প্রতিম মজুমদারকে। পুরস্কার প্রাপ্তদের হাতে এক লাখ টাকার চেক, একটি করে শুভেচ্ছা স্মারক ও সনদ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এদের মধ্যে পূরবী বসু ও মাহফুজুর রহমান দেশের বাইরে থাকায় তারা অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here