রওশনকে নেতৃত্বের দায়িত্ব দিয়েই নির্বাচনে যাচ্ছে জাতীয় পা্টি।

26

image_29872.pic-19
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা বললেও তাঁর স্ত্রী পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদকে সামনে রেখে তলে তলে নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। একদিকে এরশাদের মুখরক্ষা, অন্যদিকে পার্টির অস্তিত্ব রক্ষা ও দলের প্রতীক লাঙ্গল রক্ষা করতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জাতীয় পার্টির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রওশন এরশাদের সাক্ষাতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য। এদিকে এরশাদের নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকা এবং দলের মহাসচিবের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার বিষয়টি রহস্যজনক বলে জানিয়েছে জাতীয় পার্টির একটি সূত্র।
জানা গেছে, গত ২ ডিসেম্বর নির্বাচন বর্জন ও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বেকায়দায় রয়েছেন এরশাদ। জাতীয় পার্টি নির্বোচনে না গেলে আওয়ামী লীগ হয়তো তফসিল পরিবর্তন করে পিছু হটবে- এমন বিশ্বাস থেকেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। কিন্তু গত দুই সপ্তাহে সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে এরশাদ তাঁর সেই অনড় অবস্থান থেকে সরে আসার চেষ্টা করছেন। সূত্র জানায়, এরশাদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণায় অনড় থাকার কথা মুখে বললেও মূলত লাঙ্গল প্রতীক ও দলের ভাঙন ঠেকাতে নেপথ্যে রওশন এরশাদকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। ফলে রওশনের সঙ্গে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার খবর পেয়েও কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না এরশাদ।
সূত্র জানায়, রওশন এরশাদ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হচ্ছেন- এমন খবরের বিষয়ে এরশাদ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় কারো ভারপ্রাপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি এখনো চেয়ারম্যান আছেন এবং থাকবেন। সব দল না এলে তিনি নির্বাচনে যাবেন না বলেও সেদিন গণমাধ্যমকে জানান। কিন্তু রওশন যদি নির্বাচনে যান তবে তাঁকে বহিষ্কার করা হবে কি না অথবা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যাবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেননি জাপা চেয়ারম্যান।
জানা গেছে, এরশাদ গতকাল রংপুর ও লালমনিরহাট থেকে তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। তবে তারিখ ভুল থাকায় ঢাকা-১৭ আসন থেকে তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি জেলা রিটার্নিং অফিসার। চিঠি ফেরত দেওয়ার কারণ সম্পর্কে ঢাকা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা জিল্লার রহমান বলেছেন, ‘তিনি (এরশাদ) ১১ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য চিঠি দিলেও তাতে তারিখ ছিল ৫ ডিসেম্বর। আমি তো এই চিঠি নিতে পারি না।’
গতকাল দুপুরে এরশাদের একান্ত সচিব মেজর (অব.) খালেদ আক্তার  বলেন, লালমনিরহাট এবং রংপুরে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার গৃহীত হয়েছে। কিন্তু ঢাকা-১৭ আসনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের চিঠিতে তারিখ ভুল থাকায় তা ফেরত পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার আবার চিঠি দেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, যে তারিখ ভুলের কথা বলা হচ্ছে এটাও হয়তো এরশাদ বা তাঁর লোকরা ইচ্ছা করেই করেছেন।
জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন রওশন এরশাদ। সেখানে তিনি জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেওয়া, লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ পাওয়া এবং কমপক্ষে ৮০টি আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী তুলে নেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৬০ থেকে ৬৫ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী তুলে নেওয়ার বিষয়ে রওশনকে আশ্বস্ত করা হয়।
এ বিষয়ে জানার জন্য রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে জাতীয় পার্টির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ মুহূর্তে এরশাদও নির্বাচনে যেতে চান, কিন্তু যেহেতু গত কয়েক দিনে তিনি নির্বাচনে যাবেন না বলে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন, তাই এখন তিনি তাঁর স্ত্রী রওশনকে সামনে রেখেই নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে চান।
সূত্র জানায়, যদি রওশন এরশাদ পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে আনতে পারেন, তবে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনে যতটা সম্ভব ছাড় দিতে প্রস্তুত। কারণ জাতীয় পার্টির নেতারা মনে করছেন, যদি ঘোষিত তফসিলে নির্বাচন হয়েই যায় তবে আওয়ামী লীগ নিশ্চিত বিজয় অর্জন করবে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী সরকার যদি দুই বছরও ক্ষমতায় টিকে থাকে তবে এরশাদের পক্ষে জাতীয় পার্টির ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হবে। এরই মধ্যে বহিষ্কৃত নেতা কাজী জাফর আহমদ বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্যকে নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বিরোধী দলের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তাই যদি বিএনপি নির্বাচনে আসে বা তারা পরবর্তী সরকার গঠন করে, তবে জাতীয় পার্টির এ অংশটিও এরশাদের দল থেকে অনেক নেতাকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। এদিকে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলুও জাতীয় পার্টির একটি অংশ নিয়ে সরকারে থেকে যেতে পারেন- এমন তথ্যও রয়েছে জাতীয় পার্টির নেতাদের কাছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়েও রয়েছে আশঙ্কা। এরশাদের দলের একসময়ের মহাসচিব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এখন জাতীয় পার্টি জেপির চেয়ারম্যান। তিনিও নির্বাচনে নাঙ্গল প্রতীক নিতে চান। এরশাদ নির্বাচনে না গেলে মঞ্জুরের লাঙ্গল প্রতীক পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে বিষয়টি সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফকির আশরাফ। জানতে চাইলে তিনি  বলেন, লাঙ্গল প্রতীকটি রওশন ও এরশাদ দুজনের যৌথ নামে। অন্য কোনো দল এ প্রতীক পেতে পারে না।
জানা গেছে, এরশাদ নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে অনড় থাকার কথা বললেও দলের মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। এরশাদের পক্ষে তিনি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন। দলীয় নেতারা বলছেন, যেখানে এরশাদের নির্দেশের পর দলীয় মহাসচিবের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের কথা, সেখানে গতকালও তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না তিনি জানাননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here