যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবার দুর্গ তছনছ বন্দুকযুদ্ধে ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজন নিহত

17

yabaইয়াবার নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে সীমান্তবর্তী উপকূলীয় অঞ্চল টেকনাফে। ইতিমধ্যে বন্দুকযুদ্ধে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন দুজন। বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ ইয়াবার গডফাদারদের নামের তালিকা ধরে ধরে অভিযান চালাচ্ছে। হানা দিচ্ছে মাদকের আস্তানাগুলোয়। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকার গহিন অঞ্চল এবং পাহাড়েও একযোগে চলছে সাঁড়াশি অভিযান। পাচারের চিহ্নিত রুটগুলোয় চেকপোস্ট বসিয়ে চলছে তল্লাশি। নাফ নদ, বঙ্গোপসাগরের সন্দেহভাজন বিভিন্ন পয়েন্টে কোস্টগার্ডের টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। শুধু মাদক ব্যবসায়ী নয়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। টেকনাফসহ চার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) কক্সবাজার জেলা থেকেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গণবদলির প্রস্তুতি চলছে এ চার থানার পুলিশ প্রশাসনে।

পাহাড়, নদী ও সাগর ঘেরা নিসর্গ টেকনাফ ভয়ঙ্কর এক জনপদে পরিণত হয়েছিল। দেশের সীমান্তবর্তী এ অঞ্চল হয়ে ওঠে মাদকের স্বর্গরাজ্য। মাফিয়াদের বিচরণে মুখর থাকে সুন্দরের লীলাভূমি টেকনাফ। টেকনাফ নিয়ে সরেজমিনে বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ইয়াবার ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে শুরু হয় যৌথ অভিযান। শনিবার ভোররাত থেকে রবিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে টেকনাফ সীমান্তে তালিকাভুক্ত দুই ইয়াবা গডফাদারসহ পাঁচজন বিজিবি, র‌্যাব ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত ইয়াবার আরও দুই পাচারকারী নিখোঁজ হন। এরা হলেন নুর মোহাম্মদ লাস্ট্রিপ ও সালমান। এদিকে সাঁড়াশি অভিযানের কারণে ক্ষমতাধর ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকারীরা এখন লাপাত্তা। এদের অধিকাংশের বাসাবাড়ি এখন প্রায় শূন্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ইয়াবা ব্যবসা ও মানবপাচার রোধে তাদের অবস্থান এখন জিরো টলারেন্সে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার আজাদ মিয়া গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ইয়াবা ও ইয়াবার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমরা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছি। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কারও কোনো তদবিরেও কাজ হবে না। যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টেকনাফের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, হঠাৎই পাল্টে গেছে মাদকের স্বর্গরাজ্য টেকনাফ। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের প্রকাশ্যে এখন আর দেখা যাচ্ছে না। দামি গাড়িও চোখে পড়ছে না দুই দিন ধরে। বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের তৎপরতায় তারা এখন আত্মগোপনে গেছেন। তবে তাদের আশঙ্কা, অভিযান শিথিল হলে আবারও ফিরবেন ইয়াবার নিয়ন্ত্রণকারীরা।

চার থানার ওসি বদলি : কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী চারটি থানার ওসিদের একযোগে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মো. জসীম উদ্দিন কুমিল্লা, টেকনাফ থানার ওসি রণজিৎ বড়ুয়া ফেনী, রামরু ওসি আপ্পেলা রাজু নাহা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও উখিয়া থানার ওসি জাহিদকে খাগড়াছড়ি বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া মহেশখালী, পেকুয়া, কুতুবদিয়া ও চকরিয়া থানার ওসিদেরও বদলি করা হবে।

শীঘ্রই গণবদলি : কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার চারটি থানার পুলিশকে গণবদলি করা হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশের কারণে ইতিমধ্যে চার থানার কনস্টেবল থেকে শুরু করে ওসি পর্যন্ত কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করা হয়। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, থানার অধিকাংশ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিংহভাগ পুলিশ সদস্যকেই তাই কঙ্বাজার জেলার বাইরে বদলি করা হবে বলে পুলিশের সূত্র জানায়।

আতঙ্কে গডফাদাররা, স্বস্তিতে সাধারণ মানুষ : হঠাৎ করেই টেকনাফের প্রতাপশালী মাদক ব্যবসায়ী অপহরণ-পরবর্তী গুম ও বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনায় এক প্রকার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্ত এলাকায় মাদকের গডফাদারদের মধ্যে। গত দুই দিন টেকনাফে এটি ছিল মূল আলোচনার বিষয়। ইয়াবা ব্যবসায় কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট লোকজনের চোখে-মুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ। একসময় দাপিয়ে বেড়াতেন এমন প্রভাবশালী অনেকেই এখন আর সাধারণ লোকজন দূরের কথা বিশ্বস্ত লোকজনের মোবাইল ফোনও রিসিভ করছেন না। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। অনেকেই সিমকার্ড পরিবর্তন করেছেন, ফোন বন্ধ করে দিয়েছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হঠাৎ করেই এক প্রকার শান্ত হয়ে গেছে সীমান্ত এলাকা টেকনাফ। ইয়াবা ব্যবসার টাকার জোরে যারা এতদিন ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন তাদের আর দেখা যাচ্ছে না। রাস্তায় কমে গেছে নম্বরবিহীন মোটরবাইকের সংখ্যাও। অনেকেই বিদেশ পালানোর চেষ্টা করছেন। বেশির ভাগ লোকই ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযানের মুখে টেকনাফে নেমে এসেছে এক প্রকার নিস্তব্ধতা। তবে স্বস্তি ফিরে এসেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসায়ী মোস্তাক গুলিবিদ্ধ : কক্সবাজার শহরে পুলিশের সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসায়ী মোস্তাক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ সময় চকরিয়া থানা পুলিশের কনস্টেবল মোহাম্মদ হোছাইন, মোহাম্মদ সেলিম ও জানে আলম আহত হয়েছেন। গতকাল ভোর রাতে শহরের কলাতলীর উত্তরণ আবাসিক এলাকায় চকরিয়া থানার পুলিশের সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি দেশীয় তৈরি একনলা বন্দুক, দুই রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও ব্যবহৃত একটি গুলির খোসা। এতে আহতদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি/তদন্ত) মো. নাসির উদ্দীন জানান, রবিবার বরফবোঝাই ট্রাকে করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে পাচারের সময় চকরিয়ার নলবিলা ফরেস্ট স্টেশন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় সাড়ে ৪ হাজার ইয়াবা ও নগদ টাকা এবং ইয়াবা পাচারে ব্যবহৃত একটি ট্রাক ও নোয়া গাড়িসহ কক্সবাজার পৌরসভার কলাতলী এলাকার মো. ফজলুল হকের ছেলে মোস্তাক আহমদও (৩২) ছিলেন। রবিবার পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোস্তাক আহমদ স্বীকার করেন, তার হেফাজতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ছাড়াও অবৈধ অস্ত্র মজুদ রয়েছে। এর পর সোমবার ভোরে মোস্তাক আহমদকে নিয়ে কক্সবাজার শহরের উত্তরণ আবাসিক এলাকায় যায় চকরিয়া থানার একদল পুলিশ। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি অাঁচ করতে পেরে মোস্তাক আহমদের সশস্ত্র লোকজন বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয় পুলিশের সঙ্গে। এতে পুলিশের ৩ কনস্টেবল আহত হন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন ইয়াবা ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমদ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মোস্তাক আহমদসহ অন্তত ১৭ জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে কক্সবাজার সদর থানায় পৃথক মামলা রুজু করেছে। প্রসঙ্গত, গত এক মাসে কক্সবাজারে ইয়াবাবিরোধী বিশেষ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ছয়জন ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here