মোদীর জয়ের ৫ কারণ

15

bjp joyভারতের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় দ্বিতীয়বারের মতো আরেকটি নির্বাচন ইতিহাস সৃষ্টি হলো। ইতিহাস গড়লো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ইতিহাসের মূল নায়ক মনে করা হচ্ছে দলকে ছাড়িয়ে ‘ব্যক্তি জনপ্রিয়তায়’ এগিয়ে থাকা নরেন্দ মোদীকে। গতকাল ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষিত হলো। এতে বিজেপি এককভাবে পেয়েছে ২৮৩টি আসন যা ৫৪৩ আসনের লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা।

গতকাল যেমন ইতিহাস সৃষ্টি করলো বিজেপি। ঠিক তেমনি আজ থেকে ৩০ বছর আগে এক ভিন্ন ইতিহাস সৃৃষ্টি করেছিল এই দলটি। সেটি ছিল পরাজয়ের। শুনতে বিস্ময়কর মনে হলেও সত্যি। ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে মাত্র দুটি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। যদিও বিশ্লেষকরা মনে করেন, তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর ভোটারদের সহানুভূতির কারণেই কংগ্রেস ৪১৫টি আসনে জয়ী হয়। প্রতিষ্ঠার মাত্র চার বছর পর পরাজয়ের এই ধাক্কা সহ্য করতে হয়েছিল বিজেপিকে। এরপর দলটি তিনবার ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের ১৩ দিনের মাথায় ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়। এরপর জোট গঠন করে বিজেপি যার নাম দেওয়া হয় ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ)। ১৯৯৮ সালে এনডিএ জোট ক্ষমতায় আসলেও স্থায়ী হয় মাত্র ১৩ মাস। ১৯৯৯ সালে আবারো ক্ষমতায়। ওই বছরের নির্বাচনে বিজেপি ১৮৪টি আসনে জয় পায়। ২০০৪ সালে এবং ২০০৯ সালে নানা জরিপের ফলাফলে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা যায় কংগ্রেসের হাতে। কিন্তু তারপরও থেমে থাকেনি হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। আর এর মধ্যে দলে ধীরে জনপ্রিয় এবং নেতৃত্বের পর্যায়ে চলে আসেন নরেন্দ মোদী। তাকে ঘিরে নানা বিতর্ক থাকলেও তোয়াক্কা করেনি জনগণ। কিন্তু আরো কারণ আছে এর পেছনে! বিশ্লেষকদের মতে, যতো কারণের কথা বলা হোক না কেন মূলত ৫টি কারণ কাজ করেছে বিজেপি’র জয়ের পেছনে :

অর্থনৈতিক নীতি : গত দশকে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য। গড়ে শতকরা ৮ ভাগ। কিন্তু গত বছর সেটা ৫ ভাগের নীচে নেমে যায়। আর এটা একটা সুযোগ এনে দেয় বিজেপিকে। প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মোদী নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেন এবং তার গুজরাট মডেলকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। করপোরেট জগতের বাসিন্দারাও ব্যবসাবান্ধব হিসেবে মোদীকেই সমর্থন দেন। তাছাড়া ভারতের সব রাজ্যের মধ্যে গুজরাটে অর্থনৈতিক ভিত্তিই সবচেয়ে মজবুত বলে মনে করা হয় যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মোদী নিজেই।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ : কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) দশ বছরের শাসনকালে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে আম আদমি পার্টি নামে একটি দলও গঠন করা হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন আন্না হাজারের মতো সামাজিক কর্মীরা। আর তাদের কর্মকাণ্ডে কংগ্রেসের বদনাম বাড়তে থাকে। তবে এর সুবিধাটা কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেয় বিজেপি। দলটিও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করে যা জনগণের কাছে প্রধান্য পায়।

তারুণ্য : ভারতে রাহুল গান্ধীর যুব নেতা হিসেবে পরিচয় আছে। কিন্তু দেশটির কর্মসংস্থান প্রয়োজন অনুসারে বাড়াতে পারেনি কংগ্রেস। আর এটাই বিপদের কারণ হয় কংগ্রেসের এবং জয়ে আসে বিজেপি’র ঘরে। কারণ দেশটিতে ৮১ কোটি ভোটারের মধ্যে অর্ধেকের বয়স ৩৫ বছরের নীচে। এসব মানুষের দরকার একটি চাকরি তথা কর্মসংস্থান। মোদী এসব যুবকদের কাছে অঙ্গিকার করেন, ক্ষমতায় গেলে চাকরির ক্ষেত্র সৃষ্টি করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী প্রচারণায় চাকরিতে সাম্প্রদায়িকতার ছাপও লাগিয়ে দেন মোদী। দেশটির অধিকাংশ হিন্দু যুবকরা সেটা লুফে নেয়।

প্রযুক্তি : এবারের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এবং মোদী নির্বাচনী প্রচারণায় উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। আধুুনিক প্রযুক্তির মোবাইল সেলফিও তাকে ব্যবহার করতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সাইটকে তিনি ব্যাপকভাবে কাজে লাগান। গত এক প্রায় এক বছর ধরে তিনি প্রতিদিনই টুইট করে আসছেন। আর এতে তার প্রচারণার গতি আরো শক্তিশালী হয়। এছাড়া গণমাধ্যমসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিজেপি’র ব্যাপক প্রচারণা চোখে পড়ে।

অবকাঠামো : ভারতে অনেক রাস্তা এবং বন্দরে বিদ্যুতের ঘাটতি আছে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ভোটারদের ওপর এটা প্রভাব ফেলে। দেশটির ভোটারদের এক তৃতীয়াংশ শহরে বাস করে। গুজরাটে মোদীর অবকাঠামো খাতের উন্নতি উল্লেখ করার মতো। তিনি এই খাতকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন। তিনি হাজার হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণ করেন। ফলে রাজ্য বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। রাজ্যটিতে দেশটির আধুনিক বন্দর নির্মাণ করা হয়। তিনি তার প্রচারণায় এই অঙ্গিকার করেন যে, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে তিনি সারা দেশে একইভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগিয়ে দেবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here