মৃত ছেলের মুখ কীভাবে দেখবেন মা?

13

52a0dd7917d95-chittagong_medical_others_05.12.13-1-অনেক দিন পর ছেলের খোঁজ পেয়েছেন হাসিনা বেগম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর আদরের সন্তান। ছেলেকে দেখার জন্য ছটফট করছেন মা। বাদ সাধল অবরোধ। অবরোধ ভাঙার পর তড়িঘড়ি বাসে উঠেছিলেন তিনি। ঢাকার পথ তখনো অনেক দূর। মা জানেন না, অভিমানী সন্তান তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে মৃত্যুর মিছিলে।
গতকাল রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে বাসে আগুন দেওয়ায় ঘুমের মধ্যে হাসিনার কিশোর ছেলে বাসশ্রমিক মো. হাসানের (১৭) শরীর ঝলসে যায়। তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে দীর্ঘ নয় ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সন্ধ্যা সাতটার দিকে মারা যায় হাসান।
সব মিলিয়ে গত ২৬ অক্টোবর থেকে গতকাল পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের আগুনে এবং ককটেল বিস্ফোরণে অন্তত ১২২ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শিশু-কিশোর ১৮ জন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ জনকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। মারা গেছেন ১২ জন। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে বর্তমানে ভর্তি আছেন ৩২ জন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে যাত্রাবাড়ীর সায়েদাবাদের জনপথ সড়কের পাশে রাখা দূরপাল্লার বাসগুলোর মধ্যে ইশরাত পরিবহন নামের একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেন কয়েকজন যুবক। স্থানীয় লোকজন বালু ও পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কিছুক্ষণের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে যান। তাঁরা বাসের ভেতরে দগ্ধ অবস্থায় কিশোর হাসানকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতেই ঢাকা মেডিকেলে পাঠান।

হাসানের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে। তবে সে চট্টগ্রামে আজম রোডে মা হাসিনা ও বোন নাসরিন আক্তারের সঙ্গেই থাকত। ১০ বছর আগে বাবা নাজিম উদ্দিন অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছেন। পোশাক কারখানায় চাকরি করে দুই সন্তানের ভরণপোষণ করছিলেন হাসিনা। একটু বড় হওয়ার পর চট্টগ্রামে পোশাক কারখানায় চাকরি নেয় হাসান। কিন্তু চার-পাঁচ মাস আগে তা ছেড়ে দেয়। অভাবের সংসারে একজনে কুলোতে পারছিলেন না হাসিনা। তাই চাকরি ছাড়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি হাসানকে মারধর করেন। অভিমান করে বাসা থেকে বের হয়ে ঢাকায় আসে হাসান। মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না, চার মাস বাসায় ফেরেনি। এখন ফিরবে লাশ হয়ে।

পুড়ে যাওয়া বাসটির মালিক সালাউদ্দিন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, ঢাকায় এসে রাজধানীর কয়েকটি যানবাহনে চালকের সহযোগীর কাজ করেছিল হাসান। গত বুধবার রাতে বাসের পাহারাদার ও চালকের সহযোগী হিসেবে হাসানকে তাঁর বাসে চাকরি দেওয়া হয়। গতকাল সকালে ওই বাসেই ঘুমিয়ে ছিল সে। ঘুমের মধ্যেই এ সর্বনাশ ঘটে গেছে। চট্টগ্রামে তাঁর পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছে।

গতকাল দুপুরে মুঠোফোনে হাসানের মা হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ছেলেকে দেখার জন্য হাঁসফাঁস করছিলেন তিনি। উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন, ‘আমার ছেলে কেমন আছে?’। ‘ভালো আছে’—বলার পর বললেন, ‘অবরোধের কারণে আসতে পারতেছি না। সন্ধ্যায় বাসে উঠমু। আপনারা একটু আমার ছেলেটারে দেইখেন ভাই।’ বিকেল পাঁচটার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার বাসে ওঠেন হাসিনা ও হাসানের খালু আমিরুল ইসলাম।

মৃত্যুর পর গতকাল রাত আটটায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে নিচুস্বরে আমিরুল বলেন, ‘সংবাদ পাইছি। কিন্তু ওর মারে জানামু না। নিজেই গিয়া দেখব। কী আর করা?’

পুড়ে গেছে ঋণ করে কেনা অটোরিকশাটিও: চট্টগ্রামের নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম জানান, মাত্র ছয় মাস আগে দুই লাখ টাকা ঋণ ও সারা জীবনের সঞ্চয় ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিনেছিলেন খোরশেদ আলম। গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় চান্দগাঁও থানার ওসমানিয়া গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে অবরোধ সমর্থনকারীরা সেই অটোরিকশাটিতে আগুন দেন। এতে পুড়ে যায় খোরশেদের শরীর, পুড়ে যায় পরিবারের ভরণপোষণের একমাত্র হাতিয়ার অটোরিকশাটিও।

গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে গেলে দগ্ধ খোরশেদের বিছানার পাশে বসে আহাজারি করতে করতে এই দুর্দশার কথা বলছিলেন স্ত্রী শামছুন নাহার। স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে চট্টগ্রামে আকবরশাহ থানার ফিরোজশাহ কলোনিতে থাকেন খোরশেদ। স্ত্রী শামছুন নাহার বলেন, ঘর ভাড়ার টাকা জোগাড় করতেই গতকাল অবরোধের সময়ও ঋণের টাকায় কেনা গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন তাঁর স্বামী। আর এখন না খেয়ে থাকার দশা। চিকিৎসার খরচ জোগানো নিয়েও তিনি এখন চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here