গাজীপুরে মাইকে ঘোষণা দিয়ে কারখানায় আগুন দিলেন শ্রমিকেরা

19

তিনটি বহুতল ভবনের সবকিছু পুড়ে ছাই ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের ১৪০ কর্মীর রাত দিন পরিশ্রমে আগুন নিয়ন্ত্রণে গার্মেন্টস কম্পাউন্ডের ২৩ গাড়িও ভস্মীভূতimage_89587গাজীপুরের বিসিক কোনাবাড়ি স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের পোশাক কারখানা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকরা। এতে কারখানার নয় তলা ভবনের প্রতিটি ফ্লোর, গোডাউনে রাখা বিপুল পরিমাণ কাপড়, মেশিনপত্র, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রায় সকল ফ্লোরের ছাদে ফাটল ধরায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ভবনটি। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার কিছু আগে বহিরাগত ও উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকরা কারখানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে, ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল। গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসলেও পুরোপুরিভাবে আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এটা।

শ্রমিকরা একই কম্পাউন্ডে থাকা স্টেশনারি ও কেমিক্যাল রাখার একটি ৬তলা ভবন এবং অপর একটি ৬ তলা ভবনের কয়েকটি ফ্লোরে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে কারখানার অভ্যন্তরে রাখা অন্তত ২৩টি বিভিন্ন প্রকার কাভার্ডভ্যান, মাইক্রোবাস পুড়ে যায়। তারা একটি হায়েজ মাইক্রোবাসসহ বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে। এসময় ৭টি বড় কাভার্ডভ্যানে শিপমেন্টের জন্য তৈরি কার্টনে পোশাক ভর্তি করা ছিল। শ্রমিকরা কারখানার অদূরে তাদের নিজস্ব একটি কার্টন ও একটি পলিথিন প্যাকেজিং কারখানায়ও আগুন দিয়ে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়। তারা কারখানার অভ্যন্তরে একটি তেলের ডিপোতেও আগুন ধরিয়ে দেয়।

এলাকাবাসী ও শ্রমিকরা জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে এলাকার সোয়েটার কারখানার একদল শ্রমিক স্ট্যান্ডার্ড কারখানার সামনে বিক্ষোভ শুরু করে। আন্দোলনে যোগ দেয়ার জন্য তারা আহবান জানায়। স্ট্যান্ডার্ড কারখানার শ্রমিকরা সাড়া না দিলে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে চলে যায়।

পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে আনুমানিক ৬০জন বহিরাগত শ্রমিক কারখানার অদূরে বালুর মাঠে এসে জড়ো হয়। তারা সেখান থেকে কারখানায় হামলার পরিকল্পনা করে। একপর্যায়ে বহিরাগত শ্রমিকরা স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের সামনে বিক্ষোভ করতে থাকে এবং গেট ভেঙ্গে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে। শিল্প পুলিশ টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশের গুলিতে স্ট্যান্ডার্ড কারখানার অপারেটর রাশেদুল গুরুতর আহত হয়। তাকে কারখানার অভ্যন্তরে নিজস্ব হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হলে তার অবস্থার অবনতি হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে এলাকায় পুলিশের গুলিতে দুইজন শ্রমিক নিহতের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এসময় আশপাশের মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দেয়া হয় যে, পুলিশ গুলি করে দুই শ্রমিক মেরে ফেলেছে। যার যা আছে তা নিয়ে শ্রমিকদের বের হয়ে আসার আহবান জানানো হয়। এ ঘোষণার পরপরই আশপাশের এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসে। তারা কোনাবাড়ি-জরুন রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে।

রাত ১২টার দিকে শতশত শ্রমিক স্ট্যান্ডার্ড কারখানার গেট ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে নিরাপত্তা কর্মীদের রুম ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে তারা কারখানার অভ্যন্তরে গিয়ে যানবাহনে নির্বিচারে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। শ্রমিকরা কারখানা ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে গিয়ে ভাংচুর ও আগুন দেয়।

ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসার চেষ্টা করলে শ্রমিকরা এক কিলোমিটার দূরে তাদের আটকে দেয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে শ্রমিকদের লাঠিচার্জ, টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাত একটার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেন। আগুনের তীব্রতা প্রকট আকার ধারণ করায় ঢাকা সদর দফতরসহ ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট এসে আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয়। একটানা দুই দফায় ১৪০জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী চেষ্টা চালিয়ে বেলা ৪টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, মালিকপক্ষ আন্তরিক হলেও শ্রমিকদের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং মারধর করে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের কারণে শ্রমিকরা এ ঘটনা ঘটায়। তারা বলেন, গত কিছু দিন আগে শ্রমিকরা তাদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি নিয়ে আন্দোলন করার সময় কারখানার কিছু কর্মকর্তা শ্রমিকদের অনেককে মারধর করে। এছাড়া গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবি বাস্তবায়ন হলেও সোয়েটার কারখানার শ্রমিকদের দাবি নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরে আন্দোলন করে আসছিল শ্রমিকরা। গার্মেন্টস শ্রমিকরা কাজ করলেও সোয়েটার শ্রমিকরা দাবি আদায়ে আন্দোলন করছিল।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আক্তারুজ্জামান জানান, কারখানা এলাকার কাছে পৌঁছলে শ্রমিকরা বাধা দেয়। পরে পুলিশি পাহারায় কারখানায় ঢুকে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করা হয়।

কারখানার জিএম নূর-ই-আলম জানান, ৯তলা ভবনে কয়েকটি কারখানা রয়েছে। আগুনে ওই সকল কারখানার মেশিনপত্র, বিপুল পরিমাণ ফেব্রিক্স ও মালামাল সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যায়। কারখানা ছুটি হয়ে যাওয়ায় কোন শ্রমিক হতাহত হয়নি। তিনি দাবি করেন, শত শত বহিরাগত উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক হামলা চালিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি জানান, কারখানায় ১৮ হাজার শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। ২০০২ সালে দেড় হাজার কোটি টাকার পুঁজি নিয়ে কারখান শুরু করা হয়েছিল। শ্রমিকের মধ্যে শতকরা ৭০ভাগই নারী শ্রমিক। গতকাল স্থানীয় সংসদ সদস্য আকম মোজাম্মেল হক এমপি, জেলা প্রশাসক মো. নূরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. আব্দুল বাতেনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান।

ফায়ার সার্ভিসের ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক মেজর মোহাম্মদ মাহবুব, মেজর শাকিল, আব্দুস সালাম, উপ-পরিচালক জহুরুল আমীন, সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো. মহসিনকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। সাত কার্য দিবসের মধ্যে তাদের রিপোর্ট প্রদান করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

গার্মেন্টস নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত উদ্যোক্তারা

একের পর এক গার্মেন্টস কারখানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগে এ খাতের উদ্যোক্তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তুচ্ছ ঘটনা এবং গুজবে ভর করে মূলত হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। যথাসময়ে শ্রমিকদের মজুরি দেয়া এবং কমপ্লায়েন্স সম্পন্ন (কর্মপরিবেশ) কারখানাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। ব্যাংক ঋণ আর নিজের শত কোটি টাকার বিনিয়োগ চোখের সামনে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছে বার বার নিরাপত্তা চাইলেও কার্যত হামলা-অগ্নিসংযোগ ঠেকানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগকারী উদ্যোক্তারা তাদের বিনিয়োগ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে কারখানার শ্রমিক আর বহিরাগত শ্রমিক ও দুষ্কৃতকারীদের আগুনে পুড়েছে গাজীপুরের কোনাবাড়িতে ১৮ হাজার শ্রমিকের রুটি-রুজির অবলম্বন স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একাধিক কারখানা। ২ জন শ্রমিককে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে—এমন গুজবে উত্তেজিত শ্রমিকরা গভীর রাতে নয়তলা কারখানা ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে আগুন দেয়। মালিকপক্ষের সংগঠন বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম জানিয়েছেন, এতে ৮শ’ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কারখানাটি ছিল সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্ট। শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও বকেয়া ছিল না। কারখানার মালিক প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন ও প্রকৌশলী আতিকুর রহমানও শ্রমিকদের জানিয়েছিলেন, ঘোষিত মজুরি বোর্ড অনুযায়ী তিনি শ্রমিকদের মজুরি দেবেন। কারখানাটি এইচ এন্ড এম, মার্ক এন্ড স্পেন্সার, জেসিপেনিসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নামি-দামি ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি করতো।

বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম এমন ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করলেন। তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এমন কমপ্লায়েন্ট কারখানাও ধ্বংস করা হচ্ছে। এটি দেশের জন্য খারাপ বার্তা। কোন অভিযোগ থাকলে আইন-আদালত আছে। তিনি দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

সংগঠনের সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, কারখানা ধ্বংস করা হচ্ছে, বিচার হচ্ছে না। কয়েকশ’ কোটি টাকার শিল্প চোখের সামনে শেষ হয়ে গেছে। বছরে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করতো এই স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। পথে বসে গেছে মালিক। একটি শিপমেন্ট বাতিল হলে একজন উদ্যোক্তার অর্জন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় ব্র্যান্ডগুলোকেও ধরে রাখা যাবে না। এসব ঘটনায় দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ভীত। তারা এখন কারখানার নিরাপত্তা চাচ্ছেন।

স্থানীয় প্রশাসনকেও এ জন্য দায়ী করছেন উদ্যোক্তারা। কয়েকজন নেতৃস্থানীয় উদ্যোক্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বার বার প্রশাসনকে বলা হয়েছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে প্রতিবেদন আছে, কারা এসব ঘটনার পেছনে জড়িত। কিন্তু কোন প্রতিকার নেই। আমরা কার কাছে যাব? আমাদের অভিভাবক কে? চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তারা আরো বেশি উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন।

প্রতিবেশী প্রতিযোগী দেশের ইন্ধনে এমন পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বিকেএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, এই ব্যবসা ধরে রাখা যাবে না। শ্রমিকদের সহিংসতায় স্মরণকালের বড় ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে মনে করছেন অনেকে।

আগুন দিয়ে কারখানা ধ্বংসের ঘটনায় উদ্বেগ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। তারাও মনে করছেন পরিকল্পিতভাবে এমন নাশতকা ঘটানো হয়েছে। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি গতকাল বলেন, ওই গ্রুপের (স্ট্যান্ডার্ড) কারখানার মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের সঙ্গে শ্রমিকদের সঙ্গে কিছু ঝামেলা ছিল। ১৫ থেকে ১৮ হাজার শ্রমিক যেখানে কাজ করে সেখানে এমন সমস্যা থাকা অমূলক নয়। তবে মালিক পক্ষে বা বেতনভাতা নিয়ে কোন সমস্যা ছিল না। এই ঘটনাকে পরিকল্পিত নাশকতা বলে মনে করেন তিনি। ঝুট ব্যবসায়ী, স্থানীয় দুষ্কৃতকারী ও বহিরাগতদের ইন্ধনে ওই কারখানার শ্রমিকদের কিছু অংশ এতে জড়িত ছিল বলে মনে করেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here