মহানায়িকার মহাপ্রস্থান

12

su-senমহানায়িকা সুচিত্রা সেন আর নেই। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৮২ বছর বয়সে আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনি পরলোকগমন করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবসান হলো বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের এক অধ্যায়ের।

তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন। এছাড়াও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের পরলোকগমনে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে মধ্য কলকাতার বেলভিউ বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। টানা প্রায় এক মাস ধরে তার শারীরিক অবস্থার উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে চলছিল। ফুসফুসে সংক্রমণের পাশাপাশি তাঁর হূদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ায় ২৯ ডিসেম্বর রাতে তাকে আইসিইউ-এ স্থানান্তরিত করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে ফের শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন তিনি। মধ্য রাতে ফের বাইপ্যাপ দেয়ার প্রয়োজন হলেও তা নিতে অস্বীকার করেন মহানায়িকা। তখন থেকেই অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। শুক্রবার ভোর থেকে প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে শেষ চেষ্টা করেন চিকিত্সকরা। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। সেইসঙ্গে পূরণ হলো না তাঁর শেষ ইচ্ছাও। পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি জানিয়েছিলেন, মারা যাওয়ার পর যেন তাঁকে বর্তমান সিরাজগঞ্জের (পূর্বের বৃহত্তর পাবনা) বেলকুচি উপজেলার সেনভাঙা গ্রামে তার শেষকৃত্য করা হয়।

সুচিত্রা সেন মারা যাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দেন, সুচিত্রা সেনের শেষকৃত্য হবে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। সেই ঘোষণা মতই গতকাল দুপুরে তার কেওড়াতলা মহাশ্মশানেই দাহ করা হয়। আজ দুপুর ১টা ৪৬ মিনিটে তাঁর মেয়ে সুচিত্রা সেনের মুখাগ্নি করেন। এই মহাশ্মশানেই মহানায়ক উত্তমকুমারেরও দাহ করা হয়েছিল। এর আগে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে।

সুচিত্রা সেনের জন্ম বাংলাদেশে। তার শ্বশুড়বাড়িও ছিল ঢাকার গ্লোরিয়ায়। পাবনায় ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রমা দাশগুপ্তা। পরবর্তীতে যিনি সুচিত্রা সেন পরিচয়ে বাঙালির হূদয়ে চির আসন করে নেন। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মা ইন্দিরা দাশগুপ্ত একজন গৃহবধূ। রমা বাবা-মায়ের পঞ্চম সন্তান এবং তৃতীয় কন্যা। বাবা-মা, এক ভাই ও তিন বোনকে সাথে নিয়ে রমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনের বাড়িতে। পাবনাতেই তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষা শুরু হয়। পাবনা মহাখালি পাঠশালায় শুরু এবং পরবর্তী সময়ে পাবনা গার্লস স্কুলে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর তার আর পড়াশোনা হয়েছে বলে জানা যায়নি। পাবনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্বপরিবারে কলকাতায় পাড়ি দেন। পাবনা ভোকেশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও পাবনা সরকারি বাণিজ্য মহাবিদ্যালয়ের বিপরীতেই সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি।

১৯৪৭ সালে দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয সুচিত্রা সেনের। সুচিত্রা সেনের স্বামী দিবানাথ সেন ছিলেন গ্লোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও অভিজাত ব্যক্তিত্ব দীননাথ সেনের নাতি। দিবানাথের বাবা আদিনাথ সেনের সহযোগিতা পেয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। ১৬ বছরের দাম্পত্যজীবন শেষে সুচিত্রা সেন ও দিবানাথ সেন আলাদা হয়ে যান।

১৯৭২ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার লাভ করেন তিনি। জনসমক্ষে না আসতে চেয়ে ২০০৫ সালে প্রত্যাখ্যান করেন দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার। ২০১২ সালে বঙ্গ বিভূষণ পান। তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি কোন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে পুরস্কার পান। ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উত্সবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন।

সুচিত্রা সেন অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র

সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩), ওরা থাকে ওধারে (১৯৫৪), অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪), শাপমোচন (১৯৫৫), সবার উপরে (১৯৫৫), সাগরিকা (১৯৫৬), পথে হল দেরি (১৯৫৭), হারানো সুর (১৯৫৭), দীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৯), সপ্তপদী (১৯৬১), বিপাশা (১৯৬২), চাওয়া-পাওয়া, সাত-পাকে বাঁধা (১৯৬৩), হসপিটাল, শিল্পী (১৯৬৫), ইন্দ্রাণী (১৯৫৮), রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮), সূর্য তোরণ (১৯৫৮), উত্তর ফাল্গুনি (১৯৬৩) (হিন্দিতে পুনঃনির্মিত হয়েছে মমতা নামে), গৃহদাহ (১৯৬৭), ফরিয়াদ, দেবী চৌধুরানী (১৯৭৪), দত্তা (১৯৭৬), প্রণয় পাশা, প্রিয় বান্ধবী, আঁধি প্রভৃতি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here