মনোনয়নবঞ্চিতরা ক্ষুব্ধ স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন আ.লীগের অর্ধশত নেতা

9

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে দলটির প্রায় অর্ধশত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়বেন। এই তালিকায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বর্তমান সাংসদ, সাবেক সাংসদ, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দলের বর্তমান ও সাবেক এসব নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোগাতে পারেন দলটিকে। ফলে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে ছাড়াই আওয়ামী লীগের ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হবে।

জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিজানুর রহমান শেলী প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষোভ থেকে হয়তো তাঁরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত ইমেজ ও জনপ্রিয়তার কারণে জিতে যেতে পারেন। তিনি বলেন, সাময়িকভাবে এটা আওয়ামী লীগের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। তবে বিএনপি নির্বাচনে এলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।

নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী। দলীয় মনোনয়ন তিনিই পেয়েছেন। তবে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কে এম শফিউল্লাহ বীর উত্তম।

মুন্সীগঞ্জ-২ (টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং) আসনের বর্তমান সাংসদ সাগুফতা ইয়াসমিন। তবে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাবেক এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমেদ।

পটুয়াখালী-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাংসদ গোলাম মাওলা রনি। দলের মনোনয়ন পাবেন না অনুমান করে দলীয় মনোনয়নপত্রই তোলেননি নানা কারণে আলোচিত এই সাংসদ। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন।

ঢাকা-৪ আসনে বর্তমান সাংসদ সানজিদা খানম। এই আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আওলাদ হোসেন। তবে দলীয় মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হওয়ায় এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আওলাদ হোসেন।

ঢাকা-৬ আসনে বর্তমান সাংসদ মিজানুর রহমান খান। দলীয় মনোনয়ন তাঁকেই দেওয়া হয়েছে। তবে এই আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুর রহমান (সহিদ কমিশনার)। দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় সাইদুর রহমান এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়বেন।

ফেনী-১, ফেনী-২ ও ফেনী-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন বহুল আলোচিত, বিতর্কিত ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল হাজারী। তাঁর পক্ষে জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে আজ এ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। তবে এই তিন আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছেন।

ফরিদপুর-৪ নূর-ই-আলম চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ।

সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ মণ্ডল। তবে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেত্রী ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সোনিয়া সবুর আকন্দ। তবে এই আসনের বর্তমান সাংসদ ও সাবেক মত্স্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস মনোনয়নপত্র কেনেননি।

কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের বর্তমান সাংসদ মিজানুল হক মনোনয়ন না পাওয়ায় ইতিমধ্যে দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী নাসিরুল ইসলাম। মিজানুল হক এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

পাবনা-১ (বেড়া একাংশ-সাঁথিয়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আবু সাঈদ। এই আসনে বর্তমান সাংসদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বর্তমান সাংসদ সোলায়মান জোয়ার্দার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে গত পাঁচ বছরে সোলায়মানের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ শামসুল আবেদিন।

চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সাংসদ আলী আজগর টগর। আবারও তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও দর্শনা পৌরসভার সাবেক মেয়র মতিয়ার রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

যশোর-৫ আসনের বর্তমান সাংসদ খান টিপু সুলতান। তাঁর বিরুদ্ধে জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও মনিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান স্বপন ভট্টাচার্য এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। স্বপন ভট্টাচার্যের ভাতিজা নিতাই কুমার বৈরাগী প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। এ জন্য যে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন, সেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

যশোর-৪ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে বর্তমান সাংসদ রণজিত্ রায়কে। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন সাবেক হুইপ শেখ আবদুল ওয়াহাব। ওয়াহাবের পক্ষে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী দিলীপ কুমার গোস্বামী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কুষ্টিয়া-৪ আসনে বর্তমান সাংসদ সুলতানা তরুণকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আবদুর রউফকে। দলের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সুলতানা তরুণ। সুলতানা তরুণের ছেলে গোলাম মোরশেদ পিটার প্রথম আলো ডটকমকে তাঁর প্রার্থীর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া এ আসন থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল হকও স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন।

খোঁজখবর করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ দলীয় পৌর মেয়র, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ প্রায় অর্ধশত প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের সঙ্গে সমঝোতা হলে এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভামণ্ডলীর এক সদস্য জানান, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাঁরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত দলের সঙ্গে তাঁদের সমঝোতা হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই সদস্য। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের একজন সদস্য বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ যোগাযোগ করতে পারে।

সুত্রঃ প্রথম আলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here