বেশিদিন চুপ থাকব না, সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া

13

khaledaপাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘জালিয়াতিপূর্ণ’, দশম জাতীয় সংসদকে ‘তামাশার’ এবং বর্তমান সরকারকে ‘সম্পূর্ণ অবৈধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, জবরদস্তি ও ত্রাসের এই বেআইনি শাসনের বিরুদ্ধে জনগণ বেশিদিন নীরব থাকবে না। আমরাও চুপ থাকবো না। সময় বেঁধে দেবো না, তবে অতি দ্রুত নির্বাচন চাই। একটু গুছিয়ে নেয়ার পরেই আন্দোলনের কর্মসূচি দেবো।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ওয়েষ্টিন হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে সারাদেশে প্রায় ৩শ’ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী খুন ও গুম হয়েছেন। এই হত্যালিলা বন্ধে তিনি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সকল মানবাধিকার সংস্থার প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। প্রসঙ্গত, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এটা ছিল তার দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলন। এর আগে তিনি ওয়েষ্টিন হোটেলেই নির্বাচনোত্তর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আসেন গত ১৫ জানুয়ারি।

বেগম খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসনের ধ্বংস্তূপ থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র এনেছে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পুনর্জন্ম দিয়েছে। স্বৈরাচার হটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। জনগণের সমর্থনে বার বার দেশ পরিচালনায় অভিজ্ঞ বিএনপি জানে, কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন কৌশল ও কর্মপন্থা নিরূপণ করেই বিএনপি এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, রাজনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে আমার যতটুকু জ্ঞান আছে, তা থেকে বুঝি যে, আজকের সভ্য পৃথিবীতে দু’একটি সার্টিফিকেট জোগাড় করে এই অন্যায় ও অবৈধ শাসনকে প্রলম্বিত করা যাবে না। বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন এই স্বৈরাচার ও স্বেচ্ছাচারকে মেনে চলবে না। আমারও অনির্দিষ্টকাল ধরে শুধু সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানিয়েই যাবো, এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। তাই সময় থাকতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আবারও আহ্বান জানাচ্ছি।

প্রশ্নোত্তর পর্ব

লিখিত বক্তব্য শেষে সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিসহ আমাদের জোটের না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। এ সরকারের অধীনে যে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হতে পারে না, সেটি এখন সবার কাছে প্রমাণিত। কাজেই আমরা কোনো ভুল করিনি, ভুল করেছে এই অবৈধ সরকার।

‘সরকার বলছে জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়লে তারা সংলাপে বসবে না’-এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আমরা কাদেরকে সঙ্গে রাখবো না রাখবো সেটা তো আমাদের বিষয়। অন্য কারো ডিক্টেশনে তো বিএনপি চলে না। তাছাড়া তারাও (আওয়ামী লীগ) একসময় ওদের (জামায়াত) সঙ্গেই ছিল।

‘আপনি তো শুরু থেকেই সরকারকে অবৈধ বলছেন। তাহলে কোনো আন্দোলন নেই কেন, আপনারা কী সরকারকে কোনো সময় বেঁধে দিচ্ছেন?’- এরকম এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সময় বেঁধে দেবো না। জনগণ দ্রুত গণতন্ত্র ফিরে পেতে চায়। এজন্য দরকার নির্দলীয় সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ নির্বাচন। সরকার সভা-সমাবেশ করতে না দিলেও আমরা এখনও কিছু কর্মসূচি পালন করছি। তবে এই অবস্থা বেশিদিন চলতে পারে না। আমাদের বহু নেতা-কর্মী কারাগারে, অনেকে খুন-গুম-জখম হয়েছেন। সেজন্য কিছুটা গুছিয়ে নিচ্ছি। এরপর কর্মসূচি দেবো। আমাদের সমঝোতার আহ্বানে কে সাড়া দিল না দিল, সেদিকেও আর তাকিয়ে থাকবো না।

‘আপনি তো বলছেন, জনগণ আপনাদের সঙ্গে আছে। কিন্তু ২৯ ডিসেম্বরের কর্মসূচিতে তো আপনার দলের ও জোটের নেতা-কর্মীরাই রাস্তায় নামেননি। তাহলে ভবিষ্যতে কর্মসূচি দিলে তা কীভাবে সফল হবে?’- এই প্রশ্নের জবাবে ১৯ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া বলেন, মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচির দিন আমাদের নেতা-কর্মীরা সবাই আশপাশেই ছিলেন। সরকার যেভাবে পুলিশ দিয়ে বাধা দিয়েছে, সরকারই সারাদেশকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। আপনারা দেখেছেন, আমাকেও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল্ সরকার যদি এসব না করতো তাহলে রাস্তায় সেদিন জনস্রোত হয়ে যেতো। আমাদের সঙ্গে জনগণ সবসময়ই ছিল, এখনও রয়েছে, ভবিষ্যতেও থাকবেন। কারণ এই জনগণ ও বাংলাদেশই আমাদের শক্তি।

‘যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক একটি সংস্থার জরিপে বলা হয়েছে-সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগই জিততো’- এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোটারও ভোট দেননি। সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ নির্বাচন হলে আমরা দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেতাম। কাজেই ওসব জরিপের কোনো মূল্য নেই। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে অবৈধ বলার পরেও উপজেলা নির্বাচনে ১৯ দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা তো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা তো বলছি জাতীয় নির্বাচনের কথা, যে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। আমরা প্রথম থেকেই বলছি-নির্দলীয় সরকার ছাড়া ১৯ দল জাতীয় নির্বাচনে যাবে না।

আমরা আসন ভাগাভাগি চাইনি

খালেদা জিয়া বলেন, দেশে এখন গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্রকে হত্যা করে, প্রায় একদলীয় ও একব্যক্তির স্বৈরশাসন জাতীর কাঁধে চেপে বসেছে। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। তিনশ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ১৫৩টি তারা ভোটের আগেই ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে। বিএনপিকেও তারা এর ভাগ দিতে চেয়েছিল। আমরা আসন ভাগাভাগি চাইনি। চেয়েছি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। যেখানে মানুষ ভোট দিতে পারবে। তেমন নির্বাচন নিশ্চিত করতেই আমরা নির্দলীয় সরকারের দাবি জানিয়েছিলাম। সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে, এ দাবি কত সঠিক ছিল। তিনি বলেন, এই সরকার ও সংসদ বৈধ জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হয়নি। এই সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সাজানো বিরোধী দলীয় নেতা কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হননি। প্রধানমন্ত্রীও নির্বাচিত হয়েছেন সাজানো প্রহসনে।

খুন-গুমের পরিসংখ্যান

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে এক মাসে রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ২১ জন নেতা-কর্মীকে গুম করা হয়েছে। আর ওই সময়ে সারা দেশে ৩০০ জন নেতা-কর্মীকে খুন ও গুম করা হয়। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের তালিকা করে বেছে-বেছে খুন ও গুম করা হচ্ছে। পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে। দেশকে হত্যাকাণ্ডের এক আতঙ্কিত জনপদে পরিণত করা হয়েছে। বিএনপির কেন্দ ীয় দপ্তরে সংগৃহীত তথ্য অনযায়ী মাত্র এক মাসেই বিরোধী দলের ২৪২ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা, ৬০ জনকে গুম করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে বিরোধী দল আন্দোলন শুরুর পর থেকে গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিরোধী দলের ২৭৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আটকের পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৩৪ জন। গ্রেফতার করা হয়েছে ২৯ হাজার ২৬২ জনকে। বিএনপির চেয়ারপারসন দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান। তিনি বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে সশস্ত্র আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানান।

জনগণ আওয়ামী লীগকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে

খালেদা জিয়া বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন স্বতস্ফূর্তভাবে প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে দেশের জনগণ আওয়ামী লীগকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে। ভোট ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষ অপেক্ষায় আছে। তারা উপযুক্ত জবাব দেবে। দুর্বলের প্রতিশোধ ভয়ঙ্কর। পরাজয়ের গ্লানি ভয়াবহ। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে গেছে। তারা একদিকে রাজনৈতিক সন্ত্রাস চালাচ্ছে, অপরদিকে দলীয় সন্ত্রাসীদের সারা দেশে লেলিয়ে দিয়েছে। দেশে এখন চরম অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। এটা বেশিদিন চলবে না। যে কোনো উপায়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবোই।

চরমপন্থী ও জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থানের আশঙ্কা

১৯ দলীয় জোট প্রধান বলেন, গণতন্ত্রহীন বাংলাদেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতিতে অবাধ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে এখানে একটি মানবিক বিপর্যয় ত্বরান্বিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনীতির নিষ্ঠুর দলনের পরিণতিতে চরমপন্থি ও জঙ্গীবাদী শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। উগ্রবাদী পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে প্রতিবাদী তারুণ্য ও অবদমিত শক্তিকে। এই হঠকারিতার পরিণাম সম্পর্কে সবাইকে সক্রিয় ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

এশিয়া কাপে জাঁকজমক না করার আহ্বান

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে সাবেক বিরোধী দলীয় এই নেতা বলেন, শোকাবহ এই দিনে এবার নাকি এশিয়া কাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা হবে, সেখানে গান-বাজনা করা হবে। বেদনাবিধুর ওইদিনে অনুষ্ঠানে কোনো জাঁকজমক না করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বেগম খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন স্থলে উপস্থিত নির্ধারিত সময়ের আধাঘণ্টা পরে, বিকেল সাড়ে চারটায়। লিখিত বক্তব্যের শুরুতেই তিনি ভাষার মাসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পূজার শুভেচ্ছা জানান। গতকালই কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বিএনপি নেতা- এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিএনপিসহ ১৯ দলের নেতাদের মধ্যে ছিলেন- ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আর এ গণি, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, হান্নান শাহ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কাজী জাফর আহমদ, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ ও সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here