বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল

15

rabজিজ্ঞাসাবাদে ভেঙে পড়েছেন সাবেক ৩ র‌্যাবকর্তা
নারায়ণগঞ্জে অপহরণোত্তর ৭ খুনের ঘটনায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে একের পর এক থলের বিড়াল বেরিয়ে আসছে। রিমান্ডে টানা জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব-১১-এর সদ্য সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এমএম রানা হত্যাকা-ের অনেক তথ্যই প্রকাশ করেছেন। তাদের দেওয়া জবানবন্দি, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, জব্দকৃত আলামত, টেলিফোনে কথোপকথনসহ যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পুলিশের কাছে এখন পুরো ঘটনাই পরিষ্কার হয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ ৭ জনকে অপহরণের পরিকল্পনা, অপহরণ, হত্যা এবং লাশ শীতলক্ষ্যায় কখন, কীভাবে, কারা ফেলেছিল, তার বিশদ চিত্র এখন পুলিশের তদন্তকারী সংস্থার হাতে।
সূত্র জানায়, সোমবার বেলা ৩টার পর থেকেই অপহরণোত্তর ৭ খুনের ব্যাপারে মুখ খুলতে শুরু করেন র‌্যাবের সাবেক ৩ কর্মকর্তা। এমনকী নিজেদের সম্পৃক্ততার কথাও। তবে রিমান্ডে প্রথম দুদিন তাদের নার্ভ ছিল শক্ত। কোনও প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না জিজ্ঞাসাবাদে। কিন্তু সোমবার বিকালের পর থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তারা। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের টিমের জিজ্ঞাসাবাদে একে-একে বলতে থাকেন অপহরণ থেকে হত্যাকা- পর্যন্ত ঘটনাবলি। পরিকল্পিতভাবে র‌্যাবই যে ওই ৭ জনকে তুলে নিয়ে যায়, বাদ যায় না সেকথাও।
নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম রোববার গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, অপহরণের পর ৭ জনকে র‌্যাব-১১-এর নারায়ণগঞ্জ পুরনো কোর্ট এলাকার ক্যাম্পে নিয়ে হত্যা করা হয়। ৩ র‌্যাব কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। সূত্র মতে, ২৭ এপ্রিল দুপুরে নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণের ৮ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছেন রিমা-ে থাকা তিন র‌্যাব কর্মকর্তা। এত দ্রুত ৭ জনকে হত্যা করা হল কেন, সে প্রশ্নেরও জবাব দিয়েছেন তারা।
৩ র‌্যাব কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে ঘটনার দুই মাস আগেই অপহরণের পরিকল্পনা করা হয়। ২৭ এপ্রিল দুপুরে ৭ জনকে অপহরণে অভিযান পরিচালনাকারী টিমের ওপর নির্দেশ ছিল নজরুল ইসলাম ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনকেই শুধু অপহরণ করতে হবে। কিন্তু আইনজীবী চন্দন সরকার অপহরণের সময় মোবাইল ফোনে অপহরণের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করায় গাড়িচালকসহ তাদেরও অপহরণ করা হয়। অপহরোণত্তর হত্যাকালে ছাড় পাননি এ দুজনও।
সূত্র মতে, জিজ্ঞাসাবাদে তারেক সাঈদ পুলিশকে জানিয়েছেন, নজরুল ইসলাম ও তার সঙ্গীদের অপহরণের কথা তিনি আগেই জানতেন। কিন্তু অভিযানকারী দলটি যে তাদের বাইরে আরও দুজনকে অপহরণ করেছে, এটা তার প্রথমে জানা ছিল না। পরে অভিযানে যাওয়া লোকজনের মুখে শুনতে পান ৭ জনের কথা। ঘটনায় র‌্যাব-১১-এর বাইরেও দুয়েকজন কর্মকর্তা অভিযানে থাকা দলটিকে নিয়ন্ত্রণ করছিল কি না- এ ব্যাপারে রিমান্ডে থাকা সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তা পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দেন। প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে পুুলিশ উচ্চ প্রযুক্তিগত সহায়তা নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ৩ র‌্যাব কর্মকর্তার দেওয়া সব জবানবন্দি অডিও রেকর্ড করা হচ্ছে। পরন্তু কিছুু বক্তব্য ভিডিও ক্যামেরাবন্দিও করা হচ্ছে, যেন ভবিষ্যতে এ নিয়ে কথা উঠলে প্রমাণ হিসেবে তা উপস্থাপন করা যায়।

ডিসি-এসপিকে গ্রেপ্তার ও মন্ত্রী মায়ার পদত্যাগ দাবি
নারায়ণগঞ্জ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, অপহরণোত্তর ৭ খুনের ঘটনায় র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ও র‌্যাব-১১-এর সাবেক সিও তারেক সাঈদ মোহাম্মদের আত্মীয় মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার পদত্যাগ দাবি করেছেন জেলা আইনজীবী সমিতি।
মঙ্গলবার দুপুরে জেলা আইনজীবী সমিতি অফিসে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন এই দাবি করেন। এর আগে একই দাবিতে আইনজীবী সমিতি সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা আদালত বর্জন করে।
নূর হোসেনের বিরুদ্ধে হত্যামামলা
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জে ৮ বছর আগে সংঘটিত স্কুলছাত্র টিপু সুলতান হত্যার ঘটনায় ৭ খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শফিকুল ইসলামের আদালতে নিহত টিপু সুলতানের বাবা কাজী আক্তারুজ্জামান বাদি হয়ে এই মামলা দায়ের করেন বলে জানিয়েছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন। আদালত মামলার আবেদন গ্রহণ করেছেন। পরে আদেশ দেবেন বলে তিনি জানান।
মামলায় বাদি কাজী আক্তারুজ্জামান উল্লেখ করেন, ২০০৬ সালের ২০ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জের উত্তর আজিবপুর এলাকার বাড়িতে আসামি নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা তার কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। অন্যথায় পরিবারের লোকজনকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হুমকি দেন। বাড়ির জায়গা তার নামে লিখে দেওয়ার জন্যও বলেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ওই বছরের ২৬ আগস্ট বাড়ির পাশে খেলার সময় তার ছেলে টিপু সুলতানকে ডেকে নিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে চলে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here