বৃহস্পতিবার রাতেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, যেভাবে ফাঁসি কার্যকর

21

image_66406_0যেভাবে ফাঁসি কার্যকর
কারা সূত্র জানায়, আজ রাত ৭ টার দিকে কাদের মোল্লার স্বজনরা তাঁর সঙ্গে দেখা করে কারাগার থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর পরই তাঁকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। সাড়ে ৯টা টার দিকে কাদের মোল্লাকে গোসল করানো হয়। এর পর তওবা কারা মসজিদের ইমাম তওবা পড়ান। উর্ধ্বতন এক কারা কর্মকর্তা বলেন, মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার আগে তার দুই হাত পেছনের দিকে নিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এর পর মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয় কালো রঙের টুপি, যাকে জমটুপি হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এই টুপি পরা অবস্থায় তাকে এক কারা রক্ষি ধরে নিয়ে যান ফাসির মঞ্চের দিকে। এ সময় ১০-১২ জন কারারক্ষী অস্ত্রসহ তাকে পাহারা দেন। তখন ফাঁসির মঞ্চ ঘিরে ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা, কারাগারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তরা।

রাত ০৯টা ০১ অথবা ১০টা ১ মিনিটে জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে ছয়জন ফাঁসি কার্যক্রম শেষ করেন বলে কারা অভ্যন্তরের কয়েকটি সূত্র  নিশ্চিত করেছে।

নৃশংসতার জন্য একাত্তর সালে আলবদর বাহিনীর সদস্য মোল্লার কুখ্যাতি ছড়িয়ে ছিল মিরপুরের কসাই নামে। বিচার চলাকালে কাঠগড়ায় থেকেও তার দম্ভোক্তি শোনা গিয়েছিল- ‘বাংলাদেশ হয়েছে বলে অনেকের মাতব্বরি বেড়ে গেছে’।

অপরাধযজ্ঞের দীর্ঘ ৪২ বছর পর বিচারের পর সাজা কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার জন্য প্রথম কারো মৃত্যুদণ্ড কারর্যকর হল।

গ্রেপ্তার হওয়ার ৩ বছর ৫ মাস পর শুক্রবার রাত্রির প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সর্বোচ্চ দণ্ড কার্যকর করা হয়।

ফাঁসি কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্র রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উল্লাসের খবর পাওয়া যায়।

মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যাকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় দায়ের করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ১৩ জুলাই জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সব বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও চেম্বার বিচারপতির একটি আদেশে গত মঙ্গলবার ফাঁসির মঞ্চ থেকেই ফিরে আসেন একাত্তরের এই ঘাতক।

তবে বৃহস্পতিবার দিনে পুনর্বিবেচনার দুটি আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর রাতেই ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয় একাত্তরের কসাই কাদেরকে।

২০১১ সালের ১ নভেম্বর কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর ২৮ ডিসেম্বর অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

পরে গত ৫ ফেব্রুয়ারি তাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এই দণ্ড দেয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিলো না। সর্বোচ্চ দণ্ডের দাবিতে প্রতিবাদে জেগে উঠে ছাত্র-জনতা।

উভয়পক্ষকে আপিলে সমান সুযোগ দিয়ে সংশোধন করা হয় আইন, যে আইনে করা আপিলে গত ১৭ সেপ্টেম্বর কাদেরের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়।

মঙ্গলবার ফাঁসি কার্যকরের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ মুহুর্তে চেম্বার বিচারকের আদেশে তা আটকে যায়। বৃহস্পতিবার পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ হওয়ার পর রায় কার্যকরে বাধা কাটে।

কাদের মোল্লার আগে ওই ট্রাইব্যুনালে বর্তমান ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের সাবেক সাবেক রুকন বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ আসে।

পলাতক থাকায় তার ওই রায় বাস্তবায়ন হয়নি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর চিকন আলী নামে এক দালালের ফাঁসি হয়েছিলো, তবে জেনারেল জিয়ার আমলে তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে যান।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ঘাতক দালালদের বিচারে আইন প্রণয়ন আদালত গঠন করা হলেও সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই উদ্যোগ থেমে যায়।

এরপর ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমির ঘোষণা করলে দেশে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়, যা পরে রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে পরিণত হয়।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। তিনি ছিলেন এর আহ্বায়ক।

এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ‘গণআদালত’ এর মাধ্যমে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের ‘নরঘাতক’ গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার শুরু করে।

এই গোলাম আযমই ৯০ বছরের দণ্ড নিয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী নেই’ মন্তব্য করে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ সমালোচনার ঝড় তোলেন।

এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারদের উদ্যোগে গঠিত হয় সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে তাদের আন্দোলনে শরিক হয় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি আওয়ামী লীগের ইশতেহারে স্থান পায়।

যুদ্ধাপরাধের বিচারে আওয়ামী লীগের এই অঙ্গীকারে তরুণ প্রজন্ম ব্যাপক সাড়া দেয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট।

সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বহুল প্রতীক্ষিত বিচার শুরু হয়।

ওইদিন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয় তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশন টিম ও তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়। পরে আরো একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

এই দুই ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত মোট ৯টি রায়ে ৭জন মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। একজনকে ৯০বছর কারাদণ্ড, একজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। দণ্ডিতদের মধ্যে তিনজন পলাতক রয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here