বীরের মৃত্যু নেইঃ বনানী সামরিক কবরস্থানে অন্তিম শয়ানে লে. কর্নেল আজাদ।হত্যাকারীদের রক্ষা নেই :মনিরুল

53

জনতার নিউজ

বীরের মৃত্যু নেই

এক বীরের চলে যাওয়া। জঙ্গি বিরোধী অভিযানে এরকম লড়াকু বীর খুব কমই জন্মেছেন এই দেশে। যেমনটি জন্মেছিলেন কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ। বিডিআর বিদ্রোহে তার চলে যাওয়াটিও ছিল এমন বেদনাদায়ক। কর্নেল গুলজারের এমনই এক উত্তরসূরী ছিলেন লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ।  ২৫ মার্চ সিলেটের শিববাড়ীতে জঙ্গিদের বোমা বিস্ফোরণে আহত হওয়ার পর রাষ্ট্র তাকে বাঁচানোর   জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। কিন্তু এসব চেষ্টা ব্যর্থ করে বৃহস্পতিবার রাত ১২ টা ৫ মিনিটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের আইসিইউতে তার হূদস্পন্দন থেমে যায়। স্ত্রী হলো স্বামী হারা। তিন সন্তান তাদের বাবাকে হারাল। আর দেশ হারাল জঙ্গি  বিরোধী অভিযানে দক্ষ, চৌকস ও লড়াকু  সৈনিককে। ১২৫ ঘণ্টা পাঞ্জা লড়ে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিলেন।

গতকাল ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদ ও র্যাব সদর দফতরে জানাজা শেষে বিকাল ৫ টায় বনানীর সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান শহীদ লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদকে। এ সময় তাকে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। তার জানাজায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সেনাবাহিনীর  প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, নৌবাহিনীর প্রধান এডমিরাল মুহাম্মদ নিজামউদ্দিন, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার, স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক, সেনাপ্রধানের অ্যাডজুটেন্ট মেজর জেনারেল এস.এম মতিউর রহমান, সাবেক সিজিএস লে. জেনারেল (অব.) মইনুল ইসলাম, র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান ও র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান, র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান প্রমুখ। এ সময় স্বজন ও সহকর্মীরা অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠেন। এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

গতকাল বাদ জুম্মা ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তার মরদেহ কুর্মিটোলায় র্যাব সদর দফতরে নেওয়া হয়। যে কর্মস্থলে তার পদচারণায় মুখর থাকত সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। প্রিয় সহকর্মীর লাশ কাঁধে করে এ্যাম্বুলেন্স থেকে নামান র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বেলা ৩টার কিছু সময় পরে সেখানে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে তার মরদেহে সামরিক কায়দায় শ্রদ্ধা ও সশস্ত্র সালাম জানান র্যাব সদস্যরা। পরে সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, র্যাব মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনার। এ সময় বেজে ওঠে বিউগলের করুণ সুর। র্যাব সদর দপ্তরে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে লে. কর্নেল আজাদের লাশ বনানীর সামরিক কবরস্থানে নেওয়া হয়। সেখানে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে সালাম ও শ্রদ্ধা জানানো হয়। সামরিক কবরস্থানে দাফন করার আগে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়। দাফন শেষে তিনবার তোপধ্বনি করা হয়।

এর আগে সকালে লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে নেওয়া হয় ময়নাতদন্তের জন্য। ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক ঢাকা মেডিক্যালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, মস্তিষ্কে বোমার সিপ্লন্টার আঘাতে লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ মারা যান। তিনি বলেন, বাম চোখে স্প্লিন্টার ঢুকে মস্তিষ্কে আঘাত করে। এতেই তার মৃত্যু হয়। ওই স্প্লিন্টার আমরা বের করেছি। তার বাম চোখ সম্পূর্ণ ড্যামেজ হয়ে যায়।

র্যাব সদর দফতরে জানাজা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘র্যাবের গোয়েন্দা প্রধানের মৃত্যুকে আমরা দুর্ঘটনাই মনে করছি। কারণ জঙ্গিরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আড়ালে-আবডালে বোমা রেখে গিয়েছিল। দেশের জন্য আমাদের একজন দেশপ্রেমিক অফিসার প্রাণ দিয়েছেন। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করছে। কোনো কোনো সময় আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আত্মাহুতি পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। কখনো কখনো তারা আহত হচ্ছেন। যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের পরিবারের প্রতি সরকারের দৃষ্টি রয়েছে। তাদের জন্য যা যা করার সরকারের পক্ষ থেকে সব করা হবে।’

পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেন, আতিয়া মহলের বাইরে যে  বোমা হামলা হয়েছিল সেটা মৌলভীবাজারের জঙ্গিরাই করেছিল।’ র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, ‘আমরা একরকম যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। জঙ্গিদের ধ্বংস না করা পর্যন্ত আমরা থামবো না।’

হত্যাকারীদের রক্ষা নেই : লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদের খুনিদের সমূলে বিনাশ করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। শুক্রবার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে তিনি এ কথা বলেন।  মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সকলকে কাঁদিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে চিরবিদায় নিলেন প্রিয় সহযোদ্ধা লে. কর্নেল আজাদ! সহযোদ্ধার মৃত্যু বেদনা দেয় একথা যেমন সত্য, তেমনি সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে মানবকুলে সৃষ্ট দানব ধ্বংসে আমাদের আরো বেশি সংকল্পবদ্ধ করে! আজাদ, আপনাকে ফিরে পাবো না জানি, কিন্তু কথা দিচ্ছি আপনার হত্যাকারীদের রক্ষা নেই। সমূলে তাদের বিনাশ অনিবার্য করে তুলবোই! আপনার স্মৃতি বুকে ধারন করেই অসুর দমনে এগিয়ে যাচ্ছি, যাবো!!!’

লে. কর্নেল আজাদের জীবন বৃত্তান্ত: ১৯৭৫ সালের ৩০ অক্টোবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ। ১৯৯৬ সালের ৭ জুন ৩৪তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্সে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন তিনি। ৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আইও, অ্যাডজুটেন্ট এবং কোয়ার্টারমাস্টারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ ছাড়া তিনি সেনাসদর, প্রশাসনিক শাখা, শান্তিরক্ষা মিশন ও ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একজন কমান্ডো ছিলেন। ২০১১ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত র্যাব-১২ এর কোম্পানী কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত র্যাব সদর দপ্তরে গোয়েন্দা শাখার টিএফআই সেলের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছরে ৮ ডিসেম্বর থেকে অদ্যাবধি র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন সাহসী এই কর্মকর্তা। তার স্ত্রীর নাম সুরাইয়া সুলতানা শর্মী। জারিফ (১১), জেবা তাসমিয়া জারা (৮) ও জাবির (২) নামের তিন সন্তানের জনক তিনি। সোমবার বাদ আছর বনানী স্টাফ রোডের রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের পাশে আশালতা স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

শিবগঞ্জে শোকসভা

শিবগঞ্জ (সংবাদদাতা) জানান, লে: কর্নেল আবুল কালাম আজাদ রাসেলের মৃত্যুতে শিবগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে জুম্মার মসজিদে নামাজ শেষে দোয়া শোকসভা ও  গায়েবে জানাজার আয়োজন করা হয়।

শুক্রবার শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ও বিনোদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন মসজিদে জুম্মার নামাজের পর বিশেষ মোনাজাত করা হয়। বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের মহিলা আসনের সদস্য শাহিদা আখতারের উদ্যোগে  উপজেলার মনাকষা  ইউনিয়নের সাহাপাড়া দাখিল মাদ্রাসা মিলনায়তনে মাদ্রাসা সুপার মাওলানা আব্দুর রহমানের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য মোসাঃ শাহিদা আকতার রেখা, এসডিবি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাইনুর রহমান লাল্টু, বিনোপপুর কলেজের প্রভাষক সফিকুল ইসলাম, তারাপুর স্কুল এ্যান্ড কলেজের শিক্ষক তাইফুর রহমান, শিক্ষক এনাামূল হক প্রমূখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here