বিচার হবে ক্ষমাপ্রাপ্ত দালালদেরও

23

দালাল আইনে অভিযুক্ত এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাধারণ ক্ষমার আওতায় ক্ষমাপ্রাপ্ত দালালদেরও বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩-এর আওতায় এনে তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা জীবিত রয়েছেন তাঁদের মধ্য থেকে আসামি বাছাই করার কাজ চলছে। এরই মধ্যে ওই সময় গ্রেপ্তার হওয়া, দnewণ্ডিত ও মুক্তিপ্রাপ্ত দালালদের তালিকা সংগ্রহ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যে মামলার তদন্ত চলছে সেই মামলায়ই এ দালালদেরও আসামি করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘১৯৭২ সালের দালাল আইনে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধেই হত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ স্পষ্ট। এমনকি সাধারণ ক্ষমার আওতায় যাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল তাদেরও কারো কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে তাদের ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে হিসেবেই ওই অভিযুক্তদের ব্যাপারে তদন্ত সংস্থা কাজ করছে।’
দালাল আইনে আটক, সাজাপ্রাপ্ত ও সাধারণ ক্ষমার আওতায় ক্ষমাপ্রাপ্ত দালালদের বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজও। তিনি  বলেন, ‘১৯৭২ সালের দালাল আইনে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে যাঁরা জীবিত আছেন তাঁদেরই বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যাঁদের সাধারণ ক্ষমা করেছিলেন তাঁদেরও বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে ড. তুরিন আফরোজ বলেন, ‘ক্ষমাপ্রাপ্ত ও মুক্তিপ্রাপ্ত বেশির ভাগ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধেই গণহত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তাই ভিয়েনা কনভেনশনের ৫৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে ওই ক্ষমার আদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে। এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার যে টিম তদন্ত কাজ করছে, তারা এরই মধ্যে অভিযুক্তদের তালিকা সংগ্রহ শুরু করেছে।’ তুরিন আফরোজ বলেন, ‘জামায়াত ও জামায়াতের আদর্শ-ভাবধারা নিষিদ্ধ করার আদেশ পাওয়ার লক্ষ্যে যে তদন্তপ্রক্রিয়া চলছে তার মধ্যেই তাঁদের ব্যাপারটি যোগ হবে। কারণ জামায়াতের একই আদর্শে প্রভাবিত হয়েই তাঁরা ওই সময় অপরাধ সংঘটিত করেছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘একই সঙ্গে দল ও ব্যক্তিদের বিচার চলবে এ মামলায়। ১৯৭২ সালের আইনে যে বিচার হয়েছিল ওইটা ভিন্ন, এখন তাঁদের বিচার করা হবে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধের ট্রাইব্যুনাল আইনে। এ আইনের কার্যক্রম শুরুই হয়েছে ২০১০ সাল থেকে।’ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক এ এস এম সামছুল আরেফিনের ‘‘মুক্তিযুদ্ধ ’৭১” এবং আজাদুর রহমান চন্দনের ‘যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা ১৯৭১’ গ্রন্থসহ বিভিন্ন দলিলপত্র থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা ও স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের হত্যাসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কার্যকলাপ সংঘটনের বিভিন্ন অভিযোগে স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৩ সালের ৩১ নভেম্বর পর্যন্ত আটক করা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৪৭১ জন রাজাকার, আলবদর ও দালালকে। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর প্রায় ২৬ হাজার জন মুক্তি পান। অবশিষ্ট প্রায় ১১ হাজার অপরাধী বিচারের আওতায় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দুই হাজার ৮৪৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। ১৯ জনের হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। সাজা হয়েছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ জনসহ মোট ৭৫২ জনের। প্রথম মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল কুষ্টিয়ার কুখ্যাত রাজাকার চিকন আলীকে। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্যদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার মিরপুরের কুখ্যাত আক্তার গুণ্ডা; ড. কে এ এম আজাদ হত্যা মামলার আসামি আলবদর আয়ুব আলী, মকবুল হোসেন ও জুবায়ের; বগুড়ার রাজাকার মাজিদুর রহমান ওরফে চান্দু মিয়া প্রমুখ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম মুক্তিযুদ্ধকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. মালিক, তাঁর নেতৃত্বাধীন দালাল মন্ত্রিসভার সদস্য মুজিবুর রহমান, এ কে এম ইউসুফ, মোশারেফ হোসেন শাহজাহান, এস এম সোলায়মান, জসীম উদ্দিন, নওয়াজেশ আহমেদ, মো. ইসহাক, ওবায়দুল্লাহ মজুমদার প্রমুখ। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও এ ধরনের অপরাধীদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছিল। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, রেষারেষির জের ধরে সারা দেশে অনেক সাধারণ মানুষের নামও দালাল আইনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষকে হয়রানি থেকে মুক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটসহ সুনির্দিষ্ট ১৮ ধরনের অপরাধের অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে বাকিদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও যে ১১ হাজার অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারের মুখোমুখি ছিলেন তাঁদের ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এক সামরিক ফরমানের মাধ্যমে ছেড়ে দেন। সে সময় দালাল আইনটিও বাতিল করেন জিয়াউর রহমান।
বিচার হতে বাধা নেই : আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭২ সালের দলাল আইনে দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় বিচার করতে কোনো আইনি বাধা নেই। এ বিষয়ে প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক  বলেন, ‘১৯৭২ সালের দালাল আইনে যাদের বিচারের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাদের যদি বিচার না করেই মুক্তি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তাদের বিচার হওয়া উচিত। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় তাদের বিচার করার সুযোগ রয়েছে।’
এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ  বলেন, ‘১৯৭২ সালের আইনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং ১৯৭৩ সালের আইনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভিন্ন। ১৯৭২ সালের আইনটি ছিল দালালদের বিচারের জন্য। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের লক্ষ্য ছিল একাত্তর সালে যুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, জোর করে ধর্মান্তরিত করা, দেশান্তর করার অপরাধের বিচার করা। তাই ১৯৭২ সালের আইনে যারা দণ্ডিত, জামিনপ্রাপ্ত বা বন্দি ছিল, ১৯৭৩ সালের আইনের আওতায় তাদের বিচার করতে কোনো বাধা নেই। কারণ তারাও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে তাদের পুনর্বাসিত করেছেন। তাই তাদের বিচার হওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘এই বিচার করার মাধ্যমে আমরা বিচার না করার সংস্কৃতি থেকে বের হতে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এরই মধ্যে তাদের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে এটি একটি বড় এবং ভালো উদ্যোগ।’ তিনি আরো বলেন, ‘১৯৭৫ সালেই তাদের বিচার করার জন্য ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় কার্যক্রমও শুরু করা হয়েছিল। তখন বিশিষ্ট আইনজীবী এস আর পালকে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগও দিয়েছিল সরকার। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে সেই বিচারের পথ রুদ্ধ করে উল্টো দালাল আইন বাতিলসহ ১১ হাজার দালালকে মুক্তি দেন জিয়াউর রহমান।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here