বিএনপির তৃণমূলে অস্থিরতা,উপজেলা নির্বাচনে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে কেন্দ্র,এক সপ্তাহে ৪২ নেতা বহিষ্কার।

21

52d52034955d3-BNP-Logoউপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। দলীয় নির্দেশনা না মানায় শুরু হয়েছে বহিষ্কারের ধুম। এক সপ্তাহে দল থেকে ৪২ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন সাবেক সংসদ সদস্য এবং দুইজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও রয়েছেন। শোকজ করা হয়েছে অনেককেই।

বহিষ্কার হচ্ছেন তারাই, যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন। বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্ত দেয়া হচ্ছে দলের কেন্দ্রীয় দফতর থেকে। কেন্দ্রের এমন সিদ্ধান্তের ফলে বহু স্থানে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এসব স্থানে দলের মনোনীত প্রার্থীকে মানতে চাইছেন না তৃণমূল কর্মীরা। বিক্ষোভ হচ্ছে স্থানে স্থানে। তৃণমূল নেতাদের মতামতের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে সিলেটে। দলের হাই কমান্ড পরে বাধ্য হয়ে শমসেরকে সরিয়ে সিলেট বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছেন দলের একজন যুগ্ম মহাসচিবকে। বিক্ষোভ হয়েছে বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত বগুড়াতেও।

উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে একক প্রার্থী মনোনীত করার জন্য দলের হাই কমান্ডের নির্দেশে যুগ্ম মহাসচিবদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করা হয়। কমিটি মূলত ঢাকায় বসে তদারকি করছেন। তৃণমূলের অবস্থা যেটুকু তারা জানছেন, তা জেলা নেতাদের কাছ থেকেই। ফলে গ্রুপে বিভক্ত জেলা নেতাদের কোন্দল ও সংশ্লিষ্ট আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক এমপিদের খবরদারির কারণে বেশির ভাগ উপজেলায় একক প্রার্থী বাছাই করতে ব্যর্থ হচ্ছে দলের সাংগঠনিক টিম। মূলত এইসব নেতারাই কেন্দ্রে তাদের প্রভাব এবং ক্ষমতা প্রয়োগ করে বহিষ্কার করাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন তৃণমূল নেতারা।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অস্থিরতা সামাল দিতে কোথাও কোথাও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজেই বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলছেন। বগুড়া জেলার ১২টি উপজেলায় একক প্রার্থী বহাল রাখতে তিনজন বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে বেগম জিয়া টেলিফোনে কথা বলেছেন। তারপরও অস্থিরতা কমেনি। ফলে কেন্দ্র থেকে ধুনট উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এ কে এম তৌহিদুল আলম মামুন এবং শেরপুর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

জানা গেছে, বিএনপি’র তৃণমূলে অস্থিরতার আরেক কারণ দলের জোটের শরিক জামায়াতকে নিয়ে। অধিকাংশ উপজেলায় জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে। তৃণমূল নেতা-কর্মীরা জামায়াতকে ছাড় দিতে রাজি নয়। কারণ প্রতিটি এলাকায় বিএনপি’র শক্ত প্রার্থী রয়েছে। সেখানে ভাগ বসাতে চায় জামায়াতও। কিন্তু কেন্দ্র থেকে জামায়াতের প্রতি নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ছে বিএনপি নেতা-কর্মীরা। কোন কোন স্থানে জামায়াত কৌশলে বিএনপি’র কিছু নেতাকে কাছে রাখার চেষ্টা করছে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার অভিযোগে পাঁচ ইউনিয়নের সভাপতি-সম্পাদকসহ বিএনপি’র ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে শনিবার। শেরপুর উপজেলা বিএনপি সভাপতি শহিদুল ইসলাম ফোনে জানান, শেরপুর উপজেলার কুসুম্বী, খামারকান্দি, গারিদাহ, সুঘাট এবং বিশালপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সম্পাদকগণ প্রকাশ্যে জামায়াত সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর হয়ে কাজ করছেন এই অভিযোগে জেলা বিএনপি’র নির্দেশে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি জানান, জামায়াতের কারণে দলে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। আবার উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহিষ্কৃত কোন কোন নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের মাধ্যমে নির্বাচনে দলীয় সমর্থন দেয়া হচ্ছে। এতে করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অস্থিরতা এড়ানো যাচ্ছে না।

দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রভাবশালী নেতাদের কথা মত একটি প্রেস রিলিজ দিয়ে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কারের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। কোন কোন জায়গায় প্রকৃত জনপ্রিয় প্রার্থীরা অবিচারের শিকার হচ্ছেন। দল থেকে বহিষ্কৃত কোন কোন প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করলেও তা কেন্দ্রের দায়িত্বশীল কোন নেতা স্বীকার করেননি। গতকাল রবিবার বিএনপি’র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস রিলিজেই উপজেলা নির্বাচনে পাঁচ চেয়ারম্যান প্রার্থীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে ‘দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দলের স্বার্থ বিরোধী তত্পরতায় লিপ্ত থাকার’ কারণে। এরা হলেন:বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলা বিএনপি সভাপতি তহিদুল আলম মামুন, জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মানিক সওদাগর, কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলা বিএনপি’র সদস্য আবু সাঈদ, মাদারীপুর জেলার শিবচর থানা বিএনপি’র সদস্য নাজমুল হুদা চৌধুরী মিঠু এবং শাহাদাত্ হোসেন খান। ১৯ ফেব্রুয়ারির প্রথম ধাপের নির্বাচনের আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে বহিষ্কার শুরু হয়েছে। প্রথম দিন ঝিনাইদহ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুন্সী কামাল আজাদ পান্নুকে বহিষ্কার করা হয়। একইদিন খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলা বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি এম কে আজাদ এবং উপজেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি এসএম রবিউল ফারুককে বহিষ্কার করা হয়। ফারুক নিজে নির্বাচন করলেও স্ত্রীর কারণে বহিষ্কার হন আজাদ। আজাদের স্ত্রী নির্বাচন করছেন। ৮ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলা বিএনপি’র ৫ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন— উপজেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি মোখলেছুর রহমান, প্রচার সম্পাদক আবদুল মমিন, সদস্য আবদুল কাদের মাস্টার, মফিজুল ইসলাম ও পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক। ১০ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতা রফিকুর রহমানকে এবং নেত্রকোনোর দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপি নেতা ইমাম হাসান আবু চানকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় দফতর। ১১ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি ও রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন ভুঁইয়া বহিষ্কার হন। বালিয়াকান্দি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ায় রাজবাড়ী জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি গোলাম শওকত সিরাজ, মুন্সীগঞ্জ শহর বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাউদ্দিন খান স্বপন বহিষ্কৃত হন। ১২ ফেব্রুয়ারি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, নাটোরে জেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলাম, গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি আয়নাল হক তালুকদার ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আলী আযম, পাবনার চাটমোহর উপজেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রহিম কালু, ভাংগুরা উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক নুর মোজাহিদ স্বপন ও সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপি’র নির্বাহী সদস্য সালাউদ্দিন খান, ভোলার লালমোহন উপজেলা বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও চরভূতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান টিটব, বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানা বিএনপি’র অর্থ বিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ মশিউর রহমান মাসুদ ও থানা বিএনপি’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান নান্নু, মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলা বিএনপি’র সদস্য আবিদুর রহমান খান রোমান এবং শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট থানা বিএনপি’র সদস্য আনোয়ার হোসেনকে। ১৩ ফেব্রুয়ারি বরিশালের গৌরনদী উপজেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি লোকমান হোসেন খান, সাবেক সভাপতি নুর আলম হাওলাদার ও পৌর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহির সাজ্জাত হান্নান বহিষ্কৃত হন। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ও কক্সবাজারের মহেশখালী বিএনপি নেতা হাবিব উল্লাহকে বহিষ্কার করেছে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর। সেই সঙ্গে বাখেরগঞ্জ বিএনপি’র বহিষ্কৃত দুই নেতাকে ইন্ধন দেয়ার অভিযোগে বাকেরগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সাবেক এমপি আবুল হোসেন খানকে কেন দলের সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর। রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের সহ-সম্পাদক ইব্রাহিম হাবিব মিলুকে বহিষ্কার করা হয়। জানা গেছে, নির্বাচনে একক প্রার্থী মনোনয়ন এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দলের হাই-কমান্ড যুগ্ম-মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজান, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ও সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃেত্ব কমিটি গঠন করে। বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, তৃণমূল থেকে প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে জনপ্রিয়তা দেখে। যেখানে একাধিক প্রার্থী রয়েছে সেখানে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। যারা দলের নির্দেশ মানছে না তাদের বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি যারা বিজয়ী হতে পারবেন- এমন প্রার্থীদের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here