বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলি বিজিবির নিহত নায়েক সুবেদারের লাশ ফেরত দেয়া হয়নি

12

miyanবান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গতকাল শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে শুরু হয়ে বিকাল সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে এই গুলি বিনিময় চলে। বিজিবির দাবি মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে নিহত নায়েক সুবেদার মো. মিজানুর রহমানের লাশ ফেরত না দিয়ে বিনা উস্কানিতে বিজিপি সদস্যরা গুলি চালিয়েছে। গুলি থামলেও দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ির উত্তেজনাপূর্ণ এলাকার স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে, গুলি বিনিময়ের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তত্পরতা জোরদার করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া সংবাদদাতা জানান, সদ্য স্থাপিত পাইনছড়ি বিওপি ক্যাম্প থেকে গত বুধবার একদল বিজিবি সদস্য নিয়মিত টহলে দৌছড়ি ও তেছড়ি খালের সংযোগস্থলে পৌঁছালে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিয়ানমারের ওপার থেকে বিজিপি তাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় বিজিবির দায়িত্বরত নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। ঘটনাস্থল থেকে বর্ডার গার্ড পুলিশ জাতিসংঘের কনভেনশন আইন অমান্য করে বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় অনুপ্রবেশ করে অস্ত্র ও গোলা বারুদসহ তাকে নিয়ে যায়।

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, মিজানুর রহমানের লাশ ফেরত চেয়ে গতকাল নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আমন্ত্রণে পতাকা বৈঠকের কথা ছিলো। কিন্তু মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অনীহায় পতাকা বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়নি। বিজিবি নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: কর্নেল শফিকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মিজানুর রহমানের লাশের জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের পাইনছড়ি ৫২ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন বিজিবির সদস্যরা। কিন্তু মিজানকে ফিরিয়ে না দিয়ে তাদের উপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ করে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। পরে বিজিবিও পাল্টা গুলি চালায়।

এ বিষয়ে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, গুলি বিনিময় এখন থেমেছে। ওপারে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) তত্পরতা থাকায় এ পারেও সতর্ক রয়েছে বিজিবি সদস্যরা। তিনি আরো বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে আমাদের একজন সদস্যের নিহতের কথা জানায় মিয়ানমারের বিজিপি। তবে তারা এখনো আমাদের লাশটি দেখায়নি। উল্টো তারা শুক্রবার দুপুরে উস্কানিমূলকভাবে বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি করেছে। বিজিবি এর পাল্টা জবাব দেয়। তারা সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন।

বিজিবি সূত্র জানায়, গতকাল দু’দেশের সীমান্তরক্ষীর মধ্যে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলে থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনা। এ ঘটনায় দৌছড়ি-লেম্বুছড়ি সহ বাংলাদেশ-মিয়ানমার ১৮৮ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। দৌছড়ি সীমান্তের ৫১-৫২ নাম্বার সীমান্ত পিলারের কাছে অবস্থান নিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি এবং মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজেপি। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সতর্কাবস্থায় রয়েছে বিজিবি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি সীমান্ত চৌকিগুলোতে বিজিবির সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। এদিকে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীর সঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীও জড়ো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা এ বিষয়ে কক্সবাজার ১৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম বলেন, মিয়ানমার আগে থেকে সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত দু’দেশের মধ্যে সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে একটি বৈঠক আগামী ৩ জুন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে, গোলাগুলির ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, গোলাগুলির ঘটনার পর মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিও মিন্ট থানকে তলব করে প্রতিবাদপত্র দিয়েছিলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সচিব (দ্বিপাক্ষিক) মোস্তফা কামাল মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠককালে বিজিবি নায়েক মো. মিজানুর রহমানকে ফেরত ও এ ধরনের ঘটনা যাতে আগামীতে না ঘটে সেজন্য পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেন। বিষয়টি দ্রুত সময়ে দেশটির যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত আশ্বস্ত করেন।

এর আগে ২০১২ সালের মার্চে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে সমুদ্র সীমানা বিরোধ মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পার্বত্য জেলা বান্দরবান ও কক্সবাজারসহ তিনটি সীমান্তে মিয়ানমার তাদের ভূখণ্ডের মধ্যে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলো। ঐ ঘটনায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here