বহিষ্কারের হিড়িক বিএনপিতে

16

pic-03_57910৫ দিনে ২৮ উপজেলায় বহিষ্কার প্রায় অর্ধশত নেতা ,সিলেটে প্রার্থীদের নিয়ে মির্জা ফখরুলের উদ্যোগ ব্যর্থ নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও জেলার শীর্ষ নেতারা ,তবুও নির্বাচনের মাঠ ছাড়ছেন না বিদ্রোহীরা

তৃতীয় ধাপে আগামী ১৫ মার্চ দেশের ৮১টি উপজেলা পরিষদে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে দলের সমর্থনপুষ্ট একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে বিএনপি থেকে বহিষ্কারের হিড়িক চলছে। প্রতিদিন বহিষ্কার হচ্ছেন কথিত ‘বিদ্রোহী’ নেতারা। গত পাঁচ দিনে ২৮ উপজেলায় প্রায় অর্ধশত নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে দলের এই কঠোর পদক্ষেপের পরও নির্বাচনের মাঠ থেকে সরছেন না বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

দফায় দফায় সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েও বাগে আনা যাচ্ছে না ‘বিদ্রোহ’। বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সমঝোতা বৈঠকও ব্যর্থ হচ্ছে। সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ দুই উপজেলায় বিদ্রোহ ঠেকাতে প্রার্থীদের নিয়ে গত সোমবার স্থানীয় বিএনপি নেতাদের গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ডাকেন মির্জা ফখরুল। কয়েক ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করার পরও তৃণমূল নেতাদের এক করাতে পারেননি তিনি। সমঝোতা চেষ্টা ব্যর্থ হলে পরদিনই বহিষ্কার করা হয় স্থানীয় তিন নেতাকে। তবে দলের এমন উদ্যোগ কিছু জায়গায় সফল হলেও ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী।

দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বিগত দুই ধাপের নির্বাচনে অধিকাংশ উপজেলায় দল ‘বিদ্রোহী’ আক্রান্ত হওয়ায় তারা প্রত্যাশিত ফল পাননি। সেই সাথে আছে প্রতিকূলতা ও কারচুপির অভিযোগ। ফলে আসন্ন নির্বাচনগুলোতে একক প্রার্থী করতে কঠোর ও সমঝোতামূলক উদ্যোগ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি।

গত রবিবার স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সেখানে মূল আলোচ্য ছিল উপজেলায় ফলাফল আরো কিভাবে ভালো করা যায়। এ জন্য দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং যুগ্ম মহাসচিবদের দায়িত্ব দেয়া হয়। তৃণমূল নেতাদের কেন্দ্রে ডেকে সমঝোতা বৈঠক ও নানামুখী চেষ্টা চালাতে নির্দেশনা দেন দলের হাইকমান্ড। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি-জামায়াতসহ মিত্রপক্ষের সঙ্গে আপসরফা করে একক প্রার্থী করার জন্য গুরুত্ব দেয়া হয়। এর আগে নির্বাচনে দলীয় সমর্থন চূড়ান্ত করতে পাঁচটি ধাপ তৈরি করা হয় বিএনপিতে। প্রথম ধাপে তৃণমূল নেতাকর্মী, দ্বিতীয় ধাপে জেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি, তৃতীয় ধাপে দলের কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম। চতুর্থ ধাপে সমন্বয় টিম এবং চূড়ান্ত ধাপে চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় কেন্দ্রিক সিনিয়র নেতাদের আরেকটি টিম। তবে তৃণমূল ছাড়া বাকি চারটি ধাপেই প্রার্থী নির্বাচনে ‘স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার’ অভাব রয়েছে বলে দলের একাধিক সূত্রের অভিযোগ।

দলের স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য অভিযোগ করে বললেন, স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হতে না দিতে ‘কৌশল’ নিয়েছেন বিভিন্ন এলাকার সাবেক বিএনপি সরকারের এমপি-মন্ত্রী ও জেলার শীর্ষ নেতারা। তৃণমূলের মতামতকে পাশ কাটিয়ে তাদের আজ্ঞাবহ ও অজনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়ন দিচ্ছেন। ফলে দলের তৃণমূল সমর্থন যাদের পক্ষে তাদের বেশিরভাগই কেন্দ্রীয় সমর্থন বঞ্চিত হচ্ছেন। আর এই জনপ্রিয়রা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কারের খড়গ নেমে আসছে তাদের ঘাড়ে। বহিষ্কারের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন ‘রাঘব’ নেতারা।

স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বললেন, ‘বহিষ্কারে ফল হচ্ছে একটাই—দলের অনুগত কর্মীরা বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে কাজ করছেন না। তবে আমরা চেষ্টা করছি সমঝোতা করে একক প্রার্থী দিতে। সমস্যা উত্তরণে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আশা করি সামনের নির্বাচনের ফলাফলে তার প্রতিফলন ঘটবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বহিষ্কারের ক্ষেত্রে শুধু জেলা নেতাদের সুপারিশ গ্রহণ না করে তৃণমূল নেতাদের মতামত যাচাই করা উচিত। কারণ জেলার প্রভাবশালী নেতারা চাইবেন তার ব্যক্তিগত প্রভাব ধরে রাখতে।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, জেলার প্রভাবশালী নেতাদের সুপারিশে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জেলা কমিটির নেতারা তৃণমূলের মতামতকে অনেক সময় আমলে নিচ্ছেন না। ফলে জনপ্রিয় প্রার্থীরা দলের মনোনয়ন বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া কোন কোন জেলায় দলের নেতাদের মধ্যে আধিপত্যের প্রতিযোগিতা আছে। সেখানেও সমস্যা হচ্ছে প্রার্থী নিয়ে।

বিএনপির দপ্তর সূত্র জানায়, তৃতীয় ধাপে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৫ দিনে যে অর্ধশত নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরাও আছেন।

এছাড়া অধিকাংশই উপজেলা ও পৌর বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন: সিলেট জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক আলী আহম্মেদ, সিলেট জেলাধীন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এ্যাডভোকেট এটি এম ফয়েজ, সদর উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি নুরুল হুদা, কুষ্টিয়া জেলা বিএনপি’র সদস্য আলতাফ হোসেন, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপি’র সদস্য রমিজ উদ্দিন লন্ডনী, মানিকগঞ্জ জেলাধীন ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি আবুল হাশেম বিশ্বাস দুদু মিয়া, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি শামসুর রশিদ মজনু, সাংগঠনিক সম্পাদক মঞ্জুরুল হক, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা বিএনপির সদস্য বাদল আমিন, মো. আরমান, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেন খোকন, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোশাহিদ আলম মুরাদ, নবীগঞ্জ পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম সোহেল, বান্দরবান জেলা বিএনপির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম, ফেনী জেলার দাগনভূঁঞা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল হাশেম বাহাদুর, রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মোল্লা মো. ওয়াহেদ, দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি কামরুজ্জামান লাবলু, দুর্গাপুরের সাবেক পৌর মেয়র সাইদুর রহমান মন্টু, রাজশাহী জেলা বিএনপির যুব বিষয়ক সম্পাদক সাজেদুর রহমান মার্কলি, গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপি নেতা হযরত আলী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ইমাম উদ্দিন মজুমদার শহীদ এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সলিমুল্লাহ টিপু, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য লিয়াকত আলী, মৌলভীবাজার জেলাধীন শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আতাউর রহমান (লাল হাজী), সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াকুব আলী, ময়মনসিংহ উত্তর জেলাধীন ফুলপুর উপজেলা মহিলা দলের নেত্রী আখিনুর রহমান (রিনা), ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মহিবুল হক টুটুল, ফুলপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক এ কে এম তোফাজ্জল হক, ফুলপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম তোজাম্মেল হক রুবেল, গৌরিপুর পৌর বিএনপির সভাপতি সার্জেন্ট হাজী মকবুল হোসেন, বান্দরবান জেলাধীন জেলা বিএনপির যুব বিষয়ক সম্পাদক ও বান্দরবান জেলা যুবদলের সভাপতি মশিউর রহমান মিটন, মুন্সীগঞ্জ জেলাধীন গজারিয়া উপজেলা যুবদলের সভাপতি আব্দুল মান্নান দেওয়ান, বরিশালের হিজলা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আঃ গফফার তালুকদার এবং দলের সদস্য দেওয়ান মনির।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here