বসুন্ধরাসহ কয়েকটি কম্পানির গ্যাস চুরি করে বাজারজাত দুই শতাধিক সিলিন্ডার জব্দ, গ্রেপ্তার ২

56

gasচট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার সিডিএ আবাসিক এলাকা-সংলগ্ন একটি প্লটে চারদিকে সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে একটি সেমিপাকা ঘর। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে এটি বাসাবাড়ি। কিন্তু কোনো পরিবার এখানে বসবাস করে না। এটি আসলে গ্যাস চুরির গুদামঘর। টিনশেড ঘরটির ভেতর রাখা কয়েক শ গ্যাস সিলিন্ডার। এখানে লোকচক্ষুর আড়ালে বসুন্ধরাসহ কয়েকটি কম্পানির গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার থেকে গ্যাস অন্য সিলিন্ডারে ভরে জোচ্চুরি করা চলছিল। হাইপ্রেশার রেগুলেটর ও ব্যাকওয়ার্ম পাম্পের মাধ্যমে প্রতিটি সিলিন্ডার থেকে তিন-চার কেজি গ্যাস খালি সিলিন্ডারে স্থানান্তর করা চলছিল। এভাবে গ্যাস কমিয়ে মূল সিলিন্ডারগুলো এবং চুরি করা গ্যাসে ভরা নতুন সিলিন্ডারগুলো বাজারজাত করা হচ্ছিল। ঠকানো হচ্ছিল ভোক্তাদের, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল কম্পানিগুলো।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল বুধবার দুুপুরে চট্টগ্রাম মহানগরের কর্ণফুলী থানার পুলিশ আস্তানাটিতে অভিযান চালিয়ে দুই শতাধিক সিলিন্ডার জব্দ ও দুজনকে আটক করেছে। জব্দ করা সিলিন্ডারগুলোর মধ্যে বসুন্ধরা কম্পানির শতাধিক ৩৩ কেজি ও ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডারও রয়েছে। পেট্রিগ্যাস, টোটাল গ্যাস ও সরকারি এলপি গ্যাসেরও শতাধিক সিলিন্ডার পাওয়া যায়।
আটক দুই ব্যক্তি হলেন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ও গাড়িচালক আনোয়ারা উপজেলার মাহতা কাজীবাড়ি এলাকার মো. মিজান।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরের কর্মকাণ্ড লোকের দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখতেই সম্ভবত ঘরটিতে কোনো জানালা রাখা হয়নি। শুধু একটি দরজা আছে। মেইন গেটও তালাবদ্ধ। অভিযানের সময় বাড়ির উঠোনে ছিল একটি মিনি ট্রাক। ঘরটিতে প্রায় হাজারখানেক সিলিন্ডার রাখার জায়গা আছে। এ ঘরে গ্যাস চুরির মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করা হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে।
অভিযান পরিচালনাকারী কর্ণফুলী থানার উপপরিদর্শক মোশাররফ হোসাইন ও তৌফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, বসুন্ধরাসহ বিভিন্ন কম্পানির গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে চুরি করে গ্যাস নিয়ে খালি সিলিন্ডারে ভর্তি করে বাজারজাত করার সময় দুজনকে আটক করা হয়েছে। দুই শতাধিক সিলিন্ডারও জব্দ করা হয়েছে। তাঁরা আরো জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা থানার ওসি মো. মহিউদ্দিন আহম্মদকে জানিয়েছেন, মেসার্স তাহের শাহ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি দোকানের মালিক মো. আবু ছাদেক শিবলু এ ব্যবসা করেন। মালিকপক্ষে দুজন আছেন। তাঁরা গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে গ্যাস চুরি করে ওজনে কমিয়ে বাজারজাত করেন।
আটককৃতরা জানিয়েছেন, গ্যাস চুরির পর পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলার দোকানে মিনি ট্রাকের মাধ্যমে সেগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওই সব দোকান থেকে খুচরা পর্যায়ের ক্রেতারা গ্যাস কিনে নিয়ে যায়।
গুদাম থেকে উদ্ধার করা একটি ভিজিটিং কার্ডের তথ্য অনুযায়ী শিবলুর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানা চট্টগ্রাম মহানগরের বাকলিয়া থানার রাহাত্তারপুল এলাকার পাম্পের পাশে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে বসুন্ধরা, বিপিসি, টোটাল ও এলপি গ্যাস পাইকারি ও খুচরা বাজারজাত করা হয় বলে কার্ডে উল্লেখ আছে। গতকাল দুপুরে কর্ণফুলী থানার ওসি মহিউদ্দিন আহম্মদ নিজেই প্রতিষ্ঠানটির মালিক শিবলুকে ফোন করেন। কিন্তু তাঁর দুটি মোবাইল নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বসুন্ধরা গ্যাস কম্পানির এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার মো. জসিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংঘবদ্ধ চোরের দল বসুন্ধরা গ্যাস কম্পানির সিলিন্ডার থেকে হাইপ্রেশার রেগুলেটর ও ব্যাকওয়ার্ম পাম্পের মাধ্যমে গ্যাস চুরি করে। পরে চুরি করা গ্যাসে ভর্তি সিলিন্ডারগুলোর ক্যাপে বসুন্ধরা গ্যাসের নামসংবলিত স্টিকারও লাগায়। এতে ভোক্তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতারিত হচ্ছিলেন এবং কম্পানির সুনামও চরমভাবে নষ্ট হচ্ছিল।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে পদ্ধতিতে গ্যাস চুরি করা হচ্ছিল, তাতে যদি কখনো দুর্ঘটনা ঘটত, তাহলে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।’
পেট্রিগ্যাসের হেড অব সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং কর্মকর্তা আবু সৈয়দ রাজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সিলিন্ডার থেকে গ্যাস চুরির খবর পাচ্ছিলাম আমরা। চট্টগ্রাম মহানগরসহ কয়েকটি স্থান থেকে একাধিকবার চোরাই গ্যাস জব্দ করা হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘ভোক্তাদের ঠকিয়ে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী গ্যাস চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আমরা তাদের গ্রপ্তোর করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
সিলিন্ডার থেকে গ্যাস চুরির মাধ্যমে গ্রাহকদের ঠকানো এবং কম্পানির সুনাম বিনষ্ট করার সঙ্গে আরো কয়েকজন জড়িত বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ এলপি গ্যাস পরিবেশক সমিতি চট্টগ্রাম জেলা শাখার সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ও যুগ্ম সম্পাদক আবদুস সবুর চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, ‘গ্যাস চুরি করে ভোক্তাদের ঠকানোর সঙ্গে পটিয়া উপজেলার শান্তিরহাটের পারভেজ, চন্দনাইশ থানার পাশের সেলিম, লোহাগাড়া ও চকরিয়া উপজেলার তৌহিদুল আলম জড়িত বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ তাঁরা বলেন, ‘এ ধরনের অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’
কর্ণফুলী থানার ওসি মহিউদ্দিন আহম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্যাস চুরির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কম্পানির পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here