বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি, দুর্ভোগ জামালপুরে যুবকের মৃত্যু, ভাঙনে বিলীন কয়েকশ’ বাড়ি

33

জনতার নিউজ

বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি, দুর্ভোগ

সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানায়, গতকাল সোমবারও দেশের ১২টি নদীর ১৯টি স্থানে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এগুলো হলো- ধরলা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা, গুর, আত্রাই, ধলেশ্বরী, লক্ষ্যা, কালিগঙ্গা, কংস এবং তিতাস। এ নদীগুলো সংলগ্ন কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নাটোর, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ি, শরিয়তপুর, নেত্রকোনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আজ মঙ্গলবার ও আগামীকাল বুধবার পদ্মা নদীর পানি আরো বাড়তে পারে। তাই এ নদী সংলগ্ন রাজবাড়ি, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও শরিয়তপুরসহ কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া ও কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়েছে।

বন্যার পানিতে জামালপুরে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বহু বাড়িঘর ভাঙনের শিকার হয়েছে। এসব এলাকার মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। এদিকে, দেশের উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও ত্রাণ সহায়তায় তিন দিনের সফর শুরু করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। সোমবার টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলায় যমুনা নদীর তীরে বানভাসি মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন তিনি।  তিনি বলেন, সরকারের কাজ হলো বন্যায় যাতে কোন মানুষ কষ্ট না পায়    তার তদারকি করা। সরকারের হাতে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী রয়েছে। এর আগে তিনি মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়ের জাফরগঞ্জে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন।

বিভিন্ন জেলা থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা বন্যার সর্বশেষ পরিস্থিতি ও দুর্ভোগের খবর জানিয়েছেন।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অপরিবর্তিত থাকায় জামালপুর সদর উপজেলার বেশ কিছু এলাকা পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এদিকে জামালপুর পৌরসভার মিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা  মগর আলীর ছেলে হেলাল উদ্দিন (৩০) ব্রহ্মপুত্র নদে নিখোঁজ হন। গতকাল সোমবার হেলালের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। জেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬২টি ইউনিয়ন ও ৭টি পৌরসভা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে প্রায় ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৬ শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২ শতাধিক মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ১৮ হাজার হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা মারুফা মির্জা জানান, বন্যাকবলিত এলাকার কোথাও কোথাও ঘরের মধ্যে কয়েক ফুট পানি জমেছে। উঠানে দাঁড়ানোর মত অবস্থা নেই। নেই খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও কাজের সন্ধান। চৌহালী উপজেলার এনায়েতপুর থানার বেতিল, আশাননগর, মাচগ্রাম বিনদহ, ধুলিয়াবাড়ি ও তেবাড়িয়ার চরাঞ্চল জুড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে মানুষ। অনেকের রান্না ও নামাজ আদায় হচ্ছে নৌকার উপর। বেতিল চরের দিন মজুর জেলে সিরাজ ফকিরের স্ত্রী আনোয়ারা খাতুন (৫০) তার ২ ছেলে, ১ মেয়ে ও নাতি-নাতনী নিয়ে গত ১০/১২ দিন ধরে বন্যার পানিতে ভাসছেন।  ৪ ফুট পানি জমেছে তাদের থাকার ঘরে। কেউ সাহায্য করেনি জানিয়ে তিনি জনপ্রতিনিধিদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সরজমিনে বেতিল চরে গিয়ে দেখা যায়, আশরাফ আলীর মেয়ে রাশিদা খাতুন (১৪) রান্না করছে নৌকায়। পাশের ঠান্ড মুন্সী (৬৫) নামাজ আদায় করছেন নৌকার উপর। এদিকে গত ২৪ ঘন্টায় যমুনার পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমে বিপদ সীমার ৭২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে চৌহালী ও এনায়েতপুরের ১০টি ইউনিয়নে নতুন নতুন এলাকা বন্যা কবলিত হয়ে পড়ছে।

ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, মানিকগঞ্জে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তবে যমুনা নদীর পানি আরিচাঘাট পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় তিন সেন্টিমিটার পানি হ্রাস পেয়েছে। তারপরও সোমবার সকালে এই পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বন্যার পানি। এতে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভাঙন এবং প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমিসহ নতুন নতুন এলাকা। রাস্তা-ঘাট ভেঙ্গে ও ডুবে গিয়ে জেলার ৬৫টি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জেলার বন্যাকবলিত এলাকার ২২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২৬টি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ে বন্যার পানি ওঠায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বাড়ি-ঘর ডুবে নিম্নাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে পড়েছে অনেক পরিববার।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। সোমবার ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ও ঘাঘটের পানি ১৮সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু বন্যা দূর্গত এলাকার লোকজনের দুর্ভোগ বেড়েই চলছে। রান্না করার কোন ব্যবস্থা না থাকায় তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে।

শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, মাদারীপুরের শিবচরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দী হয়ে পরছে হাজার হাজার মানুষ। বিশুদ্ধ পানি, খাদ্যসংকটের পাশাপাশি গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পরেছে পানিবন্দী মানুষেরা। প্রায় ৩০হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছে।

ভুরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ভুরুঙ্গামারীতে দুধকুমার নদের অব্যাহত ভাঙ্গনে প্রায় শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নীচে বসবাস করছে। ভাঙ্গন কবলিত এলাকাগুলো হলো শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রাম, তিলাই ইউনিয়নের উত্তরছাট গোপালপুর, ভুরুঙ্গামারী সদরের চরনলেয়া , ইসলামপুর এবং বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের ভরতেরছড়া ও গনাইরকুঠি গ্রাম।

কালিহাতী (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধিতে কালিহাতী উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত ইউনিয়গুলো হচ্ছে দূর্গাপুর, সল্লা, গোহালিয়াবাড়ী, দশকিয়া, নারান্দিয়া, বাংড়া, এলেঙ্গা পৌরসভা এলাকা, বাংড়া, সহদেবপুর ও কোকডহরা ইউনিয়ন। দ্রুতগতিতে পানি অন্যান্য ইউনিয়ন গুলো প্রবেশ করছে। সেগুলো হচ্ছে বল্লা, নাগবাড়ী, বীরবাসিন্দা, পারখী ও কালিহাতী পৌরসভা এলাকা।

সুজানগর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, পাবনার সুজানগরে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙ্গনে বাড়ি-ঘর ও ফসলী জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে পদ্মার অব্যাহত পানি বৃদ্ধিতে পদ্মার পার্শ্ববর্তী বাড়ি-ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ফসলী জমি তলিয়ে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার সাতবাড়ীয়া, মানিকহাট, নাজিরগঞ্জ ও সাগরকান্দী ইউনিয়নে তীব্র ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গনে ওই ৩টি ইউনিয়নের সাতবাড়ীয়া, নারুহাটি, শ্যামনগর, ভাটপাড়া, গুপিনপুর, মালিফা, মালফিয়া, গোয়ারিয়া, কামারহাট, মহনপুর, মহব্বতপুর, নাজিরগঞ্জ, হাসামপুর এবং বরকাপুর গ্রামের বেশ কিছু বাড়ি-ঘর এবং শতাধিক একর ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেই সাথে ভয়াবহ ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাট, নাজিরগঞ্জ বাজার, নাজিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিস, নাজিরগঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজ, বরকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোয়ারিয়া বাজার, রাইপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসা, গুপিনপুর কবরস্থান এবং নারুহাটি মত্স্য অবতরণ কেন্দ্র। ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে যে কোন মুহূর্তে ওই সকল প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

বাসাইল (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা আশিকুর রহমান জানান, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার পৌর এলাকার নিন্মাঞ্চলসহ ৬টি ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। পৌর এলাকার বাসাইল জোবেদা রুবিয়া মহিলা কলেজ, মুজিব হাবিব দাখিল মাদ্রাসা, বাসাইল উত্তর পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাসাইল দক্ষীন পাড়া প্রথমিক বিদ্যালয়ের মাঠসহ পুরো এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ঝিনাই নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙ্গন শুরু হয়েছে।

শেরপুর প্রতিনিধি জানান, শেরপুরের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। চরাঞ্চলের ১৯ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশেপাশে পানি প্রবেশ করার কারণে ওই বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শেরপুর-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পোড়াদোকানের কাছে প্রবল বেগে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উজান থেকে পানির ঢল নেমে আসায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সংস্কার বিহীন বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের পুরনো অসংখ্য ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করায় শেরপুরের চরাঞ্চলের ৬টি ইউনিয়নের ৩৭টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে শতাধিক কাঁচাঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়া জামালপুর, চরভদ্রাসন (ফরিদপুর), সারিয়াকান্দি (বগুড়া), ডিমলা (নীলফামারি), সদরপুর (ফরিদপুর) এবং উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি ও ত্রাণ বিতরণের খবর জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here