বছর ধরে র্যাবের পেছনে টাকা ঢালেন নূর হোসেন সহযোগী চার্চিল গ্রেফতার

15
বিশেষ প্রতিনিধি

 

এলাকায় নিজের আধিপত্য একচ্ছত্র রাখতে মরিয়া ছিল নূর হোসেন। এ জন্য গত এক বছর ধরে র্যাব-১১ এর সাবেক কর্মকর্তা মেজর আরিফ হোসেনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে সে। পাশাপাশি আরিফের মাধ্যমে আরো কয়েকজন র্যাব কর্মকর্তার পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালে নূর হোসেন। শেষ পর্যন্ত নূর হোসেন তাদের বশে আনতে সক্ষম হন। এখানেই শেষ নয়, স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা ও থানা পুলিশকেও নিয়মিত মাসোহারা দিত নূর হোসেন। ফলে তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার সাহস ছিল না কারো। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব কর্মকর্তাদের দিয়ে কাউন্সিলর নজরুলকে হত্যার পরিকল্পনা করে সে। শেষ পর্যন্ত সেই উদ্দেশ্য সফলও হয়! কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এদিকে নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তজা জামান চার্চিলকে ফরিদপুর থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আরিফ তার স্বীকারোক্তিতেও নূর হোসেনের এই উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম দিকে কিছুই বুঝতে পারেননি। পরে যখন বুঝতে পারেন তখন আর পিছু হটার সুযোগ ছিল না। কারণ নূর হোসেনের কাছ থেকে ততদিনে বিপুল পরিমাণ টাকা তিনি নিয়ে ফেলেছেন। সেই টাকায় ঢাকার মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট কিনেছেন। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে বানাচ্ছেন আলিশান বাড়ি। আর ময়মনসিংহ শহরে দেড় কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন জমি। ফলে জেনে বুঝেই নূর হোসেনের পক্ষে তাকে কাজ করতে হয়েছে। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়ে র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা এম এম রানাও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আরিফের মাধ্যমেই নূর হোসেনের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। আর ওই দিনের অপারেশন সিনিয়র কর্মকর্তার নির্দেশেই হয়েছে। শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে সিনিয়রদের নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ ছিল না তার।

সাত খুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, অপহরণ ও খুনের কাজ র্যাব সদস্যরা করলেও লাশ গুম করার কাজে সহযোগিতা করেছে নূর হোসেন। কারণ তার বালুমহাল আগে থেকেই ফাঁকা করে ফেলা হয়। রাত ১০টার পর কোন শ্রমিক সেখানে ছিল না। ফলে নির্বিঘ্নেই র্যাব সদস্যরা লাশ সেখানে নেয়ার পর ট্রলারে করে নদীতে নিয়ে যায়। আরিফ তদন্তকারীদের কাছে বলেছেন, সিদ্ধিরগঞ্জে দায়িত্ব পালন করার কারণে নূর হোসেনকে তিনি গ্রেফতারের জন্য প্রথমে টার্গেট করেছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে তার সখ্য দেখে গ্রেফতারের সাহস করেননি। এক পর্যায়ে নিজেই নূর হোসেনের কালো টাকার কাছে হার মানেন। তবে নূর হোসেনের টাকা তিনি একা নেননি। ঊর্ধ্বতনদেরও ভাগের টাকা পৌঁছে দিয়েছেন।

এদিকে নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তজা জামান চার্চিলকে (৪৫) গত বৃহস্পতিবার রাতে ফরিদপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। সাত খুনের ঘটনায় এ নিয়ে র্যাব-১১ -এর সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৯ জন গ্রেফতার হলো। এরমধ্যে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে সাবেক তিন র্যাব কর্মকর্তাসহ ১৩ জনকে। অপরদিকে চার্চিলসহ ১৫ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৫৪ ধারায়। এদিকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের গতকাল ছিল ৪০তম দিন। এ উপলক্ষে গতকাল নিহত কাউন্সিলর নজরুলের ফতুল্লার বাড়িতে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, গ্রেফতারকৃত মোর্তজা জামান চার্চিল সাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের অন্যতম সহযোগী। তাকে ফরিদপুর থেকে গতকাল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, খুব দ্রুত সময়ে মামলার বাকি আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর থেকে আমি যা বলেছিলাম, তাই সত্যি হলো। গ্রেফতারকৃত সাবেক র্যাব কর্মকর্তা মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে বিস্তারিত জানিয়েছেন। কারা কারা জড়িত, কারা নির্দেশদাতা। অবিলম্বে আমি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য সবাইকে গ্রেফতারের দাবি করছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলার তদন্ত নিয়ে আমাদের কোন প্রশ্ন নেই। আমরা মনে করি, মামলা সঠিকভাবেই চলছে। তবে ঘটনার ৪০ দিন হয়ে গেল, কিন্তু মামলার এজাহারভুক্ত কোন আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় কিছুটা ক্ষোভ থাকতেই পারে। তবে আমরা অপেক্ষা করছি, প্রয়োজনে আরো অপেক্ষা করবো কিন্তু আমরা চাই খুনিরা ধরা পড়ুক। গ্রেফতারকৃত মোর্তজা জামান চার্চিল সম্পর্কে তিনি বলেন, চার্চিলই নূর হোসেনের মাদক ব্যবসা দেখাশোনা করতো। নূর হোসেনের অনেক গোপন কথাই সে জানে। তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সাত খুনের ঘটনায় আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে ধারণা তার।

আমাদের ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, মোর্তজা জামান চার্চিলকে গোয়েন্দা পুলিশ বৃহস্পতিবার ভোর রাতে সদর উপজেলার নর্থ-চ্যানেল ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চল থেকে গ্রেফতার করে। ফরিদপুর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর সুনীল কর্মকার জানান, গত ৩০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে অপহূত সাত জনের লাশ উদ্ধারের পর চার্চিল তার দ্বিতীয় স্ত্রী আক্তারের বাড়িতে আত্মগোপনে ছিল। তার বাড়ি ফরিদপুরে শহরের ভাটি লক্ষ্মীপুর এলাকায়। তার বাবার নাম মশিউর রহমান।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, নূর হোসেনের অন্যতম সহযোগী চার্চিল। সে নূর হোসেনের মাদক ব্যবসা দেখাশোনা করতো। এর আগে গত ১২ মে নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় নূর হোসেনের আর এক সহযোগীে রফিকুল ইসলাম রতনকে। রতন দেখাশোনা করতো নূর হোসেনের কাঁচপুর, শিমরাইল এলাকার চাঁদাবাজি। রতনের দেয়া তথ্য মতে চার্চিলকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও গ্রেফতার করা হয়েছে নূর হোসেনের সহযোগী মশিউর রহমান, মহিবুল্লা, কামাল হোসেন, শিপন, হারুন, কিলার জসিম, হারুনুর রশিদ ও জোহাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here