বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

29

জনতার নিউজ

জনগণের সেবক হয়ে কাজ করুন :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদরা জীবন দিয়ে জাতিকে রক্তঋণে আবদ্ধ করেছেন। তাদের রক্তের ঋণ আমাদের শোধ করতে হবে। এ জন্য সরকারি সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জনগণের সেবক হয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার মাধ্যমেই তার এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪১তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছিলেন। অনেক বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে আমরা জাতির পিতার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি।

দেশের নানা খাতে উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জনগণের সেবক, জনগণের সেবা করব। জনগণের রক্ত ঘামঝড়া অর্থ দিয়েই তো আমাদের বেতন, ভাতা সবকিছু- একথাটা যেন এক ?মুহূর্তের জন্যও ভুলে না যাই। মানুষের সেবার মতো শান্তি দুনিয়ায় আর কিছুতে নেই। কোনো দিন গরিব-দুঃখীর ওপর অত্যাচার করবেন না। তিনি বলেন, যেকোন কাজ আমরা হাতে নেই না কেন, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব আপনাদের (সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী) ওপর অনেকাংশে বর্তায়। কাজেই আপনারা আন্তরিকতার সাথে সেই কাজ সম্পাদন করবেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক অধ্যায়ের            স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে আরো বলেন, আমাদের এই কষ্ট, দুঃখ, ব্যথা-বেদনা ভুলেও দেশের জন্য, মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করার যে চেষ্টা করে যাচ্ছি- এখানে আপনাদের সহযোগিতা সবসময় কামনা করি। দেশের সেবা করা যেকোনো সরকারি কর্মচারীর একান্তভাবে দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার সরকারের শাসনামলে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের খণ্ড চিত্র তুল ধরে বলেন, আমরা বিজয়ী জাতি, বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে যেন মাথা উঁচু করে চলতে পারি, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার একটি ভাষণের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেন, ‘সরকারের সমস্ত সরকারি কর্মচারীকেই আমি অনুরোধ করি, যাদের অর্থে আমাদের সংসার চলে তাদের সেবা করুন। যাদের জন্য, যাদের অর্থে আজকে আমরা চলছি তাদের যেন কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। যারা অন্যায় করবে আপনারা তাদের অবশ্যই কাঠোর হস্তে দমন করবেন; কিন্তু সাবধান, একটি নিরপরাধ লোকের ওপরও যেন অত্যাচার না হয় তাতে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার এই মহামূল্যবান কথাগুলো দায়িত্বে থাকা সকলেরই মনে রাখা উচিত।

শেখ হাসিনা বলেন, এদেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে গিয়েই জাতির পিতা জীবন দিয়ে গেছেন। এই ওয়াদা তিনি ৭ই মার্চের ভাষণসহ বহু জায়গায় করেছেন এবং জীবন দিয়ে রক্ত দিয়ে সেই ওয়াদাই তিনি পূরণ করে গেছেন। তিনি সচিবালয়ের কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন, আজ আপনারা একটি মহত্ কাজ করতে যাচ্ছেন-রক্তদান। একজন রক্ত দেবেন আর একটি মানুষের জীবন বাঁচাবেন। রক্ত দিলে কোনো ক্ষতি না হয়ে শরীরের জন্য উপকার উল্লেখ করে বলেন, নিয়মিত রক্ত দিলে শরীরে নতুন রক্ত কণিকা জন্মে এবং শরীর ভাল থাকে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ৫৬-৫৭ বছর বয়স পর্যন্ত নিয়মিত রক্ত দিতেন উল্লেখ করে বলেন, তিনি দেশে ফেরার পর থেকে ১৫ আগস্ট উপলক্ষে প্রতিবছর আয়েজিত রক্তদান কর্মসূচিতে নিজেও রক্ত দিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন বয়স হয়ে যাওয়ায় ইচ্ছে থাকলেও আর দিতে পারি না। রক্ত দেয়ার যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে আমি এখনো রক্ত দিতে প্রস্তুত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরের আগে তত্কালীন পূর্ববঙ্গে বাঙালির কোনো অধিকার ছিলো না। বঙ্গবন্ধু সব সময় বাঙালির অধিকার আদায়ের কথা বলেছেন। সে কারণে তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, তাকে ফাঁসি পর্যন্ত দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার পরও তিনি সব সময় ন্যায্য অধিকারের কথা বলেছেন। ১৯৫৬ সালের ৯ জানুয়ারি পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় কর্মক্ষেত্রে পূর্ববাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জাতিগত বৈষম্যের যে চিত্র উপস্থাপিত হয় তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় পাকিস্তান সরকারে সচিবদের পদ ছিল ২২টি। যার সবকটির পদাধিকারী ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানীরা। যুগ্ম-সচিব পদে পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল ৪২ জন এবং বাঙালিদের ৮ জন। উপ-সচিব ৬৯টি পদে আসীন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীরা অন্যদিকে ২৩ জন ছিলেন বাঙালি। সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল আরো ভয়াবহ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩টি জেনারেল পদ, ২০টি মেজর জেনারেলের পদ এবং ৩৪টি ব্রিগেডিয়ারের পদের সবকটিতেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা আসীন ছিলেন। কর্নেল পদে- পশ্চিম পাকিস্তানী ছিল ৪৯ জন এবং বাঙালি মাত্র একজন। লে. কর্নেল পদে- পশ্চিম পাকিস্তানী ১৯৮ জন আর বাঙালি ২ জন। মেজর পদে- পশ্চিম পাকিস্তানী ৫৯০ জন আর বাঙালি ছিলেন ১০ জন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নৌবাহিনীর ৬শ পদের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানী ৫৯৩ জন এবং বাঙালি ছিলেন ৭ জন। অন্যদিকে বিমানবাহিনীর ৬৪০টি পদের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানীরা ৬শ পদে আর বাঙালিরা ৪০টি পদে আসীন ছিলেন।

উদ্বোধনী পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী রক্তদান কর্মসূচি ঘুরে দেখেন এবং স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে জাতির পিতার রক্তঋণের কিছুটা হলেও শোধের এই মানসিকতা থেকে এদিন স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্য সচিবালয়ের ৪২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারি তালিকাভুক্ত হন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী প্রমুখ। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here