ফুলগাজীর চেয়ারম্যানকে গুলি ও পুড়িয়ে হত্যা

12

প্রকাশ্যে গাড়ি থামিয়ে চারদিক থেকে এলোপাতাড়ি গুলি * হত্যা নিশ্চিত করতে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা

 

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক একরামকে (৪৮) প্রকাশ্য দিবালোকে গাড়িতে হামলা চালিয়ে গুলি করার পর পুড়িয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে ফেনীর জিএ একাডেমী রোডের বিলাসী সিনেমার হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ফুলগাজী সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন সামু (৬০), দৈনিক ‘ফেনী প্রতিদিন’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মহিবুল্লাহ ফরহাদ (৩২), নিহতের বন্ধু দেলোয়ার হোসেন (৪৫) ও গাড়িচালক মামুন (৩০) গুরুতর আহত হয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শত শত মানুষের সামনে ১৫/২০ জন দুর্বৃত্ত একরামুলকে বহনকারী প্রাডো গাড়িটি ঘেরাও করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। তারা গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করে। এসময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে তাদের উদ্দেশে পরপর কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গাড়ির দরজা আটকে গেলে ভিতরে সবাই আটকে যান। এসময় গাড়ির পিছনের সিটে বসে থাকা একরামুল গুলিবিদ্ধ হন। পরে দুর্বৃৃত্তরা গাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় অন্যরা বেরিয়ে আসতে পারলেও একরামুল গাড়িতেই আগুনে পুড়ে মারা যান। ঘটনার পর ফেনী ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলার আগেই একরামুলের লাশ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে এ হত্যার প্রতিবাদে একরামুলের সমর্থকরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে। ফেনী শহর, ফুলগাজী ও দাগনভূঞার রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা একাধিক গাড়িও ভাংচুর করে। এ ছাড়া ছাত্রলীগ, যুবলীগ কর্মীরা দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল এলাকা অবরোধ করে রাখে। পরে বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলেও এ ঘটনার পর থেকে সারাদিন ফেনী শহরে অঘোষিত হরতাল পালিত হয়। ঘটনার পর এলাকায় বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা টহল দেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে একরামুলের বন্ধু আহত দেলোয়ার হোসেন জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতাল থেকে বের হয়ে তারা ফুলগাজীর উদ্দেশে রওনা দেন। গাড়ির পিছনের সিটে ছিলেন একরামুল, মহিউদ্দিন সামু ও মহিবুল্লাহ ফরহাদ। তিনি সামনের সিটে বসে ছিলেন। গাড়িটি রেললাইনের লেভেল ক্রসিং পার হয়ে জিএ একাডেমী রোডের বিলাসী সিনেমা হলের সামনে আসার সাথে সাথে প্রায় অর্ধশত যুবক আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি, কিরিচ ও রড নিয়ে সামনে ব্যারিকেড দেয়। তারা ধারালো অস্ত্র ও রড দিয়ে গাড়িতে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এক পর্যায়ে গাড়ির জানালা-দরজার কাঁচ ভেঙ্গে যায়। গাড়ি লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। আশপাশে বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। তিনি গাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে দেখেন সেটি আর খোলা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে সামনের উইন্ডশিল্ড ভেঙ্গে যাওয়া স্থান দিয়ে তিনি বের হয়ে আসেন। এসময় দুর্বৃত্তরা তার পিঠে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপ দেয়। তাদের চিত্কার শুনে আশপাশের মানুষ এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে দুর্বৃত্তরা তাদের হুমকি দেয়।

দেলোয়ার জানান, গাড়ি থেকে বের হয়ে আসার পর তিনি দূরে দাঁড়িয়ে দেখেন যে মহিউদ্দিন সামু, মহিবুল্লাহ ফরহাদ ও চালক মামুন গাড়ি থেকে বের হয়ে আসলেও ভিতরে চেয়ারম্যান একরামুল পড়ে আছেন। তাকে বের করার জন্য তিনি চিত্কার করতে থাকেন। কিন্তু এসময়ের মধ্যেই দুর্বৃত্তরা গাড়িতে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাথে সাথে দাউদাউ করে গাড়িটি জ্বলতে থাকে। দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট এসে আগুন নেভায় ও একরামুলের মৃতদেহ উদ্ধার করে ফেনী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

এদিকে এ ঘটনায় ফেনী শহরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে শহরে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে একরামের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতা ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মাহতাব উদ্দিন মিনার চৌধুরীর ফুলগাজীর হাসানপুর গ্রামের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ভাংচুর চালানো হয়। ফেনী-পরশুরাম সড়ক বিক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বেলা ২টা থেকে সড়ক অবরোধ করে রাখে। তারা ফেনীর মহিপালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও অবরোধ করে। ফলে মহাসড়কের দুই দিকে ৮ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। বিকাল ৫টার দিকে স্থানীয় প্রশাসন হত্যাকারীদের গ্রেফতারের আশ্বাস দিলে নেতা-কর্মীরা অবরোধ তুলে নেন।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, একরাম জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন ছাড়াও ঠিকাদারী ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদক এবং দৈনিক ফেনী প্রতিদিন এর মালিক-সম্পাদক ছিলেন। বেশ কয়েকমাস পূর্বে একটি তুচ্ছ ঘটনায় ফেনী ডায়বেটিক হাসপাতালে তালা লাগিয়ে দেয় তার নিজ দলীয় এক প্রভাবশালী নেতার সমর্থকরা। এ ঘটনাসহ বিভিন্ন কাজের ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে তিনি দলীয় এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন। যদিও ঐ সংসদ সদস্য ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কাছে হত্যাকারীদের গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। ফেনী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর খোন্দকার বলেন, সন্ত্রাসী যেই হোক না কেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের গ্রেফতার করবে। জেলা পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যানের হত্যাকারীদের সনাক্ত করে দ্রুত গ্রেফতার করা হবে। ফেনীর এএসপি (সার্কেল) শামছুল আলম জানান, ঘটনাটি দলীয় কোন্দলের জের কিনা তা তদন্তের পরে বলা যাবে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রহমান এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ঘটনার সাথে যারা জড়িত রয়েছে তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে।

নিহত উপজেলা চেয়ারম্যানের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহতের স্ত্রী তাসমিন আক্তারসহ পরিবারের সবাই ঢাকায় থাকেন। তারা এখন শোকে মূহ্যমান। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন ফেনী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ। নিহত একরামুলের ডিএনএ-এর নমুনা সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। এর রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাত ১১টায় তার লাশ ডিএনএ পরীক্ষা শেষে ফেনীর উদ্দেশে রওয়া হয়।

এদিকে আজ সকাল ৯টা মিজান ময়দান মাঠে মরহুমের প্রথম জানাজা এবং ১১টায় দ্বিতীয় জানাজা ফুলগাজী পাইলট স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুর কাদের জানাজায় উপস্থিত থকবেন।

রাষ্ট্রপতির নিন্দা ও শোক

এদিকে এ হত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। গতকাল এক শোক বিবৃতিতে রাষ্ট্রপতি নিহতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়া শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here