ফটোসাংবাদিক আফতাব আহমেদ নিজ বাসায় খুন

22

image_96339স্বাধীনতাযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক পাওয়া দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক প্রবীণ ফটো সাংবাদিক আফতাব আহমেদ (৭৯) খুন হয়েছেন। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর ৬৩ পশ্চিম রামপুরার ওয়াপদা রোডের নিজ বাসা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর গাড়ি চালক কবিরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিহতের নিকট আত্মীয়রা ধারণা করছেন, চালক এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বাসা থেকে টাকা ও মালামাল লুট করেছে। ঘটনার আলামত দেখে এবং প্রাথমিক তথ্যে গাড়ি চালককে সন্দেহ করছে গোয়েন্দা পুলিশ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক ছবি ছাড়াও ‘৭৫-এর ১৫ আগস্টে নিহত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি, ৭ নভেম্বর এবং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বহু অমূল্য ছবি তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। তবে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষপীড়িত চিলমারী এলাকায় তার তোলা জাল পরিহিত বাসন্তী ও দুর্গতি নামের তরুণীর ছবি দেশে-বিদেশে বেশ আলোচিত হয়। তিনি ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি’, ‘বাংলার মুক্তির সংগ্রাম: সিরাজউদ্দৌলাহ থেকে শেখ মুজিব’, ‘আমরা তোমাদের ভুলি নাই’সহ কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মো. মারুফ হাসান সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে আফতাব আহমেদকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তিনি যে ফ্ল্যাটে থাকতেন সম্প্রতি তা বিক্রি করা হয়েছে এবং বেশ কয়েক লাখ টাকা বাসায় পাওয়া গেছে। এ টাকার জন্যই দুর্বৃত্তরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, তবে গাড়িচালক কবির ও রাজমিস্ত্রীর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের ধারণা তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

আফতাব আহমেদের বন্ধু মো.জহিরুল হক জানান, তার কোনো শত্রু ছিল না। তাকে অর্থের লোভে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছি। আফতাব সবসময়ই তার কাছে নগদ অর্থ রাখতেন। ছেলে-মেয়েরা পাশে না থাকায় গাড়িচালককে দিয়েই টাকা-পয়সার সব লেনদেন করাতেন। নিহতের একমাত্র মেয়ে আফরোজা আহমদ বর্ণা জানান, ড্রাইভার কবির প্রতিনিয়ত বাজারের অবশিষ্ট টাকা নিজের পকেটে ঢোকাতো। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে কবিরের কথা কাটাকাটি হয়েছিল। যেহেতু সে এখন পলাতক তাই এ হত্যাকাণ্ডের চালক ও রাজমিস্ত্রী জড়িত থাকতে পারে।

চারতলা বাড়ির তৃতীয় তলায় থাকতেন আফতাব আহমেদ। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। স্ত্রী মোমতাজ বেগম মারা গেছেন তিন বছর আগে। ছেলে মনোয়ার আহমেদ সাগর থাকেন যশোরে এবং মেয়ে আফরোজা আহমেদ বর্ণা গাজীপুরে থাকেন। বাসায় তিনি একাই বসবাস করতেন। কাজের বুয়া নাসিমা ও ড্রাইভার কবির ছাড়া আশপাশের আর কেউ ওই বাসায় তেমন একটা যাতায়াত করতেন না।

গতকাল সকালে নাসিমা রান্না করতে এসে বাসায় কারো সাড়া-শব্দ না পেয়ে ভাড়াটিয়াদের জানায়। পরে মেয়ে জামাই ফারুক ঘটনাটি থানায় জানালে পুলিশ ঘরের দরজা ভেঙ্গে লাশ উদ্ধার করে। গৃহকর্মী জানান, সন্ধ্যায় তিনি এ বাসায় রান্নার কাজ করেছেন। বাসা থেকে যাওয়ার সময় তিনি আফতাব আহমেদের সঙ্গে তার গাড়িচালক কবির এবং একজন রাজমিস্ত্রীকে দেখেছিলেন। এসময় কি নিয়ে যেন আফতাব আহমেদ কবিরকে বকাবাদ্য করছিলেন।

রামপুরার ওসি কৃপা সিন্ধু বালা জানান, হত্যাকাণ্ডের কারণ তদন্তের জন্য গৃহকর্মী নাসিমা ও পুরাতন ড্রাইভার অলিকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

গতকাল সকালে বাসায় গিয়ে দেখা যায় আফতাব আহমেদের বেডরুমে কাপড়-চোপড় এলোমেলে। বিছানা এলোমেলো ছিল। তার হাত-পা ছিল বাঁধা। গলায় একটি গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করা। এছাড়া আলমিরার দরজা খোলা।

আজ জানাজা

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় রামপুরায় তার বাসভবনের পাশের মসজিদে প্রথম জানাজা এবং যোহরের নামাজের পর জাতীয় প্রেসক্লাবে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে। আফতাব আহমেদ ১৯৩৪ সালে রংপুরের গঙ্গাচড়া থানার মহিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬২ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে যোগদান করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্টস এসোসিয়েশন শোক প্রকাশ করেছে। এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here