প্রকৃত গণতন্ত্রের তিন শর্ত

20

gonotontro

গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক আঞ্চলিক সেমিনার

প্রকৃত গণতন্ত্রের তিন শর্ত

কার্যকর সংসদ * শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান * সক্রিয় বিরোধী দল

চলমান রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ পর্যালোচনা বিষয়ক এক আঞ্চলিক সেমিনারে গবেষক ও বিশেষজ্ঞগণ টেকসই ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর সংসদ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও সক্রিয় বিরোধীদলের উপর জোর দেয়ার আহবান জানান। বক্তারা বলেন, গণতন্ত্র ও রাজনীতি চর্চার বর্তমান রূপ কোনভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর সমঝোতা হতে হবে রাজনীতি চর্চার মূলমন্ত্র। তা না হলে গণতন্ত্রের সুফল দেশ ও জনগণ পাবে না। তখন অর্থনৈতিক অগ্রগতিও ব্যাহত হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) ‘রাজনৈতিক ঘটনাবলী পুনর্বিবেচনা: সংস্কৃতি, সভ্যতা ও পরিচিতি’ শীর্ষক দুইদিনব্যাপী এই আঞ্চলিক সেমিনারের আয়োজন করে। ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল সাইন্স এসোসিয়েশন (ইপসা) এই সেমিনারের মূল উদ্যোক্তা। রাজধানীর বনানীতে পিআরআই এর কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত সেমিনারের প্রথমদিনে গণতন্ত্রায়ন বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমিরেটাস ড. জিল্লুর রহমান খান। প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহান।

ড. জিল্লুর রহমান তার মূল প্রবন্ধে বলেন, আমরা যদি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই তাহলে সংসদে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকতে হবে। ‘সরকারি দলই সব কিছু করবে’ (উইনার টেক অল)- এমন মানসিকতা বাদ দিতে হবে। বিরোধী দলের বয়কট বা বর্জনের সংস্কৃতি যেমন পরিত্যাগ করতে হবে, তেমনি তাদেরকে কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সমান সুযোগ দিতে হবে। সমঝোতা, পরমতসহিষ্ণুতা আর সম্প্রীতির সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও ক্ষমতাবান করলে সামাজিক ন্যায় বিচার আসবে, সুশাসনের ঘাটতি দূর হবে।

তিনি আরো বলেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এখন যে গণতন্ত্র দেখছি সেই গণতন্ত্রকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। সমঝোতা ছাড়া গণতন্ত্র এগুবে না, শক্তিশালী বা প্রাতিষ্ঠানিকতা তো দূরের কথা।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, এ পর্যন্ত চারটি তত্ত্বাবধায়ক বা অস্থায়ী সরকার নির্বাচন পরিচালনা করেছে। এই পদ্ধতির অসুবিধা হল নির্বাচনের আগে সর্বশেষ ক্ষমতাসীন দলকে নিগৃহীত হতে হয়। আর বিরোধী দল সুবিধা পায়। এ অবস্থায় এ পদ্ধতিটি জনগণ ভালভাবে গ্রহণ করতে দ্বিধায় পড়ে। প্রথম পর্বে সভাপতির বক্তব্যে বিইআই-এর সভাপতি রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান বলেন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। সক্রিয় সংসদ, কার্যকর বিরোধী দলের আবশ্যকতা গণতন্ত্রে রয়েছে।

দিনব্যাপী সেমিনারে মুক্ত আলোচনা ও প্রবন্ধ পাঠ করেন কসভোতে জাতিসংঘের সাবেক মিশন প্রধান রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ, পিআরআই-এর ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ, ওয়াশিংটনস্থ জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ফেলো হাসান ইব্রাহিম, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য প্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক মার্ক ফারহা, ভারতের নৈনিতালের কু মাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিপি বার্থওয়াল, বেলজিয়ামের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ এন্ড কো অপারেশনের ড. তাজীন মুরশিদ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কের প্রফেসর এমেরিটাস ড. থেডোর রাইট, যুক্তরাষ্ট্রের এটর্নি রানা তিওয়ারি, মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ইয়ান ভাসলাবকি, ড. মিজানুর রহমান শেলী, অধ্যাপক আমেনা মহসীন। রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর, রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, বদিউল আলম মজুমদার প্রমুখ।

রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তরে আজ সমতা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা খুবই জরুরি। সম্প্রতি দুর্নীতির ব্যাপক প্রসারের কারণে সুশাসন দুর্বল হয়ে গেছে। বিরোধী দলকে সমান রাজনৈতিক সুযোগ দিতে হবে। বিরোধী দলকে ‘সরকার বিরোধী’ না বলে ‘রাষ্ট্র বিরোধী’ হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ফেলো হাসান ইব্রাহিম বলেন, আদর্শ, প্রতিষ্ঠান আর জনগোষ্ঠী- এই তিনটি বিষয় পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকলে সমাজ অগ্রসর হবে। এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে মেরুকরণ হয়। কিন্তু সমাজ বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। মূল বিষয় হল সংকট নিরসনের লক্ষ্যে কেমন ভূমিকা রাখা হবে। সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংকট নিরসনে আদর্শ অনুসরণ করতে হয়। সেজন্য প্রতিষ্ঠান দরকার। প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আদর্শ বিস্তৃত হয়। আর জনগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠান গঠন করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here