নেতাদের অজ্ঞাতবাসে বিএনপিতে ক্ষোভ-হতাশা

20

image_88872বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের অজ্ঞাতবাসে নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ আর হতাশা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিতে দলটির কোনো নেতাকেই রাজপথে দেখা যায়নি। শুধু কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে মিডিয়ার সামনে দলের বক্তব্য তুলে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল শীর্ষ নেতাদের কর্মকাণ্ড। ওই সময় নেতাদের পেছনে দাঁড়িয়ে টেলিভিশনে নিজেদের চেহারা দেখানোর প্রতিযোগিতায় থাকতেন অন্য নেতারা। এমন অভিযোগ বিএনপির ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমুলের অনেক নেতা-কর্মীর।

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেন দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। সব ধরনের পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতেন তিনি। কয়েক মাস আগে রিজভী গ্রেপ্তার হলে সালাহউদ্দিন আহমদ কেন্দ্রীয় কার্যালয় সামলান। এক সময় গ্রেপ্তার হন সালাহউদ্দিনও। তখন দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয় শামসুজ্জামান দুদুকে। এভাবেই বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে কেউ না কেউ দায়িত্ব নিতেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। দলের মুখপাত্র ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য শীর্ষ নেতারাও আত্মগোপনে আছেন। তাঁদের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়েছে।

অবরোধে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় আসামিদের মধ্যে আছেন মির্জা ফখরুল, সাদেক হোসেন খোকা, মির্জা আব্বাস, রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম প্রমুখ।

এঁদের বাইরে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আর এ গণি, জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ওসমান ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের বিরুদ্ধে মামলা না থাকলেও তাঁদের দেখা যায় না কোনো কর্মসূচিতে। এর পরের সারির নেতাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

দলের অনেক নেতা-কর্মীই বলেন, রাজনীতিতে প্রতিকূল অবস্থা থাকতেই পারে। বিএনপি কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড দল নয়। তাই কর্মসূচি দিয়েই লাপাত্তা হয়ে যাওয়া কোনো ধরনের কৌশল বুঝতেই কষ্ট হয়। নেতারা এমন কোনো ভূমিকা নেননি, যা নেতা-কর্মীদের চাঙা করতে পারে।

আন্ডারগ্রাউন্ড দলের মতো মিডিয়ায় ভিডিওবার্তা বা প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে দিয়ে এখন নেতারা নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। আর জোটের শরিক জামায়াত তাদের কর্মীদের দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পিকেটিং করছে। তাদের ভাষ্য, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে এটা বিএনপির জন্য লজ্জাজনক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির সহযোগী সংগঠনের একজন নেতা প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গেলে পুলিশি হামলা-মামলার ভয় থাকবেই। তাই বলে কর্মসূচি ঘোষণা করে আত্মগোপনে থাকা রাজনীতিবিদদের জন্য শোভন নয়। কর্মীদের চাঙা করার মতো ভূমিকা নিতে না পারলে নেতৃত্বে থাকাই উচিত নয়।

দলের আরেক নেতা বলেন, এখন দেখা যাচ্ছে ম্যাডামকেই পথে নামতে হবে। সিনিয়র নেতারা অপেক্ষা করে থাকেন বেগম খালেদা জিয়ার জন্য। খালেদা জিয়াকেই যদি সব কর্মসূচিতে মাঠে নামতে হয়, তাহলে ওই নেতারা কেন আছেন?

প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার ভোর ছয়টা থেকে লাগাতার ৪৮ ঘণ্টার দেশব্যাপী সড়ক-নৌ-জলপথ অবরোধ শুরুর অনেক আগেই জোটনেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কেন্দ্রীয় নেতাদের মাঠে থেকে কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল আটটি পয়েন্টে নেতারা অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে কাজ করবেন। কিন্তু বাস্তবে এটা কার্যকর হয়নি। মাঠে নামা তো দূরে থাক, বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতাই মুঠোফোন বন্ধ করে আন্দোলনের মাঠ থেকে সরে ছিলেন। ওই দিন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে থাকলেও এরপর থেকে তাঁকে আর দেখা যায়নি। সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতা নিজেদের অসুস্থ দাবি করে বাসায় রয়েছেন। শুধু রুহুল কবির রিজভী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে শাহবাগে বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় শনিবার ভোররাতে রিজভীকে গ্রেপ্তারের পর বিএনপির কার্যালয় হয়ে পড়ে অভিভাবকশূন্য। সালাহউদ্দিন আহমদকে মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনিও কেন্দ্রীয় কার্যালয়মুখী হননি। অজ্ঞাত স্থান থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আর ভিডিওবার্তা পাঠিয়ে দলের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরছেন, কর্মসূচি ঘোষণা করছেন।

অবশ্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুক্রবার নয়াপল্টনে গায়েবানা জানাজা কর্মসূচিতে দেখা গিয়েছিল। জানাজা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি মোটরসাইকেলে চড়ে দ্রুত ওই এলাকা ছেড়ে যান ফখরুল। এদিকে শনিবার মালিবাগে বাসে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনাকারী হিসেবেও বিএনপির নেতাদের আসামি করেছে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ধরতে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করা হচ্ছে। তাদের খুঁজে বের করতে প্রযুক্তিরও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য পুলিশের আলাদা একটি দল কাজ করছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি স্থানে অভিযানও চালানো হয়েছে।

বিএনপির এসব নেতা দেশে আছেন, না বাইরে চলে গেছেন তা নিয়েও কর্মীরা কানাঘুষা করছেন। তবে সিনিয়র নেতাদের মাঠে অনুপস্থিতি, আত্মগোপনকে সুবিধাবাধী আচরণ হিসেবে মনে করছেন দলটির পরীক্ষিত ও মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। এতে সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা বাড়ছে বলে মনে করেন তাঁরা।

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য আজ সোমবার বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁদের সবারই মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here