নেতাকর্মীবিহীন অভিযাত্রা, সীমাবদ্ধ ছিল প্রেসক্লাব, হাইকোর্ট, মালিবাগে

16

Ovijatra১৮ দলীয় জোটের ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ শেষে গতকাল রবিবার সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল রাজধানীর নয়াপল্টন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। কিন্তু সেখানে বিএনপি বা জোটের কোন নেতাকর্মীকে সারাদিনেও দেখা যায়নি। কার্যালয় ছিল যথারীতি তালাবদ্ধ। সমাবেশের কোন প্রস্তুতিও সেখানে ছিল না। তবে বিচ্ছিন্নভাবে জোট সমর্থক আইনজীবী ও সাংবাদিকদের জাতীয় প্রেসক্লাব, হাইকোর্ট ও মালিবাগ এলাকায় তত্পর হতে দেখা গেছে। এসময় জোটের অন্যতম শরীক জামায়াত-শিবির এর কর্মীরা সহিংসতায় লিপ্ত হয়। পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষে মালিবাগে এক শিবিরকর্মী নিহত এবং অপর দুই স্থানে ১০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া রাজধানীতে এই কর্মসূচি ঘিরে আর কোন সহিংস ঘটনা ঘটেনি। রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশ পথে নাশকতার আশংকায় যানবাহনে তল্লাশি চালায় পুলিশ। অনেকের দেহ তল্লাশি করা হয়। তবে ১৮ দলের কর্মীরা রাজপথে না থাকলেও গতকাল দিনভর ওইসব এলাকা ছিল আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থক সংগঠনের দখলে।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুলশান কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। গতকাল নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ের সামনে রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে বিএনপিসহ ১৮ দলের নেতাকর্মীদের জাতীয় পতাকা হাতে সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ওই সমাবেশ বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান ও ধরপাকড়ের ফলে নেতাকর্মীরা মাঠে নামেননি। কেন্দ্রীয় নেতাদেরও দেখা যায়নি। দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টন থেকে ফকিরাপুল যাওয়ার পথে বিরোধী দলীয় নেতার উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। অবশ্য সন্ধ্যার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এছাড়া নয়াপল্টন থেকে মহিলা দলের তিন নেত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এরশাদের আমলের শুরুর দিকে এ ধরনের কর্মসূচিতে ব্যাপক ধরপাকড় করা হতো। বর্তমান সরকারের আমলে একই ঘটনা ঘটছে। এটা নতুন কিছু নয় বলে তিনি জানান।

প্রেসক্লাবে সরকার-বিরোধী দল সমর্থকদের সংঘর্ষ

পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে নয়াপল্টনে সম্ভব না হলে জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় স্থান নির্ধারণ করে ১৮ দল। এ স্থানে আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ সালের ‘জনতার মঞ্চ’ এর আদলে মঞ্চ তৈরি করে সমাবেশের পরিকল্পনা নেয়া হয়। অপরাহ্নে এ সমাবেশে বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। এই দ্বিতীয় সমাবেশের পরিকল্পনা করেছিলেন মূলত বিএনপি সমর্থিত পেশাজীবীরা। জানা গেছে, বিএফইউজের একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর নেতৃত্বে সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল গত শনিবার সন্ধ্যার পর গুলশানের বাসায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে তাকে এই পরিকল্পনার কথা জানান। বিএনপির একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত শনিবার অপরাহ্ন থেকে প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেয়ার দাবিতে মঞ্চ তৈরি করা হয়। এক হাজার লোক বসার জন্য চেয়ার দেয়া হয়। এই সমাবেশে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির সমর্থিত আইনজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যোগদান করার কথা ছিল। ভোর থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা প্রেসক্লাবে এসে উপস্থিত হয়। এছাড়া বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত অন্য পেশার লোকজন (বহিরাগত) প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে এসে সমবেত হয়। এসময় প্রেসক্লাবের সদস্যরা প্রবেশ করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন। বহিরাগতদের সঙ্গে অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য থাকার অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিএফইউজে ও ডিইউজের নেতাকর্মীরা।

গতকাল সকাল থেকেই জাতীয় প্রেসক্লাব একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও বহিরাগতদের দখলে চলে যায়। এ অবস্থায় সোয়া ১টার দিকে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাংবাদিক ও বহিরাগতরা প্রধান গেট দিয়ে বের হতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় কিছুক্ষণ। পরে প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে রুহুল আমিন গাজীর সভাপতিত্বে সমাবেশ শুরু হয়। এসময় সোয়া ১২টার দিকে কদম ফোয়ারা থেকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মিছিল যাচ্ছিল। তাদের হাতে ছিল লাঠি। তখন প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণের সমাবেশ থেকে শেখ হাসিনা সম্পর্কে অশালীন ভাষায় বক্তৃতা দিচ্ছিলেন এক বক্তা। এসময় মিছিলকারীরা প্রেসক্লাবের সামনে এসে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করলে শুরু হয় উভয়পক্ষের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তীব্র বাধার মুখে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিতদের সমাবেশটি পণ্ড হয়ে যায়। পরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সরিয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এর আগে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষক সমাজ’র ব্যানারে একদল শিক্ষক প্রেসক্লাবের সমাবেশে আসছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কদম ফোয়ারার সামনে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। ঐ সময় ধস্তাধস্তিতে ২ জন শিক্ষক আহত হন। আহতরা হলেন, অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম ও সহকারী অধ্যাপক সাবরিন শাহনাজ। পরে শিক্ষকরা সেখান থেকে ফিরে যান।

সুপ্রীম কোর্ট এলাকায় সংঘর্ষ, আগুন

গতকাল সকাল থেকে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীরা সুপ্রীম কোর্টে প্রবেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনের দিকের গেট দিয়ে বের হয়ে প্রেসক্লাবের সমাবেশে আসার প্রস্তুতি নেন। গেট বন্ধ থাকায় তারা সেখানে বাধাপ্রাপ্ত হন। লোহার গেটের বাইরে রাস্তায় পুলিশ ও ভেতরে আইনজীবীরা অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জল কামান ও সাঁজোয়া যান নিয়ে প্রস্তুতি নেয় পুলিশ। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও সুপ্রীম কোর্ট বারের সভাপতি ও সাবেক এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে কয়েকশ আইনজীবী সমিতি ভবন থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এ সময় মিছিলে বিএনপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ডা. ওসমান ফারুক, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। মিছিল নিয়ে তারা সুপ্রীমকোর্টের মূল গেটের সামনে আসার আগেই গেটটি তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। এ সময় আইনজীবীরা উত্তেজিত হয়ে গেট খোলার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ আইনজীবীদের লক্ষ্য করে রঙ্গিন পানি নিক্ষেপ শুরু করে। এতে আবু জাফর মানিক ও নজরুল ইসলাম পাপ্পু নামে দুই আইনজীবী আহত হন। এ সময় পুলিশ দুটি সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কয়েক দফা সেখানে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইট পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

এদিকে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তিনটি মিছিল ঐ গেটের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। এসময় ‘ধর ধর’ বলে ভেতর থেকে মিছিলে ইট পাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। মিছিলকারীরা গেট ভাঙ্গার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে গেট খুলে তারা ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু পুলিশ নিরব ভূমিকা পালন করে। মিছিলকারীরা ভিতরে ঢুকে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের ধাওয়া করে। এতে অ্যাডভোকেট রেহানা পারভীন ও চিমকি আহত হন। ধাওয়া খেয়ে আইনজীবীরা সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে গিয়ে আশ্রয় নেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সেখানে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। দোতলা ও তিন তলা থেকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে বোতল ও গ্লাস নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে। এসময় কাঠের চেয়ারে অগ্নিসংযোগ করেন আইনজীবীরা। ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নেভায়। এসময় প্রচুর পুলিশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। সমিতি ভবনে প্রবেশের সকল প্রবেশ গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। আইনজীবীরা ভেতরে আটকা পড়েন। পরে বিকালের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

পুলিশ ওই এলাকা থেকে মিজানুর রহমান নামে এক বহিরাগত তরুণকে শিবির সন্দেহে গ্রেফতার করে। সন্ধ্যায় সমিতির ভবন থেকে কালো কোর্ট পরিহিত অবস্থায় আইনজীবীরা বের হয়ে যান। এসময় অনেক বহিরাগত শিবির ক্যাডার কালো কোর্ট পরিহিত অবস্থায় বের হয় যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে এ ঘটনায় আদালতে আসা বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।

মালিবাগে সংঘর্ষে শিবির কর্মী নিহত

এর আগে সকালে রাজধানীর মালিবাগে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে মনসুর প্রধানীয় (২৪) নামের এক শিবির কর্মী নিহত ও পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মনসুরের বন্ধু মনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, মনসুর আশকোনা ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শিবিরের সভাপতি ছিলেন। তিনি বনানীর সিটি ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে মালিবাগ পদ্মা সিনেমা হলের সামনে থেকে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা একটি মিছিল বের করেন। তারা টায়ারে আগুন দিয়ে রাস্তা অবরোধ করেন। পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পাটকেল ছোঁড়েন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশও ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে থাকে। এ ঘটনার পর রামপুরা থানা পুলিশের একটি দল পাশের একটি গলিতে তল্লাশি করতে যায়। এ সময় তাদের সঙ্গে শিবির কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ শেষে মনসুর নামে ওই ছাত্রকে সেখানে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সংঘর্ষের সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর ১২টার পর মালিবাগের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোজাম্মেল হক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মনসুরের বুকে বড় ধরনের ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে। মনসুরের বড় ভাই মানজুর আশিক হাসপাতালে সাংবাদিকদের জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর সদরের মুন্সিরহাটে। ঢাকায় মনসুর আশকোনায় থাকতেন। তাদের বাবার নাম আবদুর রাজ্জাক। তবে ভাইয়ের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তিনি কিছু বলেন নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here