নূর হোসেনের টাকায় ফ্ল্যাট কেনেন আরিফ

9

 

র্যাব-১১ এর কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও নরসিংদী এলাকা ছিল বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো মেজর আরিফের দায়িত্বে। এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নূর হোসেনের সঙ্গে আগে থেকেই আরিফের ছিল সুসম্পর্ক। ৭ জনকে অপহরণের পর হত্যার আগেও নানাভাবে নূর হোসেনের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়েছেন আরিফ। গত জানুয়ারি মাসে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট কেনেন আরিফ। নূর হোসেন তখন এলাকায় দম্ভ করে বলেছিলেন আরিফের এই ফ্লাটটি তিনিই কিনে দিয়েছেন। এই কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লেও আরিফ কোন প্রতিবাদ করেননি। এই ঘটনার তিনজন সাক্ষী তদন্তকারীদের কাছে এই তথ্য দিয়েছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, ফ্ল্যাট কেনার তথ্য পাওয়ার পর আরিফের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনি নূর হোসেনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন কি-না। জবাবে তিনি নূর হোসেনের টাকা নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ওই ফ্ল্যাট কেনার সঙ্গে ৭ খুনের কোন সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন। আরিফ জিজ্ঞাসাবাদকারীদের জানিয়েছেন, ৭ জন তাদের টার্গেটে ছিলেন না। তুলে নেয়ার কথা ছিল কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও মনিরুজ্জামান স্বপনকে। পরিস্থিতির কারণে অন্য ৫ জনকেও তুলে নিতে হয়েছে। দু’টি হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে ৭ জনকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যে একটি মাইক্রোবাসে নেয়া হয় নজরুল, স্বপন ও তাজুলকে। অন্যটিতে নেয়া হয় আইনজীবী চন্দন, তার ড্রাইভার ইব্রাহিম, নজরুলের ড্রাইভার জাহাঙ্গীর ও সিরাজুল ইসলাম লিটনকে। এই অপহরণের সময় ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন আরিফ আর এম এম রানা। মোবাইলে মনিটরিং করেন তারেক সাঈদ। তবে র্যাবের সাবেক সিও তারেক সাঈদ জিজ্ঞাসাবাদকারীদের বলেছেন, তুলে নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কোন আইনজীবী ছিলেন কি-না তা আরিফ বা রানা তাকে বলেননি।

এদিকে নূর হোসেনের কলকাতায় অবস্থানের বিষয়টি ইত্তেফাকের কাছে নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জের একজন ব্যবসায়ী। তিনি গত দুই তিনদিন আগে চিকিত্সাশেষে ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন। তার সঙ্গে নূর হোসেনের দেখা হয়েছে। তবে নূর হোসেন তাকে চিনতে পারেননি। আর তিনিও পাছে কি হয় এই ভয়ে- নূর হোসেনের সঙ্গে পরিচয় দিয়ে কথা বলেননি। তদন্তকারীরা চাইলে তিনি নূর হোসেনের সঙ্গে কোথায় দেখা হয়েছে তা বলতে রাজি আছেন। অপরদিকে মামলার অন্যতম আসামি হাজী ইয়াসিনসহ চারজন বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বলে তথ্য পেয়েছে তদন্তকারীরা। জামায়াতের অর্থ জোগানদাতা নারায়ণগঞ্জের একজন ব্যবসায়ীর মালয়েশিয়ায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তারা ওই ফ্ল্যাটেই অবস্থান করছেন। ফ্ল্যাট থেকে তারা বের হন না। জামায়াতের অর্থ জোগানদাতা ওই ব্যবসায়ী টাকা দিয়ে মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় নাগরিকত্ব নিয়েছেন। বর্তমানে তিনিও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। সরকার নূর হোসেনকে ধরার ব্যাপারে জোরালো উদ্যোগ নেয়ায় নূর হোসেনও এখন ভারত ছেড়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন।

সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন নূর হোসেনকে পেলেই তদন্তকাজ শেষ করা যাবে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও তত্পরতা চলছে। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন গতকাল বিকালে ইত্তেফাককে বলেন, মামলার দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। তবে তিনি সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ করে বলেন, মনগড়া কোন তথ্য লিখলে মামলার তদন্তে বিঘ্ন হতে পারে। এতে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। তাই সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলেই শুধুমাত্র লেখার অনুরোধ করেন তিনি।

নারায়নগঞ্জের আলোচিত এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত ২৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। এরমধ্যে ১৫ জনকে হত্যা মামলায় এবং ১৩ জনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এই ২৮ জনের মধ্যে র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা ও নূর হোসেনকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগে গ্রেফতার কামাল হোসেন ও মশিউর রহমান বর্তমানে রিমান্ডে আছেন। বাকী ২৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, নূর হোসেনের সাথে গ্রেফতারকৃত র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তার মধ্যে আরিফের ঘনিষ্ঠতা ছিল সবচেয়ে বেশি। নূর হোসেন তার মাধ্যমেই এই হত্যাকাণ্ডের সকল পরিকল্পনা করেন। টাকাও দেয়া হয় আরিফের মাধ্যমে। তবে কে কত টাকা পেয়েছেন তার হিসেব নিয়ে একেকজন একেক রকম তথ্য দিচ্ছেন। আরিফ তদন্তকারীদের বলেছেন, ৭ জনকে অপহরণের পর নেয়া হয় র্যাব-১১ এর আদমজী কার্যালয়ে। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের সেখানেই রাখা হয়। নজরুলের পরিবারের সদস্যরা যখন আদমজী কার্যালয়ে র্যাব-১১ এর সিও’র সঙ্গে কথা বলেন তখনও তারা ওই কার্যালয়ের ভিতরেই ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা ওখানে থাকতেই ৭ জনকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। আরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের পুরনো কোর্ট এলাকায় র্যাবের ক্যাম্পেই ৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। সব কাজ শেষ করে মধ্যরাতে তাদের লাশ নদীতে নিয়ে ফেলা হয়। রিমান্ডে রানাও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। আজ রানাকে রিমান্ড শেষে আদালতে নিয়ে নতুন করে রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে বলে একজন তদন্ত কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন।

নূর হোসেনের সহযোগীদের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ

আমাদের সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়কের পাশের অবৈধ দোকান-পাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সড়ক ও জনপথের উদ্যোগে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় শতাধিক ছোট-বড় দোকান ও টংঘর উচ্ছেদ করা হয়। এসব দোকান নূর হোসেনের সহযোগীরা চালাতেন বলে পুলিশ জানিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে কমপক্ষে ৪ শতাধিক অবৈধ দোকান ও টংঘর রয়েছে। নূর হোসেন ও তার ভাতিজা কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলসহ তাদের সহযোগীরা প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা হারে চাঁদা আদায় করত। এছাড়াও প্রতিটি দোকান থেকে অগ্রীম বাবদ ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here