নূর হোসেনকে ক্রসফায়ার না দেয়ার দাবি শহীদুলের

17

nur

 

নজরুলের বাসায় সিআইডির তদন্ত কমিটি;

নারায়ণগঞ্জে র্যাবের নতুন সিইও;

পেশাজীবী পরিষদের আন্দোলন চলবে;

সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে যেন ক্রসফায়ারে দেয়া না হয় সেই দাবি জানিয়েছেন নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নূর হোসেনকে ক্রসফায়ারে দিয়ে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হতে পারে। গতকাল সিদ্ধিরগঞ্জে নিজের বাড়িতে বসে শহীদুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাছে এই দাবি জানান। শহীদ চেয়ারম্যান বলেন, ‘নূর হোসেনকে ক্রসফায়ারে দিলে প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে। কিন্তু আমরা প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই, ঘটনার সঙ্গে জড়িত খুনিদের বিচার চাই। অন্য কোনোভাবেই গোঁজামিলের তদন্ত বা গ্রেফতার আমরা চাই না।’

এদিকে আলোচিত এই সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের নিয়ন্ত্রণাধীন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। সেখান থেকে ২ হাজার ৮২৪ বোতল ফেনসিডিল, ৫টি রামদা, বিয়ারের ৩৭টি ক্যান ও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়ার নেতৃত্বে গতকাল শুক্রবার এই অভিযান চালানো হয়। নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার জীবন কান্তি সরকার জানান, এই ট্রাকস্ট্যান্ডটি মাদক ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে মেলার নামে চলছিল অশ্লীল নৃত্য আর জুয়ার আসর। গতকাল নিহত নজরুলের বাড়িতে গিয়ে কথা বলেছেন সিআইডির তদন্ত দল। আর র্যাব-১১ এর সিও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন লে. কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান।

নিহত নজরুলের ছোট ভাই আবদুস সালাম বলেছেন, ‘যে কোনো মূল্যে আমার ভাইয়ের খুনিদের গ্রেফতার করতে হবে এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অবিলম্বে র্যাবের ওই তিন কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।’ অন্যদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘খুনি যারাই হোক, তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।’ তিনি আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, ‘কাউকে ক্রসফায়ারে ফেলে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলে আমরা তা মেনে নেব না। জাতির সামনে খুনিদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। উদঘাটন করতে হবে প্রকৃত সত্য।’

গতকাল বিকাল ৪টা থেকে দেড় ঘণ্টা ধরে নূর হোসেসেনর ট্রাকস্ট্যান্ডে তল্লাশি চলে বলে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মইনুর রহমান জানান। নারায়ণগঞ্জের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর হোসেন আন্তঃজেলা ট্রাক চালক ইউনিয়নের সিদ্ধিরগঞ্জ শাখারও সভাপতি। শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে তার আধিপত্য ছিল বলে এলাকাবাসী জানান। পরিদর্শক মইনুর রহমান বলেন, নূর হোসেনের দোকানগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ধারালো অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল ও বিদেশি মদ পাওয়া গেছে। অভিযান চলাকালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের বলেন, শামসুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ট্রাকস্ট্যান্ডের পাঁচটি দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করছিলেন নূর হোসেন। দোকানগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে দু’টি রামদা, তিনটি দা, প্রায় তিন হাজার বোতল ফেনসিডিল, নয় বোতল বিদেশি মদ ও ৩৭টি বিয়ারের ক্যান পাওয়া গেছে। এছাড়া দোকানগুলোতে বাঁশের লাঠি ও নূর হোসেনের নামে ব্যানার-ফেস্টুন পাওয়া যায়।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা, উচ্ছেদে বাধা, পরিবহনে চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন নূর হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, কাঁচপুর ও সিদ্ধিরগঞ্জে চাঁদাবাজি, নদী দখল, মাদক ব্যবসাসহ অনেক কিছুরই নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি ও তার লোকজন। তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানায় ছয়টি হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলা রয়েছে। এর আগে গত ৩ মে নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি মাইক্রোবাস ও ১২ জনকে আটক করে পুলিশ। এছাড়া নূর হোসেনের বিভিন্ন আস্তানায় কয়েক দফা হামলা চালায় জনতা। এরপর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে আছেন। এরপর গত ৬ মে কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বিআইডব্লিউটিএ ও নারায়ণগঞ্জে জেলা প্রশাসন। সেখানে নূর হোসেন, তার ভাই নূরুজ্জামান ওরফে জজ মিয়া ও অন্য সহযোগীরা অবৈধ টং ঘর তৈরি করে বালু ও পাথরের ব্যবসা করতেন। এছাড়া তাদের আরো অবৈধ ব্যবসা রয়েছে।

নজরুলের বাড়িতে সিআইডির প্রতিনিধি দল

সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, হত্যাকাণ্ডের শিকার প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের মিজমিজি পশ্চিমপাড়ার বাসা পরিদর্শন করেছে সিআইডি’র তদন্ত টিম। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিভাগের সিআইডির এডিশনাল ডিআইজি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি টিম নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির সাথে কথা বলেন। এ সময় তারা নজরুলের পরিবারের খোঁজ খবর নেন এবং ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনেন। এর আগে সিআইডি’র তদন্ত টিম সাত জনের লাশ উদ্ধারের ঘটনাস্থল শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দর থানার কলাগাছিয়া ও অপহরণস্থল নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলেন।

র্যাব-১১ এ নতুন সিও

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিন র্যাব কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতির পর র্যাব-১১ এ নতুন অধিনায়ক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নতুন দায়িত্ব পাওয়া এই কর্মকর্তা হলেন- লেফটেন্যান্ট কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান। তিনি রাজশাহীতে র্যাব-৫ এর অধিনায়ক ছিলেন। র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে এ সংক্রান্ত অর্ডার হয়। শুক্রবারই তিনি (সিও) র্যাব-১১ তে যোগ দিয়েছেন।

এর আগে নিহতদের পরিবার এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ ও সেনা বাহিনীর মেজর আরিফ হোসেন এবং নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানার সম্পৃক্ততা আছে বলে অভিযোগ করে। এরপর তাদের নিজ বাহিনীতে ফেরত নেয়া হয়। পরে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়।

প্রসঙ্গত, তারেক সাঈদ মাহমুদ ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার দুদিন পর নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার, দুটি থানার ওসির পাশাপাশি র্যাবের ওই তিন কর্মকর্তাকেও প্রত্যাহার করা হয়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার পুলিশের ৮৫ কর্মকর্তাকে একযোগে নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলি করা হয়।

নিহতের পরিবারের সদস্যদের ডেকেছে তদন্ত কমিটি

নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় তদন্তের অংশ হিসেবে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন হাই কোর্টের নির্দেশে গঠিত প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির সদস্যরা। আজ শনিবার সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে তাদের নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আনিসুর রহমান গতকাল রাতে বলেন, নিহত সাতজনের পরিবারের সদস্যদেরই ডাকা হয়েছে। তবে কেউ না আসলে তাদের বাসায় গিয়ে কথা বলবেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। হাই কোর্টের নির্দেশের পর বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহজাহান আলী মোল্লাকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়।

আন্দোলন চলবে:পেশাজীবী পরিষদ

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত ৭ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি সমর্থিত সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তবে এক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা আন্দোলন করবেন না বলে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করেন। গতকাল সকালে নিহত আইনজীবী চন্দন সরকার ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে তারা এ ঘোষণা দেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক রুহুল আমিন গাজী, সদস্য সচিব ড্যাবের ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here