নির্বাচন সময় মতোই হবে :প্রধানমন্ত্রী

14

image_83141প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সময়মতোই সর্বদলীয় সরকারের অধীনে দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন হবে। বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দেশে ৬০ ঘণ্টার হরতাল প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ১৭ লাখ শিশু শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না। শিশুদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস ও কোমল মন ভেঙ্গে দেবেন না। আহূত হরতাল প্রত্যাহার করে লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রীকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিন।

আলোচনার দরজা খোলা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে তার আগে হরতাল প্রত্যাহার করতে হবে। বিরোধী দলীয় নেতাকে জাতির কাছে ওয়াদা করতে হবে আর হরতাল দিয়ে মানুষ খুন ও দেশের সম্পদ নষ্ট করবেন না। হরতালের নামে কেউ যাতে জানমালের ক্ষতিসাধন করতে না পারে সেজন্য প্রত্যেক এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী কমিটির মাধ্যমে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার জন্য আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

গতকাল রবিবার বিকালে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তৃতা করছিলেন। জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ এই জনসভার আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা সংলাপে সাড়া না দিয়ে মানুষ মারছেন। আবার হরতাল দিয়েছেন। তিনি (খালেদা) আর কত মায়ের বুক খালি করতে চান?

প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দেশে বলেন, ক্ষমতায় থাকতে তো দেশের কোন উন্নয়ন করেননি, করেছেন নিজেদের উন্নয়ন। নিজে চুরি করে কালোটাকা সাদা করেছেন, এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন। দুই পুত্রকে দিয়ে হাওয়া ভবনের মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। সেই অর্থ আমরা বিদেশ থেকে ফেরত এনেছি। নিজে উন্নয়ন করতে পারেননি বলে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত না করার জন্য তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় বিএনপির সিনিয়র নেতারা জড়িত ছিলেন বলেই ঘটনার দিন ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে পালিয়ে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন বর্তমান বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি সিএনএন অনলাইনে একটি রিপোর্টের কথা তুলে ধরে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৫২ দিনের মাথায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ওই বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সামরিক অফিসারসহ প্রায় ৭৩ জন প্রাণ হারান। ওই ৫৭ সামরিক অফিসারের মধ্যে ৩৩ জনই ছিল আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। বর্বরোচিত এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতারা যে জড়িত ছিল, বিপুল অর্থায়ন করেছে তা সিএনএনের প্রকাশিত রিপোর্টে বিশ্ববাসী জেনেছে। তিনি বলেন, এখন বিডিআর বিদ্রোহের মামলায় খুনীদের পক্ষে যেসব আইনজীবী আইনী লড়াই করছেন, তাদের অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াতের লোক। আসলে খুনীদের লালন-পালন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিই হচ্ছে তার (খালেদা জিয়া) রাজনীতি।

প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল, ক্ষমতায় আসলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে। আমরা ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছি। কিন্তু এসব কাজ পছন্দ নয় আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রীর। উল্টো এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, উনি ক্ষমতায় গেলে সব যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে দেবেন। স্বাধীন দেশে এর থেকে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে? শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতায় থাকতে তিনি (খালেদা জিয়া) খুনি, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রীকে আগের বার আলোচনার আহ্বান জানিয়ে ছিলাম। জবাবে উনি ৪ মে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বললেন এই সময়ের মধ্যে তিনি সরকারকে উত্খাত করবেন, আমি নাকি পালানোরও পথ খুঁজে পাব না। কই আমি তো এখনো বহাল তবিয়তেই আছি। আলোচনায় না এসে উনি জামায়াত ও হেফাজতকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাডার লেলিয়ে দিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদে আগুন দিলেন, শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা কোরআন শরিফ পোড়ায় তারা কিভাবে ইসলামের হেফাজত করবে। আর এদের নেত্রী হচ্ছেন খালেদা জিয়া। তাদের ধোঁকাবাজি ও ভাওতাবাজির রাজনীতি দেশবাসী ভালো করেই বুঝে গেছে।

দুই নেত্রীর মধ্যে ফোনালাপের প্রসঙ্গে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক চেষ্টার পর ফোন করে আমি তাকে (খালেদা জিয়া) পেলাম। হরতাল প্রত্যাখ্যান করে গণভবনে এসে আলোচনা করার আমন্ত্রণ জানালাম। উনি আমার কথা রাখলেন না। হরতাল করে ২০ জন মানুষকে হত্যা করলেন। বিরোধী দল আহূত আবারো ৬০ ঘন্টার হরতাল আহ্বানের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাল (সোমবার) ২১ লাখ ছাত্র-ছাত্রীর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা। উনি হরতাল দিয়ে এতো কমলমতি ছাত্র-ছাত্রীর লেখাপড়ার পথ বন্ধ করে দিলেন। অবশ্য বিরোধী দলীয় নেত্রী নিজে এসএসসি পাস করতে পারেননি। পরীক্ষা দিয়ে শুধু অংক আর উর্দুতে পাস করেন। উনি সরকারি কোষাগার থেকে টাকা নিয়ে দুই ছেলেকে কী শিক্ষা দিয়েছেন? পড়াশুনা নয় উনি ছেলেদের মানুষ হত্যা, গ্রেনেড মারা, হাওয়া ভবন খুলে ব্যবসার কমিশন খাওয়া আর বিদেশে অর্থ পাচার করা শিখিয়েছেন।

জনসভা শুরু হয় দুপুর আড়াইটায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিকাল সাড়ে চারটায় বক্তব্য দিতে শুরু করেন তখনও বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিলের স্রোত ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানমুখী। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল চত্বর ছাড়াও মত্স্যভবন থেকে শাহবাগ ঘুরে টিএসসি হয়ে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত পুরো এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্যে।

সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন দলের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, দলের সাধারণ সম্পাদক ও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজ, সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আহমদ হোসেন, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ, শ্রমিক লীগের সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাউছার, কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা, যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আখতার এমপি, ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার চেতনাকে সমুন্নত এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

আমির হোসেন আমু বিরোধী দলীয় নেত্রীর উদ্দেশে বলেন, হরতাল প্রত্যাহার করে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আলোচনায় বসুন। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকাকালে পরীক্ষার সময় কোন দিন হরতাল দেয়নি।

তোফায়েল আহমেদ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধী দলীয় নেত্রীর দেয়া প্রস্তাবকে অসাংবিধানিক ও অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি (খালেদা) যাদের নাম প্রস্তাব করেছেন, তাদের কেউ কেউ অসুস্থ, অনেকে আবার অপারগতা প্রকাশ করেছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, আলোচনা চাইলে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে আগে হরতাল প্রত্যাহার করতে হবে। বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রীর পাশে এখন জামায়াত-হেফাজত। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে নারী গৃহবন্দি হয়ে যাবে। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, হুমকি-হরতাল ও লাশের মুখে কোন সংলাপ হতে পারে না। জাহাঙ্গীর কবির নানক বিরোধী দলের ডাকা ৬০ ঘণ্টার হরতাল প্রত্যাখ্যান করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here