‘নির্বাচন করতে পারবে না জামায়াত’

11

ec
বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ বলে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি গত শনিবার প্রকাশিত হয়।

নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ জানিয়েছেন, উচ্চ আদালত জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করায় আপাতত তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।’নির্বাচন করতে পারবে না জামায়াত’

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনে কার্যালয়ে সাংবাদিকদের একথা জানান এই কমিশনার।

উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেন, “কমিশনে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ায় তারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।”

গতকাল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে দেওয়া রায়ের কপি নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে পৌঁছেছে। এ বিষয়ে শিগগির সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি গত শনিবার প্রকাশিত হয়।

এর আগে গত ১ আগস্ট বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন।

নির্বাচন কমিশন ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতকে অস্থায়ী নিবন্ধন দেয়। এই নিবন্ধনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে তরিকত ফেডারেশনের তৎকালীন মহাসচিব রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ ২৫ জন।

হাইকোর্টের রায়ের পর নির্বাচন কমিশন বলেছিল, কপি হাতে পাওয়ার পর তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেবে।

নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেন, “গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী কমিশনের নিবন্ধন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে না। জামায়াতের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে।”

তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন সম্পর্কিত মামলার রায় গত আগস্ট মাসে দেয়া হয়েছে। রায়ের পর কমিশনের সিদ্ধান্ত কমিশনের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে।”

‘নির্বাচন করতে পারবে না জামায়াত’
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর’ পরিচিতি অংশের স্ক্রিনশট
এরইমধ্যে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশে ‘বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর’ পরিচিতি অংশে বলা হয়েছে, “মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক রিট পিটিশন নং ৬৩০/২০০৯ এর উপর ০১ আগস্ট ২০১৩ তারিখে প্রদত্ত রায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত হয়েছে।”

এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেন, “কমিশনের নিবন্ধনের তালিকা থেকে জামায়াতের নাম মুছে ফেলা হয়নি। এতে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।”

নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে জামায়াতকে লিখিতভাবে না জানানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জামায়াত উচ্চ আদালতে তাদের নিবন্ধন সম্পর্কিত মামলাটি নিজেরাই পরিচালনা করেছে। সে জন্য মামলার রায় সম্পর্কে তারা অবগত রয়েছে। তাই তাদের লিখিতভাবে নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি জানানো হয়নি।”

উল্লেখ্য, পাকিস্তানে দুইবার নিষিদ্ধ এবং ভারতে চারবার সাময়িক নিষিদ্ধ হয় জামায়াত। বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে ‘৭৭ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল জামায়াত। ১৯৮৬ সালে প্রথম বাংলাদেশে নির্বাচনে অংশ নেয় জামায়াত।

প্রেক্ষাপট: রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে ইসি’র দেওয়া নিবন্ধনের বৈধতা নিয়ে ২০০৯ সালে হাইকোর্টে রিট করেন বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী ও জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফসহ ২৫ জন।

রিট আবেদনের পর একই বছর ২৭ জানুয়ারি প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেছিলেন।

রুলে রাজনৈতিক দল হিসেবে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০ বি(১)(বি)(২) ও ৯০(সি) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

বিবাদী জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবসহ চারজনকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে রুলটি আর একটি বেঞ্চে নিয়ে যাওয়া হলে এখতিয়ার পরিবর্তন হওয়ায় আর শুনানি হয়নি।

নিবন্ধন নিয়ে রুল জারির পর ওই বছরের ডিসেম্বরে একবার, ২০১০ সালের জুলাই ও নভেম্বরে দুইবার এবং ২০১২ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে দুইবার তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয় জামায়াত।

এসব সংশোধনীতে দলের নাম ‘জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ’ পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ করা হয়। সম্প্রতি সারাদেশে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি জোরালো হয়ে ওঠায় আবেদনকারীরা আবারও মামলাটি শুনানির জন্য নিয়ে আসেন। তারা প্রধান বিচারপতির কাছে বেঞ্চ গঠনের আবেদন জানান।

পরে প্রধান বিচারপতি ৫ মার্চ বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেনের নেতৃত্বে দ্বৈত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। সাংবিধানিক ও আইনের প্রশ্ন জড়িত থাকায় বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে আবেদনটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর আদেশ দেন দ্বৈত বেঞ্চ। পরে প্রধান বিচারপতি তিন বিচারপতির সমন্বয়ে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন।

গত ১১ এপ্রিল জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়। ওই দিন আদালতে হলফনামা আকারে ইসির জবাব দাখিল করা হয়। পরে ১৮ এপ্রিল রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি শেষ করেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। আর গত ২৫ এপ্রিল শুনানি শেষ করেন ইসির আইনজীবী মহসীন রশীদ।

এরপর ২২ মে থেকে জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, বেলায়েত হোসেন ও অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার। গত ১২ জুন পর্যন্ত মোট ৯ দিন জারি করা রুলের ওপর শুনানি শেষ হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here