নিজাম হাজারীর নামেই অপারেশন।পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া একরামের স্টিল ছবি দেখে আবিদ কাঁদতে শুরু করে নিজের বিচার দাবি করেন

16

ekram3

 

  নিজাম হাজারীর অপারেশন’- এ কথা বলে ঘটনার দিন দলের  

   কর্মীদের বিলাসী সিনেমা হলের সামনে হাজির হতে বলে 

   একরাম   হত্যা মামলায় গ্রেফতার আবিদুল ইসলাম ওরফে 

   আবিদ। কিলিং মিশনে যারা জড়ো হয়েছিল, তাদের অনেকের সঙ্গে আবিদের মোবাইল ফোনে কথোপকথনের তথ্য পেয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা। আবিদের মা নায়লা জেসমিন বড়মণি ফেনী জেলা মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক। আবিদ নিজাম হাজারীর মামাতো ভাই। নিজাম হাজারীর নামেই অপারেশন আয়োজন

 

‘নিজাম হাজারী’র নাম শুনেই কর্মীরা সেদিন আবিদের ডাকে সাড়া দিয়ে সিনেমা হলের সামনে আসে। তবে একরাম হত্যায় স্থানীয় এমপি নিজাম হাজারী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত- এমন প্রমাণ এখনও তদন্ত সংস্থার হাতে নেই।

মামলাটির তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মনে করছে, একরামকে দিনেদুপুরে লোমহর্ষকভাবে হত্যার নেপথ্যে রাঘববোয়ালরা জড়িত। তদন্তে যাদের নাম আসবে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এদিকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় গতকাল সন্ধ্যায় একরামুল হক একরাম হত্যার ‘পরিকল্পনাকারী’ জিহাদ চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে ফেনী থানা পুলিশ।

গত মঙ্গলবার ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরামকে দিনেদুপুরে ফেনী শহরে গুলি করে চাকু মেরে এবং আগুনে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামকে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত ছক তৈরি করেন ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল। হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে শহরের পেট্রোবাংলা এলাকায় তার বাসায় গোপন বৈঠক হয়। সেখানে হত্যা মিশনের সঙ্গে জড়িত জিয়াউল আলাম ওরফে মিস্টার, ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ওরফে জিহাদ চৌধুরী, ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি ও কাউন্সিলর আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ শিবলু, স্থানীয় ক্যাডার রাসেল, খোকন ও মামুন উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকেই একটি সাদা কাগজে হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা থাকবে- এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ছক তৈরি করে আদেল তা জিহাদ চৌধুরী ও শিবলুর হাতে তুলে দেন। এর পরই জিহাদ ও শিবলু ফেনীর সালাম কমিউনিটি সেন্টারে কিলিং মিশন নিয়ে দ্বিতীয় বৈঠক করেন। সেখানেই বিশ্বস্ত পাঁচ ক্যাডার রুটি সোহেল, আবিদ, কাজী শানান, সিফাত, সানী ও সৈকতকে পাঁচটি পিস্তল দেন জাহিদ। এদিকে হত্যা মিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনের সঙ্গে এমপির ফোনালাপ নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। কললিস্ট ধরে এমন তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। তবে সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ফোনালাপের ব্যাপারে জানার জন্য স্থানীয় এমপি নিজাম হাজারীর ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

গোয়েন্দা সূত্র  জানা যায়, গত মার্চ মাস থেকেই একরামকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। একাধিক দফায় তার ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এই দফায় একরামকে হত্যা করতে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল তার পেট্রোবাংলার বাসায় গোপন বৈঠক করে সবকিছু চূড়ান্ত করেন। ওই বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা সবাই স্থানীয় এমপি নিজাম হাজারীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তবে হত্যার আগের রাতে নিজাম হাজারী ফেনীতে ছিলেন না। তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।

তবে কিলিং মিশনে যারা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে এমপির ফোনালাপ হয়েছে। একটি দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সংস্থা এই ফোনালাপ ধরে এমপির সম্পৃক্ততার ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ নিচ্ছে। প্রয়োজনে তাকে ডেকে এ ঘটনার ব্যাপারে তদন্ত সংস্থা কথা বলবে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে এমপির বডিগার্ড রাসেল ও খোকনকে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র  জানায়, কয়েকটি ধাপে বিভক্ত হয়ে একরাম হত্যা-মিশন সফল করা হয়। সবচেয়ে ওপরের ধাপে যারা কিলিং মিশনের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা কখনোই মাঠ পর্যায়ের কিলারের মুখোমুখি হননি। মাঠ পর্যায়ের কিলারদের সঙ্গে মূলত যোগাযোগের দায়িত্বটি পালন করেন জিহাদ চৌধুরী ও শিবলু কমিশনার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা  জানান, একরাম হত্যায় যাদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে স্থানীয় এমপির ফোনালাপের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ওই ফোনালাপে একরাম হত্যার নীলনকশার ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত রয়েছে কি-না তা নিয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, একরাম হত্যার আগে-পরে বেশ কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির কথোপকথন গুরুত্ব সহকারে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

র‌্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ফেনীর ঘটনায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার আবিদসহ অন্যরা হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে সালাম কমিউনিটি সেন্টারে জিহাদ চৌধুরী ও শিবলুর সঙ্গে বৈঠকের কথা স্বীকার করেন। তবে জিহাদ ও শিবলু পেট্রোবাংলা এলাকায় বৈঠকের কথা জানাননি।

রিমান্ড মঞ্জুর এদিকে গতকাল ফেনী জুডিসিয়াল আদালতে একরাম হত্যার ঘটনায় ১৩ আসামিকে হাজির করা হলে আদালত তাদের মধ্যে ৯ জনের প্রত্যেককে ৮ দিন ও চারজনকে ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া ৯ জনকে রোববার রাতে ফেনী জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে র‌্যাব। এরপর পুলিশ ও সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ৯ জনকে রাত সাড়ে ১১টা থেকে শুরু করে রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাদের পৃথক কক্ষে রেখে জিজ্ঞাসা করা হয়। এ সময় আবিদুল ইসলাম আবিদ, কাজী শানান মাহমুদ, জাহিদ হোসেন, জাহিদুল ইসলাম সৈকত, শাহজালাল শিপন, চৌধুরী মোহাম্মদ অনিক, সাজ্জাদুল ইসলাম পাটোয়ারী শিপাত ও হেলাল উদ্দিন পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আবিদ জানান, ঘটনার দিন সকালে ৫০-৬০ জনকে মোবাইল ফোনে তিনি একাডেমির বিলাসী সিনেমা হলের সামনে আসতে বলেন। যুবকদের ‘নিজাম হাজারীর’ আপারেশন বলে আসতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কারণ যুবকদের স্বাভাবিকভাবে ধারণা, নিজাম হাজারীর যে কোনো অপারেশনে থাকলে বিপদ হবে না। প্রশাসনও পক্ষে থাকবে।

জিজ্ঞাসাদের সময় প্রত্যেক আসামিকে নিহত উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরামের পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া স্টিল ছবি দেখানো হয়। এই ছবি দেখে আবিদুল ইসলাম আবিদ কাঁদতে শুরু করেন। এ সময় নিজের বিচার দাবি করেন আবিদ।

জিহাদ চৌধুরী গ্রেফতার: ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যার ‘পরিকল্পনাকারী’ জিহাদ চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিহাদকে রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের ভেতর তাকে গ্রেফতার করা হয়। বাহিরীপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় একটি সিএনজি অটোরিকশা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছেন ফেনী থানার ওসি মাহবুব মোর্শেদ।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার এ হত্যাকা ে জড়িত সাতজন জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ নেতা জিহাদ ও শিবলু কমিশনারের পরিকল্পনায় তারা একরামকে খুন করেন। শহরের যে এলাকায় একরামের ওপর হামলা হয়, শিবলু ওই এলাকার কাউন্সিলর এবং জিহাদের বাসাও একই এলাকায়। গত শনিবার ফেনী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন শিবলু। কয়েক মাস আগে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে জিহাদকে বহিষ্কার করেছিলেন একরাম, তবে এককভাবে নেওয়া তার ওই সিদ্ধান্ত পরে প্রত্যাহার করা হয়।

একরাম হত্যাকারীর বাড়িতে আগুন: ফুলগাজীর বসন্তপুর গ্রামের একরাম হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া আসামি আলমগীর হোসেনের বাড়িতে বোরবার দুপুরে একরাম সমর্থকদের একটি দল আগুন ধরিয়ে দেয়। ফেনীর এএসপি সার্কেল সামছুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আগুন দেওয়া হলেও বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। স্থানীয়রা আগুন নিভিয়ে ফেলে।

উপজেলা চেয়ারম্যানদের মানববন্ধন: উপজেলা চেয়ারম্যানদের সংগঠন রোববার দুপুরে ফেনী শহরের ট্রাংক রোডে একরাম হত্যার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে আধা ঘণ্টার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, সোনাগাজীর চেয়ারম্যান কামরুল আনাম, পরশুরামের চেয়ারম্যান কামাল মজুমদার, দাগনভূঞার চেয়ারম্যান রতন প্রমুখ। বিকেলে উপজেলা চেয়ারম্যান সমিতি ফেনীর এলজিইডি ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ফেনী পুলিশ প্রশাসনের পক্ষে একরাম হত্যার তদন্ত সম্ভব হবে না। হত্যাকারীদের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র রয়েছে। ডিবি অথবা সিআইডির কাছে তদন্ত হস্তান্তরের দাবি জানান তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here