নিজামী-সাঈদীর মামলার রায় আগামী সপ্তাহে

24

saidi nezamiমানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সিনিয়র নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় আগামী সপ্তাহে ঘোষণা হতে পারে। গত ২৪ মার্চ নিজামীর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। অন্যদিকে সাঈদীর আপিল মামলা গত ১৬ এপ্রিল রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। এ দুটি রায় নিয়ে দেশবাসী উদ্বিগ্ন। রায়ের পর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নাশকতা করার পরিকল্পনা এঁটেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কড়া নিরাপত্তার উদ্যোগ নিচ্ছে।

জানা গেছে, আগামী সোম কিংবা মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হতে পারে। অন্যদিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়টিও আগামী সপ্তাহেই ঘোষণা করতে পারে আপিল বিভাগ। রায় ঘোষণার আগে এবং পরে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেবে সরকার।

গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর রায়ের পর ‘সাঈদীকে চাঁদে দেখা যায়’ গুজব ছড়িয়ে সারাদেশে তাণ্ডব সৃষ্টি করে জামায়াত। ওই সময় সংখ্যালঘু হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় সবচেয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় জামায়াত।

এবারও এ দুটি রায় ঘোষণার পর একই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জামায়াত।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান বর্তমানকে বলেন, ‘দেশবাসীর ন্যায় আমরাও এ দুটি রায় নিয়ে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার মধ্যে রয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, কবে রায় দেবে তা ঠিক করবে আদালত। তবে আশা করছি, একটা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে রায় পাওয়া যাবে। মাওলানা সাঈদীর রায় সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রধান বিচারপাতির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগের বিশেষ বেঞ্চ গত ১৬ এপ্রিল যে কোনো দিন রায় ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই রায় ঘোষণা করা হবে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ হায়দার আলী বর্তমানকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ২৪ মার্চ মতিউর রহমান নিজামীর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখেন। আশা করেছিলাম, গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য দিনের কার্যসূচিতে রাখবেন। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক এটা হয়নি। আশা করছি, আগামী সপ্তাহে রায় ঘোষণা করা হবে।’

এদিকে জামায়াতের নেতা ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে প্রহসন করা হচ্ছে। এ রায় মেনে নেয়া যায় না। রায়ে সাজা হলে এ রায় আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না।’ অন্যদিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী পিরোজপুরে এক সমাবেশে অতি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, ‘আমার বাবা নিরপরাধ। নিরপরাধ ব্যক্তিকে সাজা দিলে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’ তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের প্রাণ উত্সর্গের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘নেতাকর্মীদের জীবন দিতে প্রস্তুতি নিতে হবে।’

জানা গেছে, সাঈদী ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি মারমুখী জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির। শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতারা ইতিমধ্যেই সারাদেশে কর্মী সম্মেলন, আলোচনা সভা, প্রতিনিধি সম্মেলন করছেন। এসব সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাঈদীর রায় ঘোষণার পর সক্রিয় প্রতিরোধ। শিবির নেতারা এখন দেশের বিভিন্ন জেলায় সফর করছেন। এসব সফরে ও আলোচনা সভায় তারা প্রচার করছেন বিচারের নামে প্রহসন করে বাংলাদেশের বুক থেকে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনকে শেষ করে দিতে চায় আওয়ামী লীগ। সাঈদীকেও হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ইসলামপ্রিয় জনতাকে এই ষড়যন্ত্র রুখতে হবে। শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী সরকার বিচারের নামে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি শুধু এ দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা নন, বরং তারা বিশ্বের কোটি কোটি ইসলামপ্রিয় মানুষের হূদয়ের স্পন্দন।’ জামায়াত ও শিবির নেতাদের এসব বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, এ দুটি রায় হলে তারা মরণপণ আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নিজামীর মামলার সর্বশেষ অবস্থা: গত ২৪ মার্চ জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় অপেক্ষমাণ রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মামলাটির তৃতীয় দফা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে যেকোনো দিন এ রায় ঘোষণা করা হবে বলে জানান।

২৪ মার্চ যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোহাম্মদ আলী নিজামীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে বলেন, ‘নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো আমরা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।’ অন্যদিকে আসামিপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিজামীর বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।’

গত ১০ থেকে ১২ মার্চ এবং রবিবার ও সোমবার নিজামীর বিরুদ্ধে ৫ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, মোহাম্মদ আলী ও সৈয়দ হায়দার আলী। অন্যদিকে গত ১৩ মার্চ থেকে রবিবার পর্যন্ত ৫ কার্যদিবসে নিজামীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও মিজানুল ইসলাম। গত ২৪ মার্চ তৃতীয়বারের মতো মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। উভয়পক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও জেরা শেষে গত বছরের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর প্রথবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা। এরপর ৭ নভেম্বর থেকে চারদিন আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য থাকলেও নিজামীর আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালে আসেননি। ফলে ১৩ নভেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সমাপ্ত বলে ঘোষণা দিয়ে রায় যেকোনো দিন দেয়া হবে বলে আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের লিখিত যুক্তিতর্ক জমা দিতে বলা হয়। এরপর ১৪ নভেম্বর আসামিপক্ষ ট্রাইব্যুনালের আদেশ পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ চাইলে ১৭ নভেম্বর থেকে দ্বিতীয়বার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় দেন ট্রাইব্যুনাল। ২০ নভেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে নিজামীর মামলার রায় দ্বিতীয়বারের মতো অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১। কিন্তু রায় দেয়ার আগেই গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর তিনি অবসরে চলে যান। এরপর থেকে প্রায় দুইমাস ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠন না হওয়ায় নিজামীর মামলাসহ পাঁচ মামলার কার্যক্রম শুধু তারিখ পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ৫৪ দিন পর চেয়ারম্যানের পদে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে নিয়োগ দেয় সরকার। নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন। সেদিনই নতুন করে যুক্তিতর্ক শোনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ১০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর উভয়পক্ষ তৃতীয়বারের মতো যুক্তিতর্ক শেষ করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষ। এতে তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, খুন, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬ অভিযোগ আনা হয়। ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

সাঈদীর মামলার সর্বশেষ অবস্থা: জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল মামলার যুক্তিতর্ক শেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত ১৬ এপ্রিল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের এই নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে মামলায় খালাস চেয়ে আপিল দায়ের করেন সাঈদী। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ হওয়া অভিযোগে সাজা চেয়ে আপিল করেন। উভয়পক্ষের আপিলের শুনানি গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর শুরু হয়। দীর্ঘ ৪৯ কার্যদিবস শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন আপিল বিভাগ। সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগের বিশেষ বেঞ্চ এই মামলাটির শুনানি করেন।

এর মধ্য দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্বিতীয় মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ায় রায় অপেক্ষাধীন রাখা হয় গত ১৬ এপ্রিল। এর আগে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রেও রায় অপেক্ষাধীন রাখেন আপিল বিভাগ। পরে ট্রাইব্যুনালের দেয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ বাড়িয়ে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। ইতিমধ্যেই কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে ২০ অভিযোগের মধ্যে ৮ (ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা) ও ১০ নম্বর (বিশাবালী হত্যা) অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আরও ৬টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও কোনো শাস্তি দেয়নি ট্রাইব্যুনাল।

সাঈদীর ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর জামায়াতের প্রতিক্রিয়া: গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর রায় ঘোষণা হলে সারাদেশে জামায়াত তাণ্ডবের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় তাদের তাণ্ডবের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ওই সময়ে কয়েক দিনের সহিংস ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারায়। অনেক হিন্দুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। তাত্ক্ষণিকভাবে র্যাব-পুলিশ মাঠে নামলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পরে সহিংস জেলাগুলো যৌথ বাহিনী কম্বিং অপারেশন চালায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here