নিজামী বাবরসহ ১৪ জনের ফাঁসি

32

nb

নিজামী বাবরসহ ১৪ জনের ফাঁসি
নিজামী বাবরসহ ১৪ জনের ফাঁসি
নিজামী বাবরসহ ১৪ জনের ফাঁসি
নিজামী বাবরসহ ১৪ জনের ফাঁসি

বাবর ও নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ যেভাবে

নিজামী নীরব, বাবরের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

নিজামী বাবরসহ ১৪ জনের ফাঁসি

রায় ঘোষণার আগে বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি পর্যালোচনা করে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, দশ ট্রাক অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী উলফার জন্য আনা হয়েছিল। দেশের দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে উলফা, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং পাকিস্তানের আগা রহমান ইউসুফ গ্রুপের (এআরওয়াই গ্রুপ) যোগাযোগ ছিল—সেটাও সাক্ষ্যপ্রমাণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, এনএসআই-এর দুই সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা’র সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ুয়াসহ ১৪ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও তাদের প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছে আদালত। অস্ত্র চোরাচালানের অভিযোগে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ বি (১) (বি) ধারায় গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। একই আদালত দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় দায়ের করা পৃথক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৪ আসামিকে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনের ১৯ এ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। একই মামলায় আসামিদের প্রত্যেককে ১৯ সি ও ১৯ এফ ধারায় ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় উভয় মামলায় মোট ৫৪ আসামির মধ্যে ৩৬ জনকে আদালত বেকসুর খালাস দিয়েছে। মামলার অপর ৪ আসামি ইতিমধ্যে মারা গেছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন—এনএসআইয়ের সাবেক পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাবুদ্দিন আহমেদ, সাবেক উপ-পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর লিয়াকত হোসেন, সাবেক মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন, সিইউএফএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসিন উদ্দিন তালুকদার, সাবেক জিএম (প্রশাসন) একেএম এনামুল হক, সাবেক শিল্প সচিব নুরুল আমিন, চোরাচালানি হাফিজুর রহমান হাফিজ, অস্ত্র খালাসের জন্য শ্রমিক সরবরাহকারী দীন মোহাম্মদ ও বোট মালিক হাজী সোবহান।

রায় ঘোষণার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৪ আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত উলফার সামরিক প্রধান পরেশ বড়ুয়া ও সাবেক শিল্প সচিব নুরুল আমিন পলাতক রয়েছেন।

রায় ঘোষণার পর সিইউএফএল-এর সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এনামুল হক কাঠগড়াতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। বিচারক এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার ১৫ মিনিট পর আসামিদের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিল করেন। রায় ঘোষণা উপলক্ষে গতকাল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, আদালত ভবনসহ সংলগ্ন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনি গড়ে তোলা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

রায় প্রদানের জন্য বিচারক এসএম মুজিবুর রহমান গতকাল দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে এজলাসে আসেন। মাত্র ২৩ মিনিটে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার পর তিনি এজলাস ত্যাগ করেন। রায় ঘোষণার আগে বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, সাক্ষীদের দেয়া সাক্ষ্য প্রমাণ এবং আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দী পর্যালোচনা করে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, দশ ট্রাক অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী উলফার জন্য আনা হয়েছিল। দেশের দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে উলফা, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং পাকিস্তানের আগা রহমান ইউসুফ গ্রুপের (এআরওয়াই গ্রুপ) যোগাযোগ ছিল—সেটাও সাক্ষ্যপ্রমাণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এ মামলায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না উল্লেখ করে বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, আমি যে সাক্ষ্য প্রমাণ পেয়েছি তা পর্যালোচনা করে দেখেছি এ মামলায় কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা সকলেই ছিলেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপক্ষ যে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন তা বিশ্বাসযোগ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ

রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী চট্টগ্রাম মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট। আমরা ন্যায় বিচার পেয়েছি।’ মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মামলায় আসামিপক্ষ সব সময় রাজনৈতিক কারণের কথাই বলবেন। তারা কখনোই বলবেন না যে তারা দোষ করেছেন। আবার খালাস পেলে বলতেন যে ন্যায় বিচার পেয়েছেন।’ তিনি বলেন, যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের সবাই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোক। তাই এ মামলাকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বলা ঠিক হবে না।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোবারক শাহ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এ মামলায় মতিউর রহমান নিজামীকে শাস্তি দেয়ার কোনো উপাদান নেই। শুধু রাজনৈতিক কারণে তাকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে এ সাজা দেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দশ ট্রাক অস্ত্র সিইউএফএল এলাকার বাইরে ধরা পড়েছে। ওই ঘাট সকলের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে তার দায় মন্ত্রীর ওপর চাপানো নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ।’ মোবারক শাহ বলেন, ‘রায়ের অনুলিপির জন্য আবেদন করেছি। অনুলিপি পাওয়ার পর এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করবো।’

মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিমের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সাজ্জাদ বলেন, ‘দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা একটি হাই প্রোফাইল রাজনৈতিক মামলা। তাই এটি হাই প্রোফাইল জাজমেন্ট।’ তিনি বলেন, ‘প্রভু রাষ্ট্রকে খুশি করার জন্যই এ রায় দেয়া হয়েছে। এ রায় ন্যায়-নীতি ও আইন বহির্ভূত।’

ঠিকাদার দীন মোহাম্মদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তারেক বলেন, ‘যে ৭টি বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করার জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালত থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সঠিকভাবে বিষয়গুলো তদন্ত করা হয়নি। আলামতও নেই। মালামাল জব্দকারী তত্কালীন চট্টগ্রামের জিওসি ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদেরও সাক্ষ্য নেয়া হয়নি।’

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা দায়েরের সময় চট্টগ্রাম মহানগর পিপির দায়িত্ব পালনকারী অ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের পুরো কৃতিত্ব তত্কালীন চারদলীয় জোট সরকারের। কিন্তু দেশে ওয়ান-ইলেভেন আসার পর মামলাটির রাজনীতিকরণ করা হয়েছে।

খালাস পেলেন যারা

মামলায় খালাসপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- সানোয়ার হোসেন চৌধুরী, দিলদার হোসেন চৌধুরী, মরিয়ম বেগম ওরফে বদনি মেম্বার, জসীম উদ্দিন ওরফে জসীম, আব্দুল আজিজ, মো. আকতার, মো. জাহাঙ্গীর, নূরুল আবছার ওরফে আবছার মেম্বার, আরজু মিয়া প্রকাশ পাগলা, এজাহার মিয়া, মুজিবুর রহমান ভুলু, শেখ মোহাম্মদ, ফজল আহাম্মদ চৌধুরী, আকবর আলী, বাদশাহ মিয়া, ওসমান মিস্ত্রি, আব্দুল মান্নান, কবির আহাম্মদ, মো. রফিক, মনির আহাম্মদ, আব্দুল মালেক, মঞ্জুরুল আলম, সালেহ জহুর প্রকাশ গুরা মিয়া, ফিরোজ আহম্মদ, সাইফুদ্দিন, কামাল মিয়া, প্রদীপ কুমার দাশ প্রকাশ ব্রজগোপা, নূরনবী, সিরাজুল ইসলাম, হেলাল উদ্দিন, বাবুল মিয়া, আব্দুর রহিম মাঝি, আব্দুস সবুর, মো. শাহআলম, মো. সোবহান ও শাহজাহান। উল্লেখ্য, শেষোক্ত ১০ জন পলাতক অবস্থায় খালাস পেয়েছেন। বাকিরা জামিনে রয়েছেন।

ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণকারী চার আসামি হলেন ইয়াকুব আলী, মুনীর আহমেদ, আতাউর রহমান ও আবুল কাশেম মধু।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৪ জনের ১১জনই অধিকতর

তদন্তের পর আসামি হয়

গতকাল রায়ে যে ১৪ জনকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে তাদের মধ্যে দ্বীন মোহাম্মদ, হাজী সোবহান ও হাফিজুর রহমান ছাড়া বাকি ১১ জনকেই ২০০৭ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে করা মামলার অধিকতর তদন্তের পর দেয়া সম্পূরক চার্জশিটে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর আগে ২০০৪ সালের ৩ এপ্রিল মামলা দায়েরের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে একবার চার্জশিট ও পরে একবার সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে মামলার তত্কালীন তদন্ত কর্মকর্তারা। প্রথমোক্ত তিনজন এসব চার্জশিটে আসামি হিসেবে ছিলেন। ২০০৭ সালের ২০ নভেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর পিপি হুমায়ুন কবির রাসেলের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত মামলার অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। প্রায় সাড়ে ৩ বছর ধরে তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২৩ জুন অধিকতর তদন্তের রিপোর্ট দেয়া হয়।

বাবর ও নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ যেভাবে

 

জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামী শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউএফএল) জেটিতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাস হয়। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে নির্লিপ্ত ছিলেন বলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তে উল্লেখ করেন। আবার তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা লুত্ফুজ্জামান বাবর অস্ত্রের চালান আটকের সময় ঘটনাস্থল থেকে আসামিকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশের পাশাপাশি তদন্তে প্রভাব সৃষ্টি করেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের দুই মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ সকল অভিযোগ সাক্ষীগণ দিয়েছেন। তাছাড়া তাদের মামলায় আসামি করার পেছনে তাদের এমন ভূমিকার পাশাপাশি উভয়ই দশ ট্রাক অস্ত্র খালাসের বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন বলে আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ও চট্টগ্রাম মহানগর পিপি এডভোকেট কামাল উদ্দিন আহমদ আদালতে বলেছিলেন, লুত্ফুজ্জামান বাবর অস্ত্র খালাসের সময় এনএসআই’র কর্মকর্তা লিয়াকতকে ছেড়ে দেয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঘটনা ধামাচাপা দিতে নিজামী যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তাতে এটাই প্রমাণিত হয় তাদের জ্ঞাতসারেই অস্ত্রগুলো এসেছিল এবং সেগুলো খালাস হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী জেনেও এটা প্রতিহত করেননি, এটাই অপরাধ। আবার তারা অনেককে রক্ষার চেষ্টা করেছেন।

নিজামীর বিরুদ্ধে তত্কালীন শিল্প সচিব ড. শোয়েব আহমেদ ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)’র তত্কালীন চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ইমামুজ্জামান বীর বিক্রম ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে সাবেক শিল্প সচিব শোয়েব আহমেদ সাক্ষী দেন। ২৫ জানুয়ারি আসামি পক্ষের জেরায় তিনি বলেন, সিইউএফএল জেটিতে অস্ত্র খালাসের ঘটনা জেনে তিনি মন্ত্রীর নিকট করণীয় জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি আমি আপনাদের আগেই শুনেছি। এ ব্যাপারে আমাদের কিছুই করার নেই। এ বিষয়ে হাইয়েস্ট অথরিটি অবগত আছেন। বিষয়টি তদন্তের জন্য অনুরোধ করলে মন্ত্রী তাকে ধমক দিয়ে বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে। প্রধানমন্ত্রী অবগত আছেন। আপনাদের আলাদাভাবে তদন্ত করতে হবে কেন? একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি বিসিআইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ইমামুজ্জামান আদালতে সাক্ষ্য প্রদানকালে বলেন, তিনি শিল্পমন্ত্রীর সাথে দেখা করে বলেন, যেহেতু ১০ ট্রাক সিইউএফএল জেটিতে খালাস হয়েছে তাই শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করলে ভাল হয়। কিন্তু তিনি কোন জবাব দেননি। মতিউর রহমান নিজামীকে ২০১১ সালের ৪ মে আদালতের নির্দেশে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়।

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির আহবায়ক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ওমর ফারুক ২০১২ সালের ২৪ মে আদালতে সাক্ষ্যদানকালে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির সময় তদন্তে পাওয়া বিভিন্ন বিষয় যেমন এনএসআই’র গুটিকয়েক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরকে অবহিত করা হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তা প্রতিমন্ত্রী করতে দেননি।

তদন্ত কমিটির অপর সদস্য ও সাবেক ডিআইজি ফররুখ আহমদ ২০১২ সালের ৩ জুলাই আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে বলেন, এনএসআই কর্মকর্তা আকবর ও চোরাচালানী হাফিজুর রহমান অস্ত্র পরিবহনে ট্রাক ভাড়া করার কথা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরকে জানানো হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক কিছুতেই জাতীয় স্বার্থ জড়িত থাকে। আপনাদের বুঝে শুনে তদন্তের কাজ করতে হবে। একইভাবে পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইজি সামসুল ইসলাম, সিএমপি’র কমিশনার এসএম সাব্বির আলী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেন।

নিজামী নীরব, বাবরের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

 

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১১টায় কারাগারে আটক ১১ আসামিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। অন্য আসামিরা কাঠগড়ায় প্রবেশ করলেও মতিউর রহমান নিজামী ও লুত্ফুজ্জামান বাবর আইনজীবীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে গিয়ে বসেন। এসময় কয়েকজন আইনজীবী প্রতিবাদ করলে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা বলেন, উনারা অসুস্থ। বিচারক এজলাসে আসার পর তারা কাঠগড়ায় প্রবেশ করবেন। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান এজলাসে বসার কিছু সময় আগে এ দু’জন হাই প্রোফাইল আসামিকে কাঠগড়ায় প্রবেশ করানো হয়।

বিচারক বহুল আলোচিত এ মামলার রায় প্রদান করার সময় জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীসহ অন্য আসামিরা অনেকটাই নির্বিকার ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকলেও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরকে অত্যন্ত সরব ভূমিকায় দেখা যায়। তিনি চিত্কার করে আদালতের উদ্দেশে নানা রকম মন্তব্য করতে থাকেন। তিনি রায়ের প্রতিবাদ করে আদালতকে বলেন, ‘এ রায় অন্যায়ভাবে দেয়া হয়েছে। আমরা কোনো অপরাধ করিনি। আপনি সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষদেরকে সাজা দিচ্ছেন। আপনি ভুল রায় দিচ্ছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সব কিছু দেখছেন। তিনি আপনাকে ক্ষমা করবেন না। আমাদেরকে যেভাবে বিনা অপরাধে সাজা দিচ্ছেন, আপনার সন্তানকেও এভাবে একদিন বিনা অপরাধে সাজা পেতে হবে।’

রায় ঘোষণার পর কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মতিউর রহমান নিজামী বলেন, ‘অস্ত্র আনা অথবা চোরাচালান কোনোটার সাথেই আমি জড়িত ছিলাম না। এখানে বাইরের কয়েকটি রাষ্ট্র জড়িত। আমাকে অন্যায়ভাবে সাজা দেয়া হয়েছে। তবে আমি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করবো না। যা বলার আমার আইনজীবী বলবেন।’

মামলার অন্যতম আসামি হাজী সোবহান জামিনে থাকায় গতকাল প্রথমে আদালতে হাজির হয়ে কাঠগড়ার ভেতরে প্রবেশ করেননি। তবে রায় ঘোষণার আগে আদালত হাজী সোবহানকে কাঠগড়ায় প্রবেশ করার নির্দেশ দেন। রায়ে আদালত অপর আসামিদের সাথে তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়।

রায় ঘোষণা শেষে আদালতে নেয়ার সময় মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীকে কান্না করতে দেখা যায়। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি সাজানো রায়। আমার কিছু বলার নেই। ৫ সদস্যের যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল সেই কমিটিতে আমিও ছিলাম, ওমর ফারুকও (সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব) ছিল। কিন্তু পরে ওমর ফারুককে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ানো হয়।’

গ্রেফতার ও চাকরি হারান পুলিশের দুই সার্জেন্ট

অস্ত্র ধরিয়ে দেয়ার খেসারত

চট্টগ্রাম সিইউএফএল জেটিঘাটে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরিয়ে দেয়ার খেসারত দিতে হয়েছিল পুলিশের দুই সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও হেলালউদ্দিন ভুঁইয়াকে। ঘটনার পরপর তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ। কিন্তু এটা ছিল পুরোপুরি লোক দেখানো। পরে তাদেরকে সুকৌশলে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছিল অস্ত্র মামলায়। দীর্ঘ ২৭ মাস জেল খাটার পর ২০০৭ সালের ১৩ নভেম্বর কারাগার থেকে তারা মুক্তি পান। আর চাকরি ফিরে পান ৬ বছর পর। সার্জেন্ট হেলালউদ্দিন ভুঁইয়া বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত। আর সার্জেন্ট আলাউদ্দিন পদোন্নতি পেয়ে ইন্সপেক্টর হয়েছেন। তিনি কর্মরত ঢাকায় সিকিউরিটি এন্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়নে (এসপিবিএন)। ঘটনার সময় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ছিলেন সার্জেন্ট আলাউদ্দিন এবং পতেঙ্গা থানার কয়লা ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ছিলেন হেলালউদ্দিন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ১০ ট্রাক অস্ত্র চালান রায় ঘোষণার পর টেলিফোনে এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তারা রায় সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেননি। তবে বলেছেন, অস্ত্র চালান ধরিয়ে দেবার অভিযোগে তাদের উপর চালানো হয়েছিল অমানুষিক নির্যাতন।

সার্জেন্ট হেলালউদ্দিন বলেন, ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময় আলাউদ্দিন ও আমাকে সিএমপি থেকে বদলি করা হয় ডিএমপিতে (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ)। আমার পোস্টিং সদরঘাট পুলিশ ফাঁড়িতে আর আলাউদ্দিনের পোস্টিং ডিএমপি ট্রাফিক উত্তর বিভাগে। ডিএমপিতে যোগদান করার পর আমরা যথারীতি দায়িত্ব পালন করতে থাকি।

তিনি বলেন, ২০০৫ সালের ১৯ আগস্ট রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় দায়িত্বপালন করছিলাম। সেখান থেকে আমাকে ডেকে নেয়া হয় মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) দফতরে। বার বার জানার চেষ্টা করি, কেন আমাকে ডেকে আনা হয়েছে। কিন্তু কেউ কোন কথা বলেননি। পরে নিয়ে যাওয়া হয় র্যাব সদর দফতরে। র্যাব সদর দফতরে গিয়ে দেখি আমার আগেই সেখানে ডেকে আনা হয়েছে সার্জেন্ট আলাউদ্দিনকে। র্যাব সদর দফতরে নেয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদের নামে আমাদের উপর চলতে থাকে নির্যাতন। পরে র্যাব সদর দফতর থেকে পাঠানো হয় চট্টগ্রামস্থ র্যাব-৭ দফতরে। সেখানে নেয়ার পর চলতে থাকে দফায় দফায় নির্যাতন। নির্যাতনে আমার ডান পা ভেঙ্গে যায়।

হেলালউদ্দিন বলেন, তখনও আমরা জানতে পারিনি আমাদের বিরুদ্ধে আসল অভিযোগটা কী। পরে র্যাব-৭ থেকে পাঠানো হয় নোয়াখালীতে। নোয়াখালী থানায় আমাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় অস্ত্র মামলা। মামলার অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার চালান থেকে আমরা নাকি ২টি একে-৪৭ রাইফেল সরিয়েছি। যা র্যাব উদ্ধার করেছে। কিন্তু এ অভিযোগ ছিল ডাহা মিথ্যা। কারণ ১০ ট্রাক অস্ত্র চালানের মধ্যে একে-৪৭ রাইফেল ছিল না। এরপর আদালতের মাধ্যমে পাঠানো হয় কারাগারে। আর ভাঙ্গা পা নিয়ে কারাগারে দেড় মাস কাটালেও কোন ধরনের চিকিত্সা সহায়তা পর্যন্ত দেয়া হয়নি।

কথা বলতে গিয়ে হেলালউদ্দিনের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। জীবনে কখনো নেয়াখালীতে যাইনি। অথচ সেই নোয়াখালী কারাগারে কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ ২৭টি মাস। বাবা অনেক আগে মারা গেছেন। মা বেঁচে আছেন। অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার হওয়ার কারণে বৃদ্ধা মাসসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনকে শুনতে হয়েছে নানা অপবাদ।

সার্জেন্ট হেলালউদ্দিন বলেন, ভেবেছিলাম জেলেই বাকিটা জীবন কাটাতে হবে। শেষটায় ২০০৭ সালের (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়) ১৩ নভেম্বর জেল থেকে আমরা মুক্তি পাই। আর ২০১১ সালের ৮ আগস্ট ফিরে পাই হারানো চাকরি। রায় সম্পর্কে কোন মন্তব্য করবেন কী-না— এমন প্রশ্নের জবাবে হেলালউদ্দিন বলেন, কিছুই বলার নেই।

ঢাকায় এসপিবিএন-এ কর্মরত ইন্সপেক্টর (সার্জেন্ট) আলাউদ্দিনও প্রায় একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ২০০৫ সালের ১৯ আগস্ট তিনি অফিসে ছিলেন (ডিএমপি ট্রাফিক উত্তর)। এ সময় তাকে র্যাব সদর দফতরে ডেকে নেয়া হয়। চাকরি ফিরে পাবার পর তিনিও যোগদান করেছিলেন সিএমপিতে। পরে ডিএমপিতে বদলি হন। পদোন্নতি পাবার পর তিনি যোগদান করেন বর্তমান কর্মস্থলে।

কী ঘটেছিল সেদিন ঃ ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল, রাত দশটা। চট্টগ্রাম বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ফোন বেজে ওঠে। অজ্ঞাত এক ব্যক্তির ফোন। সিইউএফএল জেটি ঘাটে নামানো হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। টেলিফোন রিসিভ করেন ফাঁড়ির হাবিলদার গোলাম রসুল। তিনি বিষয়টি ফাঁড়ি ইনচার্জ সার্জেন্ট আলাউদ্দিনকে অবহিত করেন। এর আধা ঘন্টা আগে সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ঘটনাস্থলের অদূরে খেয়াঘাট থেকে নৌকায় কয়লা ডিপোর বাসায় ফিরছিলেন। খবর পেয়ে দ্রুত তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং তারা মোবাইল ফোনে বিষয়টি তত্কালীন সিএমপি ডিসি (বন্দর) আব্দুল্লাহ হেল বাকীকে জানান। পরবর্তী নির্দেশে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সার্জেন্ট হেলালউদ্দিন। এভাবেই জানাজানি হয় ১০ ট্রাক অস্ত্র চালানের খবর। ফলে বিষয়টি কোন অবস্থায় গোপন করার সুযোগ ছিল না। ঘটনার মাত্র ৪ দিন আগে হেলালউদ্দিনকে বন্দর ফাঁড়ি থেকে কয়লা ডিপো ফাঁড়িতে বদলি করা হয়। একই সময় কয়লা ডিপোর ফাঁড়ি থেকে আলাউদ্দিনকে বদলী করা হয়েছিল বন্দর ফাঁড়িতে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here