নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত হত্যাকাণ্ডের যে বর্ণনা উঠে এসেছে, তা যে কেউ শুনলে কেঁদে ফেলবেন।

14

 মেজর আরিফের সাত খুনের দায় স্বীকার

 

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) আরিফ হোসেন। বর্ণনা দিয়েছেন কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ, হত্যা ও নদীতে লাশ ফেলে দেয়ার শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী।

গতকাল নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে মেজর আরিফ এ জবানবন্দি দিয়েছেন। মেজর আরিফ ছিলেন র্যাব-১১ আদমজী ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার। জবানবন্দিতে আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত তিনজনসহ র্যাবের নারায়ণগঞ্জ ও আদমজী ক্যাম্পের ১৮ জন জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে ১০ জন কর্মকর্তা ও ৮ জন সৈনিক পদের। বিষয়টি র্যাব সদর দফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও জানতেন।

অপরদিকে একই সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) সাঈদ তারেককে গতকাল চতুর্থ দফায় আরো ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তৃতীয় দফায় ৫ দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল সকাল ৮ টায় কঠোর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মধ্যে আরিফ হোসেনকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে জবানবন্দি প্রদানের জন্য নেয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট তাকে চিন্তা করার জন্য ৩ ঘন্টা সময় দেন। সকাল ১১টা থেকে আরিফ তার জবানবন্দি প্রদান শুরু করেন। বিকেল সাড়ে ৩টায় তার জবানবন্দি শেষ হয়। জবানবন্দি শেষে আদালতের নির্দেশে আরিফ হোসেনকে পাঠানো হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে।

আদালত সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ হোসেন জানান, র্যাব-১১ আদমজী ক্যাম্পে যোগদানের পরপর নূর হোসেনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাশাপাশি নূর হোসেনের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক ছিল লে. কর্নেল (অব.) সাঈদ তারেক ও লে. কমান্ডার (অব.) মো. মাসুদ রানার সঙ্গে। পরিচয়ের পর থেকে নূর হোসেনের কাছ থেকে তারা বিভিন্ন সময় আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। এছাড়া র্যাবের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে নূর হোসেনের গভীর সম্পর্ক ছিল। আর নূর হোসেনের প্রতিপক্ষ ছিল কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন। নূর হোসেন তার প্রতিপক্ষ নজরুল ইসলামকে অপহরণ ও হত্যার একটি পরিকল্পনা র্যাবের কাছে দেয়। এ পরিকল্পনা মতে ২৭ মে নজরুল ইসলামসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়েছিল। অপহরণের আগে সকাল থেকেই র্যাব গাড়ি নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম লিঙ্ক রোডে অবস্থান করছিল। অপহরণের দৃশ্য দেখে ফেলার জন্য আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার ব্যক্তিগত চালককে অপহরণ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন জানা ছিল না চন্দন সরকার একজন আইনজীবী। সাতজনকে অপহরণ করে দুটি মাইক্রোবাসে তুলে নরসিংদীর দিকে নিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মাইক্রোবাসের ভেতরই তাদের চেতনা নাশক ওষুধ দিয়ে অচেতন করা হয়। পরে রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে পরিকল্পনা অনুয়ায়ী নিয়ে আসা হয় কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাশে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নূর হোসেনের বালু-পাথর ব্যবসা স্থলে। তবে সেখানে পৌঁছার আগেই নূর হোসেনকে মোবাইল ফোনে লোকজন সরিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়। পরবর্তীতে নূর হোসেনের ফোন পাওয়ার পরপরই অপহূত সাতজনকে বহনকারী দুটি মাইক্রোবাসসহ র্যাবের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে। এখানে নেয়ার পর অচেতন সাতজনের মুখমণ্ডল পলিথিন দিয়ে মোড়ানো হয়। পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ র্যাবের ইঞ্জিন চালিত নৌকায় তোলা হয়। একই সঙ্গে তোলা হয় লাশ ডুবিয়ে দেয়ার জন্য ইট, বস্তা ও দড়ি। রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে লাশগুলো ইট বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া হয় শীতলক্ষ্যায়। লাশ নদীর পানিতে ফেলার আগে ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রত্যেকটি লাশের পেট ফুটো করে দেয়া হয়। এরপর তারা ক্যাম্পে ফিরে আসেন।

জবানবন্দিতে আরিফ হোসেন আরো জানান, তাদের ধারণা ছিল লাশ কখনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে এ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কোন ধরনের অভিযোগ তুললেও তা প্রমাণ করতে পারবে না। কিন্তু ঘটনার তিনদিন পর লাশ ভেসে ওঠায় সব কিছু ভেস্তে যায়। অপহরণ থেকে হত্যা পর্যন্ত অংশ নিয়েছিল ১৮ জন। এরা সবাই র্যাব সদস্য।

তারেক সাঈদ আবার রিমান্ডে : র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) সাঈদ তারেককে গতকাল চতুর্থ দফায় ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলামের দায়ের করা মামলায় গত শুক্রবার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। রিমান্ড শেষে গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পরিদর্শক মামুনুর রশীদ মণ্ডল তাকে আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ির চালক অপহরণ ও হত্যা মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান। শুনানি শেষে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

আদালতে শুনানির সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের ঘটনায় আদালতে দায় স্বীকার করে আরিফ হোসেনের বক্তব্য সাধারণ মানুষ শুনলে কেঁদে ফেলবে। তিনি বলেন, নূর হোসেন ও গডফাদারদের যোগসাজশে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। এ হত্যাকাণ্ডে র্যাবের তিনজনসহ আরো অনেকে জড়িত রয়েছে। তাদের মধ্যে আরিফ হোসেন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার জবানবন্দিতে সাতজনকে হত্যার যে বর্ণনা উঠে এসেছে, তা যে কেউ শুনলে কেঁদে ফেলবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here